Bnanews24.com
Home » বঙ্গবন্ধুকে নয়- হত্যা করা হয়েছে বাঙ্গালী জাতিকে!
কভার সম্পাদকীয়

বঙ্গবন্ধুকে নয়- হত্যা করা হয়েছে বাঙ্গালী জাতিকে!

বিএনএনিউজ এর সম্পাদকীয়

।।মিজানুর রহমান মজুমদার।। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্ম হয়। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই নৃতাত্ত্বিক-ভাষাভিত্তিক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছিল। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি প্রথম জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের চাকাকে ঘুরিয়ে দেয়। পাকিস্তান গঠনের কয়েক মাসের মধ্যে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ যখন ঢাকায় এসে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলেন, তখনই ছাত্ররা প্রতিবাদ করলেন। এই প্রতিবাদে শামিল হয়ে অনেক ছাত্রের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুও কারাবরণ করেন। এরপর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের মিছিলে গুলি চালানোর ঘটনায় রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন ঢাকা থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।

১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকারের পরাজয়ের প্রধান কারণই ছিল ভাষা আন্দোলন। প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মুসলিম লীগবিরোধী যুক্তফ্রন্ট (যার প্রধান দল ছিল আওয়ামী লীগ) জয়ী হলেও পাকিস্তান সরকার ৯০ দিনের মধ্যে সেই যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দিয়ে বাঙালির ওপর কেন্দ্রের শাসন চাপিয়ে দেয়।১৯৫৮ সালে সরাসরি সামরিক শাসন জারি করা হয়। এ ধরনের অগণতান্ত্রিক ব্যবহার বাঙালিকে স্বাধীনতার চেতনায় দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ করে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা ইশতেহারে বলা হয়েছিল, কেবল তিনটি বিষয় কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকতে পারবে—প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা। এরপর আমরা ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দেলন এই স্বায়ত্ত্ব শাসনের দাবিকে আরও বেশি জোরালো করে। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুই পেরেছিলেন ছয় দফার মাধ্যমে তাঁর স্বায়ত্ত্ব শাসনের দাবির পেছনে গোটা বাঙালি জাতিকে এক করতে। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার দাবি পূর্ব বাংলাকে প্রায় স্বাধীন করার দাবি।

ছয় দফায় বলা হয়, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র কেবল এ দুটি বিষয় কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে। দুই পাকিস্তানে আলাদা মুদ্রা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকবে। আলাদা কর, বাণিজ্য ও ব্যাংকিং নীতিমালা থাকবে। ছয় দফায় পূর্ব বাংলার জন্য আলাদা সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনী থাকার প্রস্তাব করা হয়। বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, তিনি বুঝতে পারলেন মুসলিম লীগের এই কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে একটি সংগঠিত বিরোধী দল গড়ে তুলতে হবে। সেই বোধ থেকেই ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়। বঙ্গবন্ধু প্রথমে দলের যুগ্ম সম্পাদক, পরে ১৯৫৩ সালে সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৬ সালে সভাপতি হন। উপনিবেশ-উত্তর আমলে বাংলাদেশই একমাত্র ভূখণ্ড, যেটি নৃতাত্ত্বিক-ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করেছিল। এর আগে এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার কোথাও এ ধরনের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা অর্জন করতে পারেনি। ভাষা, গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন, ধর্ম ও অর্থনৈতিক বৈষম্য এই পাঁচ বিষয়ের ভিত্তি করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে তুলেছেন।

আন্দোলন দমন করতে বঙ্গবন্ধুকে কারাবন্দী করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ মামলা। এই নিবর্তনমূলক পদক্ষেপের কারণেই ১৯৬৯ সালের ছাত্র আন্দোলন অনিবার্য হয়ে ওঠে। ছাত্র আন্দোলন ১১ দফা দাবি উত্থাপন করে, যাতে ছয় দফার সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যাংক, বিমা, বৃহৎ শিল্পের জাতীয়করণের দাবি। সারা দেশে গণ আন্দোলনের মুখে পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব শাহির পতনের পর জেনারেল ইয়াহিয়া ক্ষমতায় এসে ১৯৭০ সালে নির্বাচন দিতে রাজি হলেন। ১৯৬৯-৭০ সালের নির্বাচনী প্রচারণাকালে বঙ্গবন্ধু নজিরবিহীন জনসংযোগের মাধ্যমে গোটা জাতিকে স্বাধিকারের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ করে তোলেন। এই নির্বাচনের প্রচারের সময় বঙ্গবন্ধু পূর্ববঙ্গকে বাংলাদেশ হিসেবে উল্লেখ করতে লাগলেন এবং তাঁর দলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী প্রতীক ও স্লোগান ব্যবহৃত হতে থাকল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন পায় আওয়ামী লীগ। এর ফলে বঙ্গবন্ধু জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হন এবং কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের বৈধতা পান। প্রাদেশিক পরিষদেও তাঁর দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কিন্তু জুলফিকার আলী ভূট্টোর ষড়যন্ত্র এবং বিরোধীতার কারণে বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি।

এ অবস্থায় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তার ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু যখন অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। তখন সারা দেশের মানুষ, এমনকি সরকারি কর্মচারীরাও সে ডাকে সাড়া দেন। বাঙালিরা নিজেদের একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে অনুভব করতে শুরু করে। ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়। পাক বাহিনী বাঙ্গালী হত্যা উল্লাসে মেতে ওঠে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ এর ভাষণে বাঙ্গালীদের হুকুম দিয়ে ছিলেন আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি তোমারা তোমাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো। এ অঘোষিত হুকুম থেকে এদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিল। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধও হয়েছিল তাঁর অনুপ্রেরণা ও নেতৃত্বে। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। দেশে ফিরে এসে বিধ্বস্ত দেশ গঠনে মনোযোগী হলেন। বাংলাদেশ যখন একটি স্থিতিশীল উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তর হতে শুরু করে তখনই সাম্রাজ্যবাদী চক্র কতিপয় উচ্চ বিলাসী সেনা ও স্বাধীনতা বিরোধীরা বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করে। এটি নিছক কোন হত্যাকাণ্ড নয়- এ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে পুরো বাঙ্গালী জাতিকে হত্যা করা হয়েছে! রূদ্ধ করা হয় বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতি।