Bnanews24.com
Home » পি কে হালদারের যত অপকর্ম
অপরাধ কভার সব খবর

পি কে হালদারের যত অপকর্ম

পি কে হালদারকে ফেরত চেয়েছে ঢাকা; আশ্বাস দিল্লির

বিএনএ ডেস্ক: একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও একটি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা ছিলেন পি কে হালদার। তখন বাংলাদেশ থেকে একাই সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছেন তিনি। আবার দেশের আর্থিক খাতের শীর্ষ দখলদার ও খেলাপিদের একজনও তিনি।

পি কে হালদারের জন্ম-পরিচয়…

পি কে হালদারের জন্ম পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার দিঘিরজান গ্রামে। বাবা প্রয়াত প্রণনেন্দু হালদার ও মা লীলাবতী হালদার। তাঁর মা ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। পি কে হালদার ও তাঁর ভাই প্রীতিশ কুমার হালদার, দুজনই বুয়েট থেকে স্নাতক শেষ করেন। পরে দুজনই ব্যবসায় প্রশাসনের আইবিএ থেকে এমবিএ করেন। পাশাপাশি চার্টার্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট (সিএফএ) সম্পন্ন করেন পি কে হালদার।

শিক্ষাজীবন শেষে পি কে হালদার যোগ দেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইআইডিএফসিতে, ২০০৮ সাল পর্যন্ত উপব্যবস্থাপনা (ডিএমডি) পরিচালক ছিলেন। ১০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা নিয়েই ২০০৯ সালে তিনি অদৃশ্য আশীর্বাদে রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি হয়ে যান। এরপর ২০১৫ সালের জুলাইয়ে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের এমডি পদে যোগ দেন।

পি কে হালদারের কারণে রিলায়েন্স ফাইন্যান্স ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের নাম বারবার আসায় প্রতিষ্ঠান দুটি নাম পরিবর্তন করে আভিভা ফাইন্যান্স ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক রাখা হয়েছে। দুটি প্রতিষ্ঠানই চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের।

দুই ভাই মিলে ভারতে হাল ট্রিপ টেকনোলজি নামে কোম্পানি খোলেন ২০১৮ সালে, যার অন্যতম পরিচালক প্রীতিশ কুমার হালদার। কলকাতার মহাজাতি সদনে তাঁদের কার্যালয়। আর কানাডায় পিঅ্যান্ডএল হাল হোল্ডিং ইনক নামে কোম্পানি খোলা হয় ২০১৪ সালে, যার পরিচালক পি কে হালদার, প্রীতিশ কুমার হালদার ও তাঁর স্ত্রী সুস্মিতা সাহা। কানাডা সরকারের তথ্য অনুযায়ী, কানাডার টরন্টোর ডিনক্রেস্ট সড়কের ১৬ নম্বর বাসাটি তাঁদের।

পি কে’র শুরুটা যেভাবে…

২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে কমপক্ষে চারটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসে। সেই চার প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা এখন চরম খারাপ। একটি বিলুপ্তের পথে, বাকি তিনটিও গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। নানা কৌশল করে এসব প্রতিষ্ঠান দখল করেন পি কে হালদার। প্রতিষ্ঠান দখল করার জন্য নামে-বেনামে অসংখ্য কোম্পানি খুলেছেন, শেয়ারবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ শেয়ার কিনেছেন, দখল করা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের নামে টাকাও সরিয়েছেন। এমনকি দেশের বাইরেও কোম্পানি খোলেন।

প্রতিষ্ঠানগুলো দখলের সময় পি কে হালদার প্রথমে রিলায়েন্স ফাইন্যান্স এবং পরে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন। আর এসব কাজে তাঁকে সব ধরনের সমর্থন ও সহায়তা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা।

২০১৯ সালের মাঝামাঝি তাঁর দখল করা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যখন গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হতে শুরু করে, তখন পি কে হালদার ভারতে পালিয়ে যান। পরে বসবাস শুরু করেন কানাডা ও সিঙ্গাপুরে। এরপর আবার চলে আসেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে।

 পি কে’র দখল করা চারটি প্রতিষ্ঠান…

পি কে হালদারের দখল করা চারটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)। তবে চারটি প্রতিষ্ঠান দখলে নিলেও কোনো প্রতিষ্ঠানেই পি কে হালদারের নিজের নামে শেয়ার নেই।

রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি হওয়ার পর ওই প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল শুরু করেন পি কে। এতে তাঁকে সহায়তা করেন রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের মালিকেরা। এমডি থাকা অবস্থাতেই তিনি অন্য চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করেন। এরপর রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের পরিস্থিতি খারাপ হলে তাঁকে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের এমডি করে পাঠানো হয়।

পি কে’র দখল করা প্রতিষ্ঠানের মালিক কারা..

সব শেয়ার অন্যদের নামে তবে আসল মালিক পি কে’ই। নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে পি কে হালদার গড়ে তুলেছেন একাধিক প্রতিষ্ঠান, যার বেশির ভাগই কাগুজে।

তার গড়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে, পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল, পিঅ্যান্ডএল অ্যাগ্রো, পিঅ্যান্ডএল ভেঞ্চার, পিঅ্যান্ডএল বিজনেস এন্টারপ্রাইজ, হাল ইন্টারন্যাশনাল, হাল ট্রাভেল, হাল ট্রিপ, হাল ক্যাপিটাল, হাল টেকনোলজি অন্যতম। এর বাইরে আনন কেমিক্যাল, নর্দান জুট, সুখাদা লিমিটেড, রেপটাইল ফার্মসহ অনেক প্রতিষ্ঠান।

কাগজে-কলমে এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় পি কে হালদারের মা লীলাবতী হালদার, ভাই প্রীতিশ কুমার হালদার ও তাঁর স্ত্রী সুস্মিতা সাহা, খালাতো ভাই অমিতাভ অধিকারী, অভিজিৎ অধিকারীসহ বিভিন্ন আত্মীয়। আবার ব্যাংক এশিয়ার সাবেক এমডি ইরফানউদ্দিন আহমেদ ও সাবেক সহকর্মী উজ্জ্বল কুমার নন্দীও আছেন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায়।

পি কে’র হিসাবে কত লেনদেন

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পি কে হালদার ও তাঁর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা হয় প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা, পি কে হালদারের হিসাবে ২৪০ কোটি টাকা এবং তাঁর মা লীলাবতী হালদারের হিসাবে জমা হয় ১৬০ কোটি টাকা। তবে এসব হিসাবে এখন জমা আছে ১০ কোটি টাকার কম। অন্যদিকে পি কে হালদার এক ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকেই ২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ বের করে নিয়েছেন।

পি কে’র কোম্পানি’র ঠিকানা…

ঋণ নিতে ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে কাগজে-কলমে যত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে, তার বেশির ভাগের ঠিকানা পুরানা পল্টনের ইস্টার্ন ট্রেড সেন্টারের ১০তলা এবং কারওয়ান বাজারের ডিএইচ টাওয়ারের ৮ ও ১৪তলা।

ইস্টার্ন ট্রেড সেন্টারের ১০তলায় সুকুমার মৃধা প্রায় ২০ বছর ধরে আইনি ব্যবসা করছেন। দীর্ঘদিন ধরে পি কে হালদার ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কর ফাইলের কাজ করেন সুকুমার মৃধা। ওই ১০তলার ঠিকানা ব্যবহার করেই হাল ইন্টারন্যাশনাল, হাল এন্টারপ্রাইজ, সুখাদা লিমিটেড, সন্দীপ ইন্টারন্যাশনাল, উইন্টেল ইন্টারন্যাশনাল, বর্ণা, ইমেক্সো, আরবি এন্টারপ্রাইজ, এসএ এন্টারপ্রাইজসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন করা হয়।

যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের কার্যালয়ে (আরজেএসসি) খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উইন্টেল ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক পদে আছেন সুকুমার মৃধার মেয়ে অনিন্দিতা মৃধা। ওই প্রতিষ্ঠান এফএএস ফাইন্যান্স থেকে ৪০ কোটি টাকা ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ৬০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আর পরিশোধ করছে না। সুকুমার মৃধার মেয়ের নামে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিআইএফসির শেয়ারও কেনা হয়।

কারওয়ান বাজারের ডিএইচ টাওয়ারে আছে রেপটাইল ফার্ম, আনন কেমিক্যাল, নর্দান জুট, রহমান কেমিক্যাল, আজিজ ফাইবারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়। সবই পি কে হালদারের।

চার আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল যেভাবে

মূলত শেয়ারবাজার থেকে শেয়ার কিনে চারটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেন পি কে হালদার। এভাবে নিয়ন্ত্রণ নেয়া চারটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পিপলস লিজিং ও বিএফআইসির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের একধরনের সহায়তা ছিল। এই দুই প্রতিষ্ঠানের আগের পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্য আইন ভেঙে নামে-বেনামে ঋণ নেয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আর এই সুযোগে এসব কোম্পানির শেয়ার কিনে প্রতিষ্ঠান দুটির নিয়ন্ত্রণ নেন পি কে হালদার।

যেমন বিআইএফসির নিয়ন্ত্রণ সুকুজা ভেঞ্চার ও কাঞ্চি ভেঞ্চার নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের হাতে। আরজেএসসি সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের একই দিনে এ দুটি প্রতিষ্ঠান কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। সুকুজা ভেঞ্চারের শেয়ার সুখাদা লিমিটেড ও সুকুমার মৃধার মেয়ে অনিন্দিতা মৃধার হাতে। এর মধ্যে অনিন্দিতা মৃধার শেয়ারই ৯০ শতাংশ। আর সুখাদা লিমিটেডের মনোনীত পরিচালক ব্যাংক এশিয়ার সাবেক এমডি ইরফানউদ্দিন আহমেদ। ইরফানউদ্দিন আহমেদ কিছুদিনের জন্য বিআইএফসির চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন। আর কাঞ্চি ভেঞ্চারের ৯৫ শতাংশ শেয়ার হাল ইন্টারন্যাশনালের হাতে, যার প্রতিনিধিও ইরফানউদ্দিন আহমেদ।

পিপলস লিজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ ছিল আনন কেমিক্যাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের। আবার আনন কেমিক্যালের ৯৪ শতাংশ শেয়ার প্রীতিশ কুমার হালদারে হাতে ও ৫ শতাংশ শেয়ার তাঁর খালাতো ভাই অভিজিৎ অধিকারীর হাতে।

এফএএস ফাইন্যান্সের নিয়ন্ত্রণ পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল ও রেপটাইল ফার্মের হাতে। আবার রেপটাইলস ফার্মের মালিকানায় আছে পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল, কেএইচবি সিকিউরিটিজের এমডি রাজীব সোম ও তাঁর স্ত্রী শিমু রায়। এর ফলে ময়মনসিংহের কুমির চাষ প্রকল্পটি বনে গেছে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিক। মালিক মূলত পি কে হালদারই।

ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ হাল ইন্টারন্যাশনাল, বিআর ইন্টারন্যাশনাল, নেচার এন্টারপ্রাইজ, নিউ টেক এন্টারপ্রাইজের হাতে। এসব প্রতিষ্ঠান ২০১৫ সালে কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। হাল ইন্টারন্যাশনালের ৭০ শতাংশ শেয়ারের মালিক পি কে হালদার নিজে।

পি কে’র পলায়ন…

২০১৯ সালে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় প্রথম পি কে হালদারের নাম সামনে আসে। এ সময় দুদক যে ৪৩ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে, পি কে হালদার তাদের একজন।

দুদক ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি পি কে হালদারের বিরুদ্ধে ২৭৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে। মামলার অভিযোগে বলা হয়, পলাতক পি কে হালদার তার নামে অবৈধ উপায়ে এবং ভুয়া কোম্পানি ও ব্যক্তির নামে প্রায় ৪২৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়েছেন।

অবৈধ সম্পদের অবস্থান গোপন করতে ১৭৮টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করেন পি কে হালদার। তিনি এসব অ্যাকাউন্টে ৬ হাজার ৮০ কোটি টাকা জমা রাখেন। পাশাপাশি এসব অ্যাকাউন্ট থেকে তার নামে ও বেনামে আরও ৬ হাজার ৭৬ কোটি টাকা উত্তোলন করেন।

দুদকের তথ্য বলছে, পি কে হালদার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

বিএনএ/এ আর