বিএনএ, ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি তবে চূড়ান্ত সংঘাতের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেল? ৬ দফা দাবি আদায়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ শেষ হতে না হতেই কেন রণক্ষেত্রে রূপ নিল জাতীয় সংসদ? সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির একচেটিয়া সিদ্ধান্তের পর—এবার কি সংসদ থেকে একযোগে পদত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে ১১-দলীয় বিরোধী জোট? জামায়াত ও এনসিপি নেতারা যে “সংসদ ও রাজপথ এক করে দেওয়ার” হুঙ্কার দিলেন, তা কি আসলে বিএনপি সরকারকে ওল্টানোর কোনো গোপন ছক?

ঘটনার সূত্রপাত গত ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে। সংসদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি পদ নির্বাচন। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুযায়ী, বিরোধী দলকেও কিছু কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া হয়। কিন্তু এবার ঘটল সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা ! স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি পদে বিরোধী দলের কোনো সংসদ সদস্যকে না রেখে, সব কটি পদে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির এমপিদের মনোনীত করা হয়।
এই একচেটিয়া এবং বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংসদ কক্ষেই তীব্র প্রতিবাদ জানান বিরোধীরা। সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং একযোগে সংসদ কক্ষ থেকে ওয়াকআউট বা সংসদ বর্জন করেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে ১১-দলীয় জোটের শরিক দল এনসিপির হাসনাত আব্দুল্লাহসহ দুজন এমপি তখনো ভেতরে বসা ছিলেন, যা জোটের ভেতরের কৌশলগত অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
এই সংসদীয় লড়াইয়ের ঠিক আগের দিনই কিন্তু রাজপথ কাঁপিয়েছে এই ১১-দলীয় জোট। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাদের বিশাল লংমার্চ কর্মসূচি থেকে তারা সরকারের সামনে তুলে ধরে ৬টি সুনির্দিষ্ট দাবি। যার মধ্যে রয়েছে—অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সকল হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎ-গ্যাস-তেল ও সারের তীব্র সংকট দ্রুত নিরসন এবং চাল-ডালসহ সকল নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ৬ দফা দাবি দিয়ে জামায়াত-এনসিপি জোট আসলে দেশের সাধারণ মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করছে, কারণ নিত্যপণ্যের দাম এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষ সত্যিই চিন্তিত।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সংসদ বর্জন বা একযোগে পদত্যাগের এই সিদ্ধান্ত কি রাজনৈতিকভাবে সত্যিই কোনো সুফল আনে? বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস কিন্তু সেটাই বলে। বাংলাদেশে সরকারের ওপর চূড়ান্ত চাপ সৃষ্টি করতে বিরোধী দলগুলোর সংসদ থেকে একযোগে পদত্যাগ করার ইতিহাস বেশ পুরনো।
ফিরে যাওয়া যাক ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টি—তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে তৎকালীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে একযোগে ১৪৭ জন সংসদ সদস্য পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন। যার জেরে ১৯৯৬ সালে সরকার বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পাস করতে বাধ্য হয়।
খুব বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই, ২০২২ সালের ডিসেম্বরের দিকে তাকান। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও ১০ দফা দাবিতে ঢাকার গোলাপবাগ সমাবেশ থেকে একযোগে পদত্যাগের ঘোষণা দেন বিএনপির ৭ জন সংসদ সদস্য। পরবর্তীতে তারা স্পিকারের কাছে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাংলাদেশে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করা হলো পদত্যাগের আগের প্রথম ধাপ। আর যখনই কোনো বড় বিরোধী জোট সংসদ থেকে একযোগে পদত্যাগ করেছে, তখনই তৎকালীন সরকার চরম নৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে।
ঠিক এই কারণেই জামায়াত-এনসিপির বর্তমান সংসদ বর্জনকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। আইনিভাবে তারা এখনো পদত্যাগপত্র জমা না দিলেও, ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের মঞ্চ থেকে সংসদের বিরোধীদলীয় চিহ্ হুইপ নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট ভাষায় সরকারকে আলটিমেটাম দিয়েছেন—সরকার যদি সংসদকে কার্যকর না করে, তবে তারা সংসদ ও রাজপথ এক করে ফেলবেন।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এই লংমার্চকে সরকারের জন্য কেবল একটি “সতর্কবার্তা” হিসেবে উল্লেখ করে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যদি সরকার এই ৬ দফা দাবি অবিলম্বে মেনে না নেয়, তবে এই আন্দোলন আর ৬ দফায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। খুব দ্রুতই তা রূপ নেবে—বিএনপি সরকার পতনের এক দফা দাবিতে! আর সেই এক দফার চূড়ান্ত চাপ সৃষ্টি করতে বিরোধী দলের সব এমপিদের সংসদ থেকে একযোগে পদত্যাগ করা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র!
সৈয়দ সাকিব
![]()

