বিএনএ ডেস্ক : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনে মঞ্জুরুল আহসান ভোটের মাঠ থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়েছেন। প্রার্থিতা ফিরে পেতে তাঁর করা লিভ টু আপিল খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। সাদাচোখে মনে হতে পারে, মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর নির্বাচন করতে না পারায় ভোটের মাঠে ‘শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী’ নেই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহর। তাঁর বিজয় ‘সময়ের ব্যাপার’!

আসলে কী তাই? নাকি হাসনাত আব্দুল্লাহর বিপক্ষে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর চেয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠতে পারে বিএনপি সমর্থিত গণ অধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারি জসিম উদ্দিন? কেমন হবে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীবিহীন এনসিপির হাসনাত আব্দুল্লাহ ও জসিম উদ্দিনের লড়াই? সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে আসুন, জেনে নিই- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনের ফলাফল।
১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই আসনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ১৮ হাজার ৯ শত ৪৩ জন। ভোট প্রদান করেন ৯২ হাজার ৫ শত ৩ জন। নির্বাচনে বিএনপির ইঞ্জিঃ মন্জুরুল আহসান বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ২৭ হাজার ১ শত ৩৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ন্যাপের অধ্যাপক
১৯৯৬ সালের ১২ই জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩ শত ১৩ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ২৬ হাজার ৮ শত ৭৩ জন। নির্বাচনে বিএনপির ইঞ্জিঃ মন্জুরুল আহসান বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৪৬ হাজার ১ শত ৩৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাতীয় পার্টির এবি এম গোলাম মোস্তফা। লাঙ্গল প্রতীকে তিনি পান ৩৯ হাজার ২ শত ৯ ভোট।
২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৪১ হাজার ৩ শত ২১ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৫৫ হাজার ৬ শত ৯৫ জন। নির্বাচনে বিএনপির ইঞ্জিঃ মন্জুরুল আহসান বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৯২ হাজার ৩ শত ২৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের ফখরুল ইসলাম মুন্সী। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৫৮ হাজার ৮ শত ৭৭ ভোট।
২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৩১ হাজার ৮ শত ৪০ জন। ভোট প্রদান করেন ২ লাখ ১ হাজার ৯ শত ৩১ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এবি এম গোলাম মোস্তফা বিজয়ী হন । নৌকা প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ১৫ হাজার ৫৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মন্জুরুল আহসানের স্ত্রী মাজেদা আহসান। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৮১ হাজার ৬ শত ৬৪ ভোট।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম সংসদে বিএনপি এবং নবম সংসদে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়।
আওয়ামী লীগের দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচন বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমমনা দলগুলো বর্জন করে। ভোটারবিহীন ২০১৪ সালের দশম ও ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী এএফএম ফখরুল ইসলাম মুন্সীর ছেলে রাজী মোহাম্মদ ফখরুল, এবং ২০২৪ সালের আমি-ডামি খ্যাত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডামি প্রার্থী দেবিদ্বার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদকে বিজয়ী ঘোষণা কারা হয়। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। পরদিন এই সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
এরপর দৃশ্যপটে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আশ্রয় প্রশ্রয়ে থাকা জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির হাসনাত আব্দুল্লাহ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের আস্থাভাজন হাসনাত আব্দুল্লাহ জুলাই আন্দোলন পরবর্তী ২০ মাস প্রশাসনে ছড়ি ঘুরিয়েছে।দেবিদ্বার উপজেলায় ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করাসহ নানাভাবে প্রশাসনকে প্রভাবিত করেছে।এখনো তার আঙুলের ইশারায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশাসন উঠ-বস করছে। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। তার ডাকা যমুনা ঘেরাও কর্মসূচীতে জামায়াতে ইসলামী, হেফাজত ইসলাম, খেলাফত মজলিস, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন হাজার হাজার লোকবল সরবরাহ করেছে।কিন্তু এখন নির্বাচনী বৈতরণি পার হতে আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাছে যেতে হচ্ছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু হিন্দুদের মন্দিরে গিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহকে বলতে শুনা যায়, ‘খাবার দেন, আমার পেটে ক্ষুধা প্রচন্ড’!
এবার চোখ ফেরানো যাক, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার উপজেলার) মোট ভোটার ৪,১০,৫৫৯ জন, পুরুষ ভোটার: ২,১৫,২৩৭ জন, নারী ভোটার: ১,৯৫,৩১৯ জন,তৃতীয় লিঙ্গ: ৩ জন। এর মধ্যে নতুন ভোটার সংখ্যা প্রায় ৯৩,৮০৮ জন ।
১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৪ দেবিদ্বার আসনে হাসনাত আব্দুল্লাহর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গণঅধিকার পরিষদের মনোনীত প্রার্থী মো. জসীম উদ্দিন ট্রাক প্রতীকে, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের প্রার্থী ইরফানুল হক সরকার আপেল প্রতীকে, খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ মজিবুর রহমান, দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকে এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. আব্দুল করিম হাতপাখা প্রতীকে।
বিএনপির নিজস্ব প্রার্থী না থাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ এবং জোটের সমর্থকরা জসীম উদ্দিনের পক্ষে কাজ করছেন, যা তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে আগের চেয়ে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। বিএনপি জোটের সমর্থন পাওয়ায় জসীম উদ্দিন এখন দেবিদ্বারের নির্বাচনী সমীকরণে অন্যতম প্রধান শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন ।
অনুসন্ধান ও তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই আসনে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা বেশ শক্ত। দলটির রয়েছে বিশাল ভোট ব্যাংক। ফলে হাসনাত আবব্দুল্লাহ খালি মাঠে গোল করতে পারছেন না তা নিশ্চিত।
ঋণ খেলাপী তকমা নিয়ে নির্বাচনী ট্রেন থেকে মাঝপথে নেমে যেতে বাধ্য হওয়া মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি।তৃনমূল পর্যায়ে রয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা।১৯৯১ সালের নির্বাচনে ন্যাপ প্রধান প্রয়াত অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদকে পরাজিত করে প্রথম এমপি নির্বাচিত হন ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। এরপর ১৯৯৬–এর ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬–এর ১২ জুন ও ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
২০০৮ সালে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তৎকালীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আটক থাকেন। পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেনি। তাঁর স্ত্রী বেগম মাজেদা আহসান মুন্সী বিএনপি থেকে সংসদ নির্বাচন করেন। ওই নির্বাচনে তিনি ৮১ হাজার ৬৬৫ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। কিন্তু এবার মুন্সী পরিবারের কেউ নির্বাচনে নেই। সেই দিক থেকে বলা যায়, বিএনপির মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী ও আওয়ামীলীগের রাজী ফখরুল মুন্সী উভয় পরিবারের রাজনৈতিক পতন দেখছেন এলাকার ভোটারা।
পর্যবেক্ষণ ও জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, কুমিল্লা হাসনাত আব্দুল্লাহ এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা হলেও দেবীদ্বার উপজেলায় নতুন এই দলটির সাংগঠনিক শক্তি গড়ে ওঠেনি। তার একমাত্র ভরসা জুলাই আন্দোলনের ইমেজ, জামায়াত ইসলামীর ভোট ব্যাংক এবং নতুন ভোটারদের বড় একটি অংশ।
অপর দিকে গণ অধিকার পরিষদের সাংগঠনিক ভিত্তি নেই বললে চলে। কিন্তু সময়ের প্রেক্ষাপটে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও সংখ্যালঘু ভোটারাই গণ অধিকার পরিষদের এখন সাংগঠনিক শক্তি। মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর পুরোপরিবার ও স্থানীয় বিএনপি হাসনাত আব্দুল্লাহর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
কেননা হাসনাত আবদুল্লাহ’র কারণে তাকে ভোটের আগেই পরাজিত হতে হয়েছে। এটি এখন তার প্রেস্টিজ ইস্যু। তার অনুসারি বিএনপি’র লোকজন প্রচারাভিযান চালাচ্ছেন গণ পরিষদের ট্রাক প্রতীকের পক্ষে। ফলে অখ্যাত জসিম উদ্দিন রাতারাতি খ্যাতিমান হয়ে উঠেছেন। যা হাসনাত আব্দুল্লাহর ঘুম হারাম করে দিয়েছে।
দৈবচয়ন পদ্ধতিতে পরিচালিত বিএনএ নিউজ টুয়েন্টিফোরের জরিপ, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, কুমিল্লা– ৪ সংদীয় আসনে বিএনপির ভোটার রয়েছে ৪০ শতাংশ। আওয়ামী লীগের ভোটার রয়েছে ৩০ শতাংশ। সংখ্যালঘু হিন্দু ভোটার রয়েছে ৪.৫০ শতাংশ, জামায়াতে ইসলামীর ১০ শতাংশ এবং এনসিপির ভোট রয়েছে ৫ শতাংশ। জাতীয় পার্টি ও অন্যান্য দলের ৫শতাংশ ভোট রয়েছে।কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় এমন ভোটারের সংখ্যা ১০ শতাংশ।
ভোটের সমীকরণে দেখা যায়,বিএনপি একচেটিয়া ভোট পাবেন জসীম উদ্দিন ।এছাড়া আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘু হিন্দু ভোটারদের সঙ্গে এনসিপির বৈরি সর্ম্পক রয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ও মব সন্ত্রাসের জন্য এনসিপির হাসনাত আব্দুল্লাহকে দায়ি করা হয়। সেই ক্ষেত্রে আওয়ামীলীগ, জাতীয় পার্টি, সংখ্যালঘু এবং বিএনপির ভোট পেয়ে গণঅধিকার পরিষদের জসিম উদ্দিনই হতে পারে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) সংসদীয় আসনের জনপ্রতিনিধি!
শামীমা চৌধুরী শাম্মী
![]()

