বিএনএ, ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনীতির পাশার দান পুরোপুরি উল্টে গেছে বলা না গেলেও, রাজনীতির সমীকরণ যে অত্যন্ত জটিলতার এক মোড় নিয়েছে—তা স্পষ্ট। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি আগামী ডিসেম্বরেই দেশে ফিরছেন? আর তারই অংশ হিসেবে কি ৫ই আগস্ট নয়া দিল্লিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হচ্ছেন তিনি? আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের বরাতে এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র উত্তেজনা। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা হারিয়ে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা শেখ হাসিনার আকস্মিক কিছু ঘোষণা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং মেরুকরণ তৈরি করেছে।
দীর্ঘদিন আড়ালে থাকার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্স ও ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছেন যে, তিনি এবং তাঁর দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। ট্রায়াল বা আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার এই আইনি চালটি আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মাঝে নতুন করে প্রাণসঞ্চার করেছে, যা বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের সূত্র ধরে জানা গেছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন শেখ হাসিনা। আর এই প্রত্যাবর্তনের প্রথম ধাপ হিসেবে ৫ই আগস্ট নয়া দিল্লিতে তিনি দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে পারেন। এই খবরটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে মেরুকরণ শুরু হয়েছে।
শেখ হাসিনার এই সম্ভাব্য সংবাদ সম্মেলনের খবরে নড়েচড়ে বসেছে ঢাকা। সোমবার বিকেলে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। বৈঠকে উপদেষ্টা সরাসরি ভারতের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন: কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনো ব্যক্তি যেন ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে না পারেন। এ ধরনের কার্যক্রম বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই কড়া বার্তার পর এখন সবার নজর নয়া দিল্লির দিকে—তারা কি শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেবে, —নাকি ঢাকার অনুরোধ রাখবে?
এদিকে দেশের ভেতরেও পর্দার আড়ালে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে গেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষদূত সার্জিও গোর। রাজনৈতিক মহলে তীব্র গুঞ্জন রয়েছে যে, তিনি বাংলাদেশ সফরকালে আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সঙ্গে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে বৈঠক করেছেন। এই বৈঠকগুলোর আসল উদ্দেশ্য কী ছিল, তা নিয়ে চলছে নানামুখী বিশ্লেষণ।
এখানেই উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বাংলাদেশের রাজনীতির পাশার দান কি তাহলে সত্যিই উল্টে যাচ্ছে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান এই মুহূর্তে অত্যন্ত স্পষ্ট। তারা বাংলাদেশে এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ চায় যেখানে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত থাকবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী বা বড় একটি অংশ সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ফলে আওয়ামী লীগকে মাঠের রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা দূরে রাখার কারণে, বিগত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য বা ‘অংশগ্রহণমূলক’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে দিল্লি—সবাই এখন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছে।
এই আন্তর্জাতিক চাপ এবং শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক চাল। বিশ্লেষকদের ধারণা, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার মাধ্যমে নিজের দলকে আবার রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করতে চান। যদি পরিস্থিতি সেই দিকেই এগোয়, তবে আগামী ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের দিকে একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও সব দলের অংশগ্রহণমূলক সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবণাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না।
আর সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যাতে পূর্ণ শক্তি নিয়ে অংশ নিতে পারে, তারই একটি আগাম প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে শেখ হাসিনার এই ঝটিকা প্রত্যাবর্তন এবং দিল্লির এই সম্ভাব্য সংবাদ সম্মেলনকে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার এবং ২০২৭ সালের এই নির্বাচনী রোডম্যাপের গুঞ্জন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে:
আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির নেতা-কর্মীদের মাঝে দীর্ঘদিন পর এক ধরনের নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ও উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। ২০২৭ সালের নির্বাচনের একটি সম্ভাব্য আলো দেখে, তারা মাঠের রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির মতো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক ও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের এই রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন এবং ২০২৭ সালের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন তাদের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে, তা নিয়ে তারা অভ্যন্তরীণ কৌশল সাজাতে শুরু করেছে।
৫ই আগস্ট নয়া দিল্লিতে শেখ হাসিনা কী বলেন, আর ভারতের অবস্থান কী হয়—তার ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনের বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ। একই সাথে মার্কিন দূতের এই গোপন সফর এবং ২০২৭ সালের নির্বাচনের যে গুঞ্জন, তার প্রভাব কতদূর গড়াবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সৈয়দ সাকিব
![]()

