33.1 C
আবহাওয়া
৩:৫০ অপরাহ্ণ - আগস্ট ২, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » কেন মাত্র ৫ মাসে ড.ইউনূসের ’চেরাগ’ এনসিপি নিভে যাচ্ছে?

কেন মাত্র ৫ মাসে ড.ইউনূসের ’চেরাগ’ এনসিপি নিভে যাচ্ছে?


বিএনএ,ডেস্ক:যে দলের কথায় এক সময় বাংলাদেশে সূর্য উঠত আর ডুবত, তারা চরম অস্তিত্ব সংকটে। জাতীয় নাগরিক কমিটি-এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটওয়ারির এমন প্রার্থনাই প্রমাণ করে, একমাত্র বঙ্গোসাগরে ঝাপ দেয়া ছাড়া উপায় নেই।! এনসিপির জুলাই পদযাত্রায় হবিগঞ্জে উত্তরাঞ্চল সমন্বয়ক সারজিস আলমের ওপর হামলার জের না কাটতেই শুক্ররাব রাতে মূখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটওয়ারীও হামলার শিকার হয়েছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত এনসিপি কেন জামায়াত ইসলামীর সাথে জোট করেও নির্বাচনে মাত্র ৬টি আসন পেল ? কেন ডা. জারাসহ শীর্ষ নেতারা দল ছাড়লেন?  আর কেনই বা ইনকিলাব মঞ্চের প্রয়াত মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি এনসিপি নেতাদের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলন বিক্রি করে কোটিপতি হওয়ার বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছিলেন?

২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারি সংসদ ভবনের সামনে জাকজমক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক কমিটি বা এনসিপি। ৫ই আগস্টের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস যেন হয়ে উঠেছিলেন এনসিপি নেতাদের জন্য ‘আলাদিনের চেরাগ’।  রূপকথার চেরাগে ঘষা দিয়ে দৈত্যের কাছে যেমন যা চাওয়া হতো, তা-ই হাজির হতো; ঠিক তেমনি এনসিপি নেতারা ড. ইউনূসের কাছে যা আবদার করেছেন, চোখের পলকে তা-ই পূরণ হয়েছে।

আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা থেকে শুরু করে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রতীক ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ঐতিহাসিক ঘটনা—সবকিছুই ঘটেছিল এই দলটির অদৃশ্য ইশারায়। ড. ইউনূসের সর্বাত্মক রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাকে পুঁজি করে এনসিপি তখন ধরাকে সরা জ্ঞান করছিল। তাদের একেকটি দাবি যেন ছিল অবাধ্য এক শাসনভার। কিন্তু চেরাগের সেই জাদুকরী ক্ষমতা যে ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর এভাবে কর্পূরের মতো উড়ে যাবে, তা হয়তো এনসিপির শীর্ষ নেতারা স্বপ্নেও ভাবেননি।

গত ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ছাড়াই মেজরিটি নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। আর জামায়াতের সাথে জোট করে মাত্র ৬টি আসন পাওয়া এনসিপি এখন মাঠের রাজনীতিতে কোণঠাসা।

৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ড. ইউনূসের আশীর্বাদপুষ্ট এই দলটির দাপট ছিল আকাশচুম্বী। অনেকেই ভেবেছিলেন এনসিপিই হবে আগামীর বাংলাদেশ। কিন্তু ক্ষমতার লোভ আর আদর্শের বিচ্যুতি দলটিকে শুরুতেই বড় ধাক্কা দেয়। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করার বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পর দলে তীব্র কোন্দল শুরু হয়। এই জোট মেনে নিতে না পেরে দলের শীর্ষ নেত্রী ডা. জারাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে বেরিয়ে যান। যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের দলত্যাগের পর থেকেই মূলত বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপে পড়ে এনসিপি।

তবে সংকটের এখানেই শেষ নয়। দলটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে যখন সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম হয়। অভিযোগ ওঠে, এনসিপির শীর্ষ নেতারা হাজারো ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত জুলাই আন্দোলনকে নিজেদের পকেট ভরার হাতিয়ার বানিয়েছেন। আন্দোলনের আবেগকে বিক্রি করে দলটির কতিপয় শীর্ষ নেতা রাতারাতি শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন!

দেশের মানুষ এই চরম বিশ্বাসঘাতকতা ও অনৈতিকতা ভালোভাবে নেয়নি। তার প্রমাণ পাওয়া যায় ২০২৫ সালের ২৫শে মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর কেন্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রয়াত ওসমান হাদির বক্তব্যে । তিনি বলেছিলেন, “জুলাইকে কুক্ষিগত করার ফলে এনসিপির অনেকে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।  এই কথাটা বলতে গিয়ে কষ্ট হয়। দশ মাস আগে যে ছেলেটার সারা গায়ে আঘাতের চিহ্ন দেখেছি, সেইসব ছেলেমেয়ে মাত্র ৮-১০ মাসের মধ্যে কীভাবে কোটি টাকার মালিক হয়, সেই চিন্তায় আমাদেরও ঘুম আসে না।”

দল ভাঙন আর দুর্নীতির এই কলঙ্ক মাথায় নিয়ে ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বড় ধরনের ভরাডুবি হয় এনসিপির। জামায়াতের কাঁধে ভর করে ৩০টি আসনে প্রার্থী দিলেও, দেশের মানুষ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে এবং দলটি মাত্র ৬টি আসনে বিজয়ী হতে পেরেছে । সংসদের ভেতরে-বাহিরে তাদের অবস্থান এখন নড়বড়ে। কিন্তু পরাজয় মেনে নেওয়ার বদলে, বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসেন দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারী।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এনসিপির এই পতনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারীর ‘লাগামহীন ও উশৃঙ্খল’ বক্তব্য। দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি, যুবদল এবং ছাত্রদলকে লক্ষ্য করে একের পর এক বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন তিনি।

তার বক্তব্যে কোনো রাজনৈতিক শিষ্টাচার ছিল না। তিনি বিএনপি সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে গিয়ে এমন কিছু মন্তব্য করেছেন, যা রাজপথের লড়াকু দল বিএনপির নেতাকর্মীদের ক্ষোভকে চরম সীমায় নিয়ে যায়।  নাসিরুদ্দিনের মুখের ভাষা আর উসকানিমূলক আচরণই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে এনসিপির জন্য।

এই ক্ষোভের আগুন আর চাপা থাকেনি। নাসিরুদ্দিনের উসকানিতেই হবিগঞ্জ এবং সিলেটের গোলাপগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক সহিংসতা। বিএনপি ও এনসিপি কর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এখন নিয়মিত ঘটনা। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, এনসিপির শীর্ষ ৯ নেতার বিরুদ্ধে খোদ ছিনতাইয়ের মামলা পর্যন্ত হয়ে গেছে! যে দলটির হাত ধরে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, সেই দলের শীর্ষ নেতারা এখন ছিনতাই মামলার আসামি!

শুধু তাই নয়- শুক্রবার রাতে সিলেটে জুলাই পদযাত্রা শেষে ফেরার পথে বিএনপি-যুবদল-ছাত্রদলের রোষানলে পড়েন নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারী।  তার গাড়িতে ইট ছুড়ে মারা হয়। এতে তিনি কিছুটা আহত হন।  এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় নাসির উদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, তার ওপর হামলার ’কাফফারা’ প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়াকে দিতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান শাসকদল বিএনপির তীব্র রোষানলের মাঝে পড়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি’র নেতাকর্মীদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে তারা যদি অবিলম্বে রাজপথে নেমে নিজেদের শক্তি ও গণভিত্তি প্রমাণ করতে না পারে, তবে তাদের অস্তিত্ব চিরতরে মুছে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

বিশেষ করে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনা যদি কোনোভাবে রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বা দেশে ফিরে আসেন, তবে এনসিপির জন্য সেটি হবে চরম বিপর্যয়।  একদিকে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং অন্যদিকে বর্তমান সরকারের দমনমূলক অবস্থানের কারণে দলটির তৃণমূল থেকে শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যন্ত ভয়াবহ প্রতিশোধের শিকার হতে পারেন। ফলে এখনই রাজপথে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করতে ব্যর্থ হলে, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এনসিপি নেতাকর্মীদের জন্য রাজনৈতিক নির্বাসন কিংবা চূড়ান্ত ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপি এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে। নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারীর অহংকার এবং উশৃঙ্খল রাজনৈতিক অবস্থান দলটিকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।  তারা এখন তীব্র প্রতিরোধের মুখে।  ড. ইউনূসের পৃস্টপোষকতায় ও ইচ্ছায় যে দলটি তৈরি হয়েছিল, তা কি নাসিরুদ্দিনের জিভের দোষেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে? বিএনপি সরকারের সঙ্গে এই সংঘাত এনসিপিকে কোথায় নিয়ে ঠেকাবে?

শামীমা চৌধুরী শাম্মী

 

Loading


শিরোনাম বিএনএ