22 C
আবহাওয়া
৫:০১ অপরাহ্ণ - এপ্রিল ২৯, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » ‘মেগা প্রকল্প’ও ব্যর্থ, আবারও ডুবল নগরী

‘মেগা প্রকল্প’ও ব্যর্থ, আবারও ডুবল নগরী


বিএনএ, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে একের পর এক প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলছে না নগরবাসীর। বর্ষা এলেই ডুবে যায় সড়ক, ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান—প্রশ্নের মুখে পড়ে উন্নয়নের দাবিগুলোও।

২০১৭ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) জলাবদ্ধতা নিরসনে যে মেগা প্রকল্প হাতে নেয়, তার ব্যয় ধাপে ধাপে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকায়। অথচ প্রায় ৭০ শতাংশ অর্থ ব্যয়ের পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নেই; বরং বছরের পর বছর ভোগান্তি বেড়েই চলেছে।

সর্বশেষ গত সোমবার (২৮ জুলাই) সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টার ৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক স্থানে বাসাবাড়ি ও দোকানে পানি ঢুকে পড়ে।

চরম দুর্ভোগের মধ্যে নগরের কিছু এলাকায় নৌকা দিয়ে চলাচল করতে দেখা যায় বাসিন্দাদের। যদিও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো একে “চলমান কাজের কারণে সাময়িক অসুবিধা” বলে ব্যাখ্যা দিয়েছে, বাস্তবে হালিশহর, আগ্রাবাদ, কাতালগঞ্জ, জিইসি মোড়, তিন পোলের মাথা ও চকবাজার কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

গত বছর  ১৮ জুন ও ৯ জুলাই কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেও একই চিত্র দেখা গেছে। ৭০ ও ৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় নগরের বিভিন্ন এলাকা, বিশেষ করে পাঁচলাইশ, বাকলিয়া, মুরাদপুর ও খালসংলগ্ন অঞ্চলগুলোতে দুর্ভোগ ছিল সবচেয়ে বেশি।

জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের চারটি বড় প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বড় চউকের খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্প—যার ব্যয় ৫ হাজার ৫৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এছাড়া কর্ণফুলী নদীর তীরে অবকাঠামো নির্মাণ, নতুন খাল খনন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন উদ্যোগ মিলিয়ে ইতোমধ্যে প্রায় ৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

তবে বাস্তবতা ভিন্ন। অল্প বৃষ্টিতেই নগরীর বড় অংশ অচল হয়ে পড়ে। চউক ৩৬টি খাল সংস্কারের কাজ হাতে নিলেও এখনো ১১টির কাজ অসম্পূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ হিজড়া খালের কাজ আর্থিক সংকটের অজুহাতে শুরুই করা যায়নি।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, খাল সংস্কার কাজ শেষ হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। অন্যদিকে চউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম জানিয়েছেন, বর্ষা শেষে কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে জলাবদ্ধতা ৮০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা এ আশ্বাসে আস্থা রাখতে পারছেন না। পরিবেশবিদ ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলীর মতে, খাল ও নদীর পানি ধারণক্ষমতা নিয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা নেই, বরং অপরিকল্পিত কাজের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ফয়সাল হোসেন বলেন, “প্রযুক্তিগত সমাধানের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন, যা এখানে অনুপস্থিত। কাগজে অগ্রগতি থাকলেও মাঠে তার প্রতিফলন নেই।”

সুজন চট্টগ্রামের সভাপতি আ ক ম মহিউদ্দিনের ভাষায়, “প্রকল্পগুলো দুর্নীতির খনিতে পরিণত হয়েছে। জবাবদিহিতার অভাবে বছরের পর বছর একই চিত্র চলছে।”

নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি মোবারক হোসেনও বলেন, সমন্বয়হীন ও বরাদ্দকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার কারণে জনগণের অর্থ অপচয় হচ্ছে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না।

নগরবাসীর প্রশ্ন এখন একটাই—হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলছে না? কেন প্রতি বর্ষায় ডুবে যায় শহর?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আর শুধু প্রকৌশলগত সমস্যা নয়; বরং প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা।

সমন্বিত পরিকল্পনা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ নেই—নচেৎ প্রতি বর্ষাতেই পানিতে ডুববে নগর, আর অন্ধকারেই হারিয়ে যাবে জনগণের হাজার কোটি টাকা।

বিএনএ/শাম্মী

Loading


শিরোনাম বিএনএ