28.5 C
আবহাওয়া
৩:০৫ পূর্বাহ্ণ - জুন ১০, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » আবারও সামরিক শাসনে ফিরবে বাংলাদেশ?

আবারও সামরিক শাসনে ফিরবে বাংলাদেশ?


বিএনএ, ঢাকা : দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাংলাদেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের স্থবিরতা কাটবে এবং গণতন্ত্রের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে—এমনটাই আশা করছে সাধারণ জনগণ। ধারণা করা হচ্ছিল, নির্বাচন উত্তর পরিস্থিতি দেশটিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর উন্নতি হবে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও  রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক তাজ হাশমী তার নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আপাতদৃষ্টিতে একটি নির্বাচিত সরকার গঠিত হলেও, পর্দার আড়ালের শক্তিগুলো দেশকে আবারও একটি সামরিক স্বৈরাচারী শাসনের দিকে ঠেলে দিতে প্রস্তুত।

YouTube player

অধ্যাপক তাজ হাশমীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর শঙ্কার মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। তার মতে, দেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও পরবর্তী সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না এবং শেষ পর্যন্ত একটি সামরিক স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা জেঁকে বসতে পারে।

অধ্যাপক হাশমী ভিডিওর শুরুতেই তার মূল আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন যে, নির্বাচনের পরে যে সরকারই আসুক, তাদের মেয়াদ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

অধ্যাপক হাশমী বলেন, “নির্বাচন না হওয়ার সম্ভাবনা যেমন আছে, হওয়ার সম্ভাবনাও তেমন। ফেব্রুয়ারিতে যদি নির্বাচন হয় আদৌ, তারপরে যারা ক্ষমতায় আসবে তারা কতদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবেন এ ব্যাপারে আমি খুবই চিন্তিত। নির্বাচনের পরে যে সরকার আসবে তারা খুব বেশিদিন টিকবে না। পর্দার অন্তরালেই একটা সামরিক একনায়কতন্ত্র আসছে…”

তিনি আরও বলেন, “দেশে সামরিক বাহিনীর একটা স্বৈরাচারী সরকার আসবে —এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, জনগণ বলবে যাক সামরিক শাসনই আমাদের জন্য ভালো। সে ব্যবস্থা কিন্তু পাকাপোক্ত হয়ে গেছে।”

অধ্যাপক হাশমীর মতে, নির্বাচিত সরকার না টেকার পেছনে মূল কারণ হলো পর্দার আড়ালের শক্তিশালী ষড়যন্ত্র এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যে, সাধারণ মানুষ একসময় বিরক্ত হয়ে সামরিক শাসনকেই ‘মন্দের ভালো’ হিসেবে মেনে নেবে।

হাশমী উল্লেখ করেন, নির্বাচনের পরেও দেশে দুর্যোগ আসবে। লক্ষণ খুবই খারাপ এবং পরিস্থিতি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন বেসামরিক সরকার ব্যর্থ হয়।বর্তমান সরকার এবং সম্ভাব্য নির্বাচিত সরকার মার্কিন ও ভারতীয় স্বার্থের “খপ্পরে” পড়েছে, যা একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচিত সরকারকে টিকতে দেবে না।

অধ্যাপক হাশমী মনে করেন, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলেও তার তৈরি করা ফ্যাসিবাদী ‘সিস্টেম’ বা ব্যবস্থা এখনও বহাল তবিয়তে আছে। তিনি জর্জ অরওয়েলের উপন্যাসের উদাহরণ দিয়ে বলেন, “বিগ ব্রাদার (হাসিনা) বা বিগ সিস্টার চলে গেছে, সিস্টেমটা রেখে গেছে। কিন্তু সিস্টেম সারভাইভ করছে।”

প্রশাসনে এবং নিরাপত্তা বাহিনীতে এখনও হাসিনার অনুগতরা বা তার সময়ের সুবিধালোভীরাই বহাল আছে। হাশমীর মতে, অন্তত ৩০ জন জেনারেল (যাদের মধ্যে সেনাপ্রধানও অন্তর্ভুক্ত) জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার পরেও স্বপদে বহাল আছেন এবং তাদের বিচার হচ্ছে না।

হাসিনা সরকার ইসরায়েল থেকে পেগাসাস কিনেছিল, আর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তার চেয়েও ভয়াবহ নজরদারি যন্ত্র (যেমন: ব্যাকপ্যাক নেটওয়ার্ক অ্যানালাইজার, ওয়াইড টেরেইন সার্চিং টুল) কিনছে, যা দিয়ে নাগরিকদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হবে।

অধ্যাপক হাশমী বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অত্যন্ত নাজুক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ড. ইউনূস সরকার সম্পর্কে তিনি বলেন, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করছে এবং তাড়াহুড়ো করে এমন সব নজরদারি যন্ত্র কিনছে যার ম্যান্ডেট তাদের নেই। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সংসদ না থাকা সত্ত্বেও কেন জনগণের টাকা খরচ করে এসব যন্ত্র কেনা হচ্ছে?

তাজ হাশমীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ‘ডিপ স্টেট’ (সামরিক বাহিনী, আমলাতন্ত্র এবং বিদেশি শক্তির সমন্বিত রূপ) মূলত একটি নিয়ন্ত্রিত শাসনব্যবস্থা চায়। পর্দার অন্তরালে সামরিক একনায়কতন্ত্রের প্রস্তুতি চলছে। এই শক্তি চায় এমন একটি সরকার—যারা তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং জনগণের জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থাকবে।

হাশমী উল্লেখ করেন, কোনো সামরিক সরকারই বেসামরিক রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের সহায়তা ছাড়া টিকতে পারে না। বর্তমানেও একদল বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ, সামরিকীকরণের পথ প্রশস্ত করছেন। যারা বর্তমানে কলকাঠি নাড়ছেন (যেমন সেনাপ্রধান ও আমলারা), তাদের মধ্যে ‘হাসিনার ভূত’ রয়েছে। তারা নিরাপত্তা বা গণতন্ত্রের চেয়ে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারিতেই বেশি আগ্রহী।

রাজনৈতিক দলগুলোর বর্তমান কর্মকাণ্ড নিয়ে অধ্যাপক হাশমী চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “যেরকম বিভেদ দেখছেন, যে দ্বন্দ্ব দেখছেন, গালাগালি দেখছেন, জামাত এবং অন্যান্যরা যেভাবে উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলছে তাতে লক্ষণ খুব ভালো নয়।”

নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর কেউই সুস্থ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। হাশমী উল্লেখ করেন, নির্বাচনে দাঁড়াতে ১০ কোটি টাকা খরচ করার সংস্কৃতি প্রমাণ করে যে, তারা জনসেবা নয় বরং ক্ষমতায় গিয়ে হাজার কোটি টাকা চুরির পরিকল্পনা করছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর বেশিরভাগ নেতাই ব্যবসায়ী এবং তাদের মূল লক্ষ্য থাকে ক্ষমতায় গিয়ে সম্পদ বৃদ্ধি করা। প্যালেস্টাইনের মতো মানবিক ইস্যুতে তাদের কোনো অবদান না থাকলেও নির্বাচনে কোটি কোটি টাকা খরচে তারা পিছপা হয় না।

অধ্যাপক হাশমীর মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর এই দেউলিয়াপনা এবং বিদেশি শক্তির সহায়তায় সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা দখলের আকাঙ্ক্ষা— বাংলাদেশকে আবারও একটি দীর্ঘমেয়াদী সামরিক বা আধা-সামরিক শাসনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বিএনএনিউজ/সৈয়দ সাকিব।

Loading


শিরোনাম বিএনএ