বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র-পর্ব-৮৯

২৭ আগস্ট, ১৯৭১
বিদেশী পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে যে, পাকিস্তানী জঙ্গীশাহী বাংলাদেশের দখলীকৃত এলাকার তথাকথিত দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত গণপ্রতিনিধিদের শূন্য আসনগুলির উপনির্বাচন অনুষ্ঠান স্থগিত রাখতে চায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে ৭৯ জন অনুসারীকে দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে তাদের সদস্যপদ খারিজ করা হয়েছে, তাদের জায়গায় আগামী নভেম্বর মাসে উপনির্বাচন হবে বলে ইয়াহিয়া খানই ঘোষণা প্রচার করেছিল। লণ্ডনের ‘ডেলী টেলিগ্রাফ’ পত্রিকা জানিয়েছে যে, নির্বাচনে দাঁড়াবার মত দালাল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলেই ইয়াহিয়া খান উপনির্বাচন স্থগিত রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এর আরেকটা কারণ হচ্ছে গেরিলাদের অপ্রতিহত তৎপরতা। তারা যে কোনভাবে হোক উপনির্বাচনের প্রহসন ঠেকিয়ে রাখবেই। ‘ডেলী টেলিগ্রাফ’ বলেছে, ইয়াহিয়া খান খুব শিগগিরই উপনির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবে। বলা নিষ্প্রয়োজন, যা ঘটতে যাচ্ছে তা অপ্রত্যাশিত বা আকষ্মিক কিছু নয়।

আরো পড়ুন

ছাদ থেকে পড়ে প্রাণ গেল দুই শিশুর

গত ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচন ছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরবর্তী তেইশ বছরের প্রথম নির্বাচন। এই নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ ভোট দিয়েছে শোষক ষড়যন্ত্রী শাসকের কব্জা থেকে নিজেদের ভাগ্য ছিনিয়ে আনার দুর্বার আকাঙ্ক্ষায়। বিজয়ী করেছে তাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিব এবং তার দল আওয়ামী লীগকে। দেশ ও দেশবাসীর প্রতি বঙ্গবন্ধুর অপরিসীম ভালোবাসা এবং তার প্রতি জনগণের অকুন্ঠ বিশ্বাস ও আস্থাই নেতা ও জনতাকে পরস্পরের কাছাকাছি টেনে এনেছে। এই নৈকট্যবোধ ও ঘনিষ্ট সম্পর্কই প্রতিফলিত হয়েছে নির্বাচনী রায়ে।এই নির্বাচনের লক্ষ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। কিন্তু নির্বাচনী রায় যখন শেখ মুজিবের পক্ষে গেল, যখন শোষক ষড়যন্ত্রকারী গণদুশমন শাসকরা বুঝতে পারলো যে, শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার মানে হলো নিজেদের কবরের উপর জনতার বিজয়-কেতন উড্ডীন করা, ওরা প্রমাদ গণলো। লিপ্ত হলো নির্বাচনী রায় বানচালের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে। ন্যায়-নীতি বিবেকের মাথা খেয়ে জঙ্গীশাহী জনতা, গণপ্রতিনিধিবর্গ আর তাদের নেতা শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে শুরু করলো নতুন চক্রান্ত।

উদ্দেশ্য- যে কোনভাবেই হোক পরিষদের অধিবেশন বাতিল এবং শেখ মুজিবকে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ লাভ থেকে বঞ্চিত রাখতেই হবে। আর এই দুরভীসন্ধি হাসিলের জন্য কি না করেছে জঙ্গীশাহী। রক্তগঙ্গা সৃষ্টি করেছে ওরা বাংলাদেশে- খুন, জখম, লুট, নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এমন কোন খারাপ কাজ নেই ওরা করেনি। এমনকি তাতেও যখন কাজ হয়নি মাথা নত করেনি বাংলার নেতা ও জনতা জল্লাদ ইয়াহিয়া কলমের এক খোঁচায় খারিজ করেছে পৌনে তিনশত গণপ্রতিনিধির সদস্যপদ। কারণ, ইয়াহিয়া ভেবেছিল আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্যদের এসব শূন্যপদে উপনির্বাচন করে দালালদের পার করিয়ে নেওয়া যাবে, গঠন করা যাবে একটি পুতুল সরকার- যে সরকারের একমাত্র দায়িত্ব হবে জল্লাদের পা চাটা।

কিন্তু বিধি বাম, বাংলার মাইর দুনিয়ার বাইর। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা আর বীর জনতার মিলিত প্রতিরোধের সামনে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে ইয়াহিয়ার তোগলকি খোয়াব।…..করবে।…

(তথ্যসুত্র:বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র -৫ম খন্ড। পৃষ্ঠা নং ১১২) চলবে।

আরও পড়ুন :

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র-পর্ব-৮৮

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র-পর্ব-৮৭

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র-পর্ব-৮৬

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র-পর্ব-৮৫

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র-পর্ব-৮৪

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র-পর্ব-৮৩

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র-পর্ব-৮২

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র-পর্ব-৮১

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র-পর্ব-৮০

সম্পাদনা: এইচ চৌধুরী, গ্রন্থনায়: ইয়াসীন হীরা