বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র-পর্ব-৮৮

গণপ্রতিনিধির দ্বায়িত্ব পালনের এমন দুর্বার আগ্রহ তাদের ছিল বলেই নির্বাচন বিজয়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বারবার জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবানের জন্য ইয়াহিয়ার প্রতি আহবান জানিয়েছিলেন। এজন্য তিনি ১৫ই ফেব্রুয়ারী তারিখটিও নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ইয়াহিয়াই নানা টালবাহানা করেছে। শেষ পর্যন্ত তারই খুশিমত ১লা মার্চ নির্ধারিত হয়েছিল জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনের তারিখ। কিন্তু সেদিনও পরিষদের অধিবেশন বসতে দেয়নি ইয়াহিয়া খানই-গণপ্রতিনিধিরা নয়। আর এভাবেই শাসনতন্ত্র রচনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালনের পথ গণপ্রতিনিধিদের সামনে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অথচ আজ হঠাৎ করে সেই জঙ্গীশাহীর মুখেই শোনা যাচ্ছে গণপ্রতিনিধিদের প্রতি দায়িত্ব পালনের আবেদন। শুনে চমকে উঠতে হয় ভূতের মুখে রাম নাম শোনার মত।
কিন্তু আর যাই হোক হঠাৎ করে জঙ্গীশাহীর এই সুমতির পেছনে যে কোন সাধু উদ্দেশ্য নেই তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেদিন ও আজকের অবস্থাটার দিকে তাকালেই জল্লাদী আবেদনের গোমরটা ফাঁস হয়ে যাবে।

আরো পড়ুন

৩১০ সদস্যের জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগের সদস্যসংখ্যা ১৬৭। ৩০০ সদস্যের বাংলাদেশ পরিষদেও আওয়ামী লীগের সংখ্যা ২৮৮। যদি মার্চের ১ তারিখে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসতো, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আওয়ামী লীগ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একটি শাসনতন্ত্র রচনা করতে পারতো, ক্ষমতাসীন হতে পারতো। ফলে সমাধী রচিত হতো জঙ্গীশাহীর। কিন্তু তা হতে দিতে চায়নি জল্লাদ ইয়াহিয়া। আর চায়নি বলেই ষড়যন্ত্র আর শঠতার আশ্রয় নিয়ে সে সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছে বাংলার মানুষের ওপর।

লক্ষ লক্ষ মানুষকে খুন করে, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে, অসংখ্য ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দিয়ে, প্রায় এক কোটি মানুষকে দেশান্তরী করেও ইয়াহিয়া বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিদের বিবেককে কিনে নিতে পারেনি। তাই সেই বিবেকহীন জল্লাদ কলমের এক খোঁচায় জবাই করেছে আওয়ামী লীগের ৭৯ জন জাতীয় পরিষদ এবং ১৯০ জন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যকে। ইয়াহিয়ার দৃষ্টিতে তার পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ পরিষদে আওয়ামী লীগের টিকেটে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিরা এখন সংখ্যালঘু। শেখ মুজিব কারাগারে।

পাকিস্তানের সাবেক জঙ্গীশাসক আইয়ুবের জারজ সন্তান এবং বর্তমান শাসক ইয়াহিয়ার লেজুর ভুট্টোর দল এখন জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগুরু। সুতরাং আর ভয় নেই। তাইতো আজ জল্লাদ ইয়াহিয়া মেহেরবানি করে পরিষদ সদস্যদের প্রতি দায়িত্ব পালনের আবেদন জানিয়েছে। কিন্তু বড় দেরী হয়ে গেছে। এ আবেদন আজ শুধু মানুষের মনে বিদ্রুপ, ঘৃণা আর ধিক্কারই সৃষ্টি করবে।…

(তথ্যসুত্র:বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র -৫ম খন্ড। পৃষ্ঠা নং ১১১) চলবে।

আরও পড়ুন: 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র-পর্ব-৮৭

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র-পর্ব-৮৬

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র-পর্ব-৮৫

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র-পর্ব-৮৪

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র-পর্ব-৮৩

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র-পর্ব-৮২

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র-পর্ব-৮১

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র-পর্ব-৮০

সম্পাদনা: এইচ চৌধুরী, গ্রন্থনায়: ইয়াসীন হীরা