বিএনএ, ডেস্ক : রাষ্ট্রীয় সারকারখানা সিইউএফএল-এ হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর না করেই আরিফ নামের এক কর্মচারীর নিয়মিত বেতন-ভাতা তোলার অকাট্য প্রমাণসহ গত ১৮ আগস্ট একটি অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশ করে বিএনএ নিউজ টুয়েন্টিফোর। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে কারখানায় শুরু হয়েছে নতুন জালিয়াতি। অনুপস্থিত দিনগুলোতে ব্যাক ডেট স্বাক্ষর, ক্যাজুয়াল লিভ ও ট্রাভেল ট্যুর দেখিয়ে নথিপত্র টেম্পারিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। আর এই পুরো জালিয়াতি ধামাচাপা দিতে আড়াল থেকে মরিয়া হয়ে উঠেছে খোদ কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মিজান চক্র।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, হাজিরা চোর এমও আরিফকে রক্ষা করতে কেন এত মরিয়া হয়ে উঠেছে খোদ সিএফএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান, প্রধান রসায়নবিদ উৎপাদন বিভাগীয় প্রধান উত্তম চৌধুরী, অতিরিক্ত রসায়নবিদ এমপিএম এন্ড ব্যাগিং ইউনিট প্রধান জহিরুল হক । তারা যে ভয়ঙ্কর জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন, তা দেখলে আপনার চোখ চড়কগাছ হতে বাধ্য!কিসের স্বার্থে শীর্ষ কর্মকর্তাদের এই প্রাতিষ্ঠানিক জালিয়াতি?
সিইউএফএল এর সাধারণ শ্রমিকরা মনে করছেন, দূর্নীতি দমন কমিশন, বিসিআিইসির তদন্ত কমিটিকে ফাঁকি দিতে এবং বিএনএ নিউজ টুয়েন্টিফোর এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনকে ভূয়া প্রমাণ করতে খোদ হাজিরা খাতায় ভুয়া ব্যাকডেট স্বাক্ষর এবং কাল্পনিক অফিসিয়াল ট্যুর দেখানো হয়েছে! আজ আমরা উন্মোচন করব সিইউএফএল-এর শীর্ষ সিন্ডিকেটের সেই ‘চতুরঙ্গ’ দূর্নীতি ও জালিয়াতির আদ্যোপান্ত! দেখুন আমাদের আজকের বিশেষ ফলো-আপ প্রতিবেদন.
অনুসন্ধানে জানা যায়, মাস্টার অপারেটার আরিফুলের সিইউএফএল-এ কাজ না করে মাসের পর মাস বেতন তোলার ইতিহাস নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে অতিরিক্ত রসায়নবিদ ব্যাগিং সেকশনের প্রধান জহিরুল হকের প্রত্যক্ষ মদদে আরিফ কারখানায় হাজিরা না দিয়েও নিয়মিত বেতন-ভাতা, অফিসিয়াল ট্যুর ও ওভারটাইমের টাকা পকেটে পুরে যাচ্ছিলেন । এই স্বেচ্ছাচারিতা সিইউএফএল-এর সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। কাজের সময় তাকে কারখানায় খুঁজে পাওয়া না গেলেও, মাসের শেষে বেতন এবং ওভারটাইমের শীটে তার নাম সবার উপরে জ্বলজ্বল করত। কারখানার বাকিরা হাড়ভাঙা খাটুনি খাটলেও, ঢাকায় স্বপরিবারে বসবাস করা আরিফুলের জন্য বরাদ্দ ছিল বিশেষ এক ‘আলাদিনের চেরাগ’। আর সেই চেরাগের তিন রূপকার হলেন, প্রধান রসায়নবিদ ও উৎপাদন বিভাগীয় প্রধান উত্তম চৌধুরী, অতিরিক্ত রসায়নবিদ এমপিএম এন্ড ব্যাগিং ইউনিট প্রধান জহিরুল হক এবং খোদ এমডি মিজানুর রহমান!
কিন্তু আরিফ-সিন্ডিকেটের সেই সুখের ঘরে বজ্রপাত হয়ে আসে গত ১৮ই আগস্টের বিএনএ নিউজ টুয়েন্টিফোর-এর এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদন। আমরা খাতা-কলমে প্রমাণসহ দেখিয়েছিলাম গত দুই বছর ধরে কাজ না করে বেতন নিয়ে যাচ্ছে এমও আরিফুল ইসলাম। প্রমাণ হিসাবে হাজিরা খাতার ছবি তুলে ধরে দেখিয়েছিলাম আগস্ট মাসের ১৫ দিনের মধ্য পহেলা আগস্ট ছাড়া সব দিন আরিফ কারখানায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল!
এই সংবাদ প্রচারের পরপরই বিসিআইসি হেডকোয়ার্টার নড়েচড়ে বসে এবং একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। আর ঠিক তখনই ফেঁসে যাওয়ার ভয়ে কাঁপন ধরে যায় সিইউএফএল-এর এমডি মিজানুর রহমান এবং ব্যাগিং প্রধান জহিরুলের চেয়ারে। কারণ আরিফ ডুবলে, এই তিন রাঘববোয়ালও যে সাথে ডুববে—তা তারা ভালো করেই জানেন। সেকারণে নিজেদের চেয়ার বাঁচাতে এবং তদন্ত কমিটিকে ফাঁকি দিতে গত কয়েকদিনে সিইউএফএল-এর ভেতরে বসে তৈরি করা হয়েছে এক ভয়ঙ্কর জালিয়াতির চিত্রনাট্য!
আমাদের কাছে আসা নির্ভরযোগ্য তথ্য বলছে, বিএনএ নিউজ টুয়েন্টিফোর-এর প্রতিবেদনটি মিথ্যা প্রমাণ করতে এবং তদন্ত কমিটিকে ধোঁকা দিতে আগস্ট মাসের হাজিরা খাতা নতুন করে সাজানো হয়েছে। আরিফুল যে দিনগুলোতে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল, সেই দিনগুলোর ফাঁকা ঘরে রাতারাতি ব্যাকডেটে আরিফুলের ভুয়া স্বাক্ষর, ‘ক্যাজুয়াল লিভ’, আবার কোথাও কাল্পনিক ‘অফিসিয়াল ট্যুর’ দেখানো হয়েছে!
ভাবা যায়? কারখানার ভেতরে পা না দিয়েও একজন কর্মচারী নাকি অফিশিয়াল ট্যুরে ছিলেন—এমন আজগুবি ডায়েরি অনুমোদন দিয়ে দিয়েছেন স্বয়ং এমডি মিজানুর রহমান!
কোনো সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের হাজিরা খাতা এবং নথিপত্র ব্যাকডেটে পরিবর্তন করা, ভুয়া স্বাক্ষর বসানো এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে তদন্ত কমিটিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা স্রেফ ডিপার্টমেন্টাল অনিয়ম নয়—এটি দণ্ডবিধি অনুযায়ী একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধও বটে।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০ সালের প্যানাল কোড-এর ৪৬৬ ধারা অনুযায়ী, সরকারি প্রতিষ্ঠানের হাজিরা খাতার মতো অফিশিয়াল রেজিস্টার জালিয়াতি করার অপরাধে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে । একইসাথে, প্রতারণার উদ্দেশ্যে নথি জালিয়াতি এবং সেই জাল দলিলকে জেনেশুনে আসল হিসেবে ব্যবহার করার কারণে দণ্ডবিধির ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারা এবং সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থ আত্মসাতের দায়ে ৪০৯ ধারা প্রযোজ্য হয়।
এছাড়া, সিইউএফএল-এর শীর্ষ কর্মকর্তারা যেভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে এই দুর্নীতিবাজ কর্মচারী আরিফুল ইসলামকে রক্ষা করতে মাঠে নেমেছেন, তা দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় অপরাধে সরাসরি ‘সহায়তা’ এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারার অধীনে ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল, যার চূড়ান্ত শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
একজন মাস্টার অপারেটরকে বাঁচাতে গিয়ে সিইউএফএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান, প্রধান রসায়নবিদ ও উৎপাদন বিভাগীয় প্রধান উত্তম চৌধুরী, অতিরিক্ত রসায়নবিদ এমপিএম এন্ড ব্যাগিং ইউনিট প্রধান জহিরুল হক এই গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের সরাসরি অংশীদার হয়ে গেলেন।
বিসিআইসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সিইউএফএল-এর সাধারণ কর্মচারীদের এখন একটাই প্রশ্ন—একজন সাধারণ কর্মচারীর দুর্নীতি ঢাকতে খোদ এমডি কেন নিজের গোটা ক্যারিয়ার বাজি রেখে এমন নজিরবিহীন জালিয়াতির জাল বুনছেন? আরিফুলের হাতে এমন কোন অদৃশ্য শক্তি বা আলাদিনের চেরাগ আছে, যার বিনিময়ে তাকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে বছরের পর বছর সিইউএফএল-এর এমডি নিজের অনড় অবস্থান নিশ্চিত করে চলেছেন? এই গোপন আঁতাত এবং রহস্যময় শক্তির উৎস খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি।
ভুয়া স্বাক্ষর কিংবা কাল্পনিক ট্যুর ডায়েরির স্ক্রিপ্ট সাজিয়ে তদন্ত কমিটিকে হয়তো সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত করা যাবে, কিন্তু বিএনএ নিউজ টুয়েন্টিফোর-এর ক্যামেরায় যে সত্য একবার বন্দী হয়েছে, তাকে মুছে ফেলার সাধ্য এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের নেই। আমরা বিসিআইসি-র চেয়ারম্যান এবং দূর্নীতি দমন কমিশনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি—সিইউএফএল-এর এই জালিয়াতির খাতা এবং সিসিটিভি ফুটেজ গভীরভাবে পরীক্ষা করার পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে এম্ও আরিফুল ইসলামের মোবাইল ট্র্যাক করে ওই সময়ের লোকেশনের তথ্য সংগ্রহ করা হোক। একই সঙ্গে মাস্টার অপারেটর আরিফুল ইসলামকে কর্মস্থলে উপস্থিত না থেকে বছরের পর বছর বেতন ভাতা গ্রহণ এবং সিবিএ’র ভূয়া নেতা সাজিয়ে অফিসিয়াল ট্যুর এর মাধ্যমে বিশেষ সুবিধা প্রদান ও এই জালিয়াতির বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্ত করে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে এই সিন্ডিকেটকে শাস্তির আওতায় আনা হোক।
শামীমা চৌধুরী শাম্মী
![]()

