33 C
আবহাওয়া
৬:০২ অপরাহ্ণ - আগস্ট ২২, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » বাংলাদেশ কি আবারও ১৯৯৫-এর দিকে এগোচ্ছে?

বাংলাদেশ কি আবারও ১৯৯৫-এর দিকে এগোচ্ছে?


বিএনএ ডেস্ক: যে দেশের মেরুদণ্ড কৃষি, সেই মেরুদণ্ডে আজ চরম আঘাত লেগেছে। বাংলাদেশে আজ সারের তীব্র সংকট, কিন্তু কেন? আমাদের কারখানা আছে, কোটি কোটি টাকার প্রযুক্তি আছে, নেই শুধু সচল রাখার সদিচ্ছা আর গ্যাস! কারখানাগুলো আজ মৃতপ্রায়, আর তার মাশুল দিতে গিয়ে মাঠপর্যায়ে হাহাকার করছেন লাখ লাখ কৃষক। ইতিহাসের চাকা যেন ঠিক ৩১ বছর পেছনে ঘুরে গেছে। ১৯৯৫ সালের সেই রক্তঝরা দিনগুলোর কথা মনে আছে? সারের দাবিতে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিতে হয়েছিল কৃষকদের। আজ আবারও যখন সারের হাহাকার চারদিকে, তখন প্রশ্ন জাগে—ইতিহাসের সেই  রক্তাক্ত অধ্যায় কি তবে আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে? আমরা কি এক মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি? ২০২৬ সালে আবার কি কৃষকের রক্তে লাল হবে সবুজ শ্যামল দেশ?

আজ আমরা তুলে ধরবো কেন দেশ সার সংকটের কবলে পড়েছে? দেশের সার কারখানা গুলোর উৎপদান চিত্র। ৩৩ বছর আগে বিএনপি জামায়াত ক্ষমতাসীন থাকাকালে সার সংকটকালে কী ঘটেছিল? বিস্তারিত জানতে প্রতিবেদনটি শেষ পর্যন্ত দেখুন। এবার আসা যাক বিশ্লেষণে।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন বা বিসিআইসি এর অধীনে সার কারখানা রয়েছে মোট ৭টি। এই ৭টি রাষ্ট্রীয় কারখানার মোট বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৩৭ লাখ মেট্রিক টন। আসুন জেনে নেওয়া যাক কারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা:

ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা: এটি দেশের সর্বাধুনিক ও বৃহত্তম কারখানা, যার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৯ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন।

শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড : সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে অবস্থিত এই কারখানার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৫ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন।

চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড : এটি চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত, যার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৫ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন।

যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড : জামালপুরের তারাকান্দিতে অবস্থিত এই কারখানার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৪ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন।

আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড : এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থিত, যার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৫ লাখ ২৮ হাজার মেট্রিক টন।

ড্যাপ ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড : চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত এই কারখানাটি ডায়ামোনিয়াম ফসফেট উৎপাদন করে। যার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৫ লাখ ২৮ হাজার মেট্রিক টন।

ট্রিপল সুপার ফসফেট কমপ্লেক্স লিমিটেড : চট্টগ্রামে অবস্থিত এই কারখানাটি টিএসপি সার উৎপাদন করে। যার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ১ লাখ মেট্রিক টন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে বার্ষিক সারের মোট চাহিদা প্রায় ৬০ থেকে ৬৬ লাখ মেট্রিক টন। যার মধ্যে শুধু ইউরিয়া সারের চাহিদাই প্রায় ২৬ থেকে ৩০ লাখ টন। এই ৭টি কারখানা পূর্ণ ক্ষমতায় চললে সংকটের অনেকটাই দেশীয় উৎপাদনেই সমাধান সম্ভব হতো। কিন্তু তীব্র গ্যাস এবং কাঁচামাল সংকটের কারণে এই ৭টি কারখানার মধ্যে ৬টিই বর্তমানে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে!

গ্যাস সংকটে বন্ধ সার কারখানা গুলো হচ্ছে, ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা, যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড, আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড।

এছাড়া কাঁচামাল বা অ্যামোনিয়া সংকটে বন্ধ রয়েছে ড্যাপ ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড ও টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড।

বর্তমানে একমাত্র সচল সার কারখানা রয়েছে, শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড। গ্যাস সংকটের এই মহাসময়ে দেশের একমাত্র এই ইউরিয়া কারখানাটি সীমিত পরিসরে বা জোড়াতালি দিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে পেরেছে।  যার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৫ লাখ ৮০ হাজার টন হলেও, এককভাবে এটি দিয়ে পুরো দেশের সারের চাহিদা মেটানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।  ফলে দেশের আভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই মুখ থুবড়ে পড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের আভ্যন্তরীণ উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ১১ লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টনে! চাহিদার সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৮০% সারই এখন বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে আমদানি করতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশে নিজস্ব কারখানায় উৎপাদিত প্রতি টন ইউরিয়া সারের গড় উৎপাদন খরচ প্রায় ১৬,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সার আমদানি করতে প্রতি টন ইউরিয়া সারে গড়ে খরচ পড়ে প্রায় ৪৬,৮০০ থেকে ৫১,৬০০ টাকা।  যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর এটি এক বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে।

প্রসঙ্গত, আমদানিকৃত সার কৃষকদের কাছে কম দামে পৌঁছে দিতে সরকারকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিকে আরও সংকটে ফেলছে।

বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের খুচরা মূল্য সরকারিভাবে ২৭ টাকা । অর্থাৎ, ১ টন  ইউরিয়া সার কৃষকেরা কিনতে পারেন মাত্র ২৭,০০০ টাকায়।  যেখানে আমদানিতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৫০,০০০ টাকা।  বিদেশ থেকে আনা সারের ক্ষেত্রে সরকারকে প্রতি টনে প্রায় ২০,০০০ থেকে ২৪,০০০ টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

সারাদেশে চলমান এই সার সংকট আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।

প্রথমত, সময়মতো সার না পেলে আমন ও বোরো মৌসুমের ধান উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

দ্বিতীয়ত, বাজারে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে খুচরা পর্যায়ে ডিলার ও বিক্রেতারা কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম হাতিয়ে নিচ্ছে।

তৃতীয়ত, উৎপাদন কমলে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাহিরে চলে যাবে, যা দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য ঘাটতি তৈরি করতে পারে।

এবার আসা যাক ইতিহাসের সেই স্পর্শকাতর অধ্যায়ে।  ১৯৯৫ সালের মার্চ মাসে ঠিক এইরকম এক বোরো মৌসুমে সারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল।  তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। সারের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে নওগাঁর সাপাহারে পুলিশের গুলিতে ১৮ জন কৃষকসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ২৪ জন কৃষক নিহত হন।

বর্তমানেও দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি ক্ষমতায় রয়েছে। কাকতালীয়ভাবে, এবারও সারের একটি বড় সংকট দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে, ডিলারের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কৃষকেরা কাঙ্ক্ষিত সার পাচ্ছেন না। তাহলে কি আবারও ১৯৯৫ সালের সেই ভয়াবহ সংকটের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে?

বিশ্লেষকরা বলছেন—পরিস্থিতি কিছুটা এক হলেও, প্রেক্ষাপটে তফাত আছে। ১৯৯৫ সালের সংকটটি ছিল মূলত ব্যবসায়ী-ডিলারদের সিন্ডিকেট এবং মুক্তবাজার নীতির অব্যবস্থাপনার কারণে তৈরি কৃত্রিম সংকট। আর বর্তমানের সংকটটি মূলত গ্যাস  সংকটের কারণে সৃষ্ট উৎপাদন ঘাটতি। তবে কারণ যাই হোক, মাঠপর্যায়ে কৃষকের কষ্টটা কিন্তু একই। যদি সরকার দ্রুত এই সার ও গ্যাস সংকটের সমাধান করতে না পারে, তবে কৃষকদের ক্ষোভ রাজপথে আছড়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

শামীমা চৌধুরী শাম্মী

বিএনএ নিউজ টুয়েন্টিফোর

Loading


শিরোনাম বিএনএ