32.9 C
আবহাওয়া
৮:৩৮ অপরাহ্ণ - জুন ১১, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » কেমন হবে বিএনপির পাশা ও জামায়াতের আলাউদ্দিনের লড়াই?

কেমন হবে বিএনপির পাশা ও জামায়াতের আলাউদ্দিনের লড়াই?


বিএনএ, ডেস্ক : সন্দ্বীপ। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত চট্টগ্রাম জেলার একটি দ্বীপ উপজেলা। এর উত্তরে নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে সীতাকুণ্ড ও মীরসরাই উপজেলা এবং বঙ্গোপসাগর, পশ্চিমে নোয়াখালীর হাতিয়া দ্বীপ এবং মেঘনা নদীর মোহনা। চট্টগ্রাম জেলা সদর থেকে নৌপথে সন্দ্বীপের দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার। ১৯৫৪ সালের আগে এটি নোয়াখালী জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

YouTube player

সন্দ্বীপের নামকরণের সঠিক ইতিহাস নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রচলিত রয়েছে । জনশ্রুতি আছে, ইরাকের বাগদাদ থেকে চট্টগ্রামগামী ১২ জন আউলিয়া সমুদ্রের মাঝে এই জনমানবশূন্য দ্বীপটি আবিষ্কার করেন এবং এর নাম দেন ” শূন্য দ্বীপ’’। কালক্রমে এটি ‘সন্দ্বীপ’ নামে পরিচিতি পায়। ইতিহাসবেত্তা বেভারিজের মতে চন্দ্র দেবতা ‘সোম’ এর নামানুসারে এই এলাকার নাম হয়েছিল ‘সোম দ্বীপ’ যা পরবর্তীতে ‘সন্দ্বীপে’ রুপ নেয়। কেউ কেউ দ্বীপের উর্বরতা ও প্রাচুর্যের কারণে দ্বীপটিকে ‘স্বর্ণদ্বীপ’ আখ্যা প্রদান করেন।  দ্বীপের নামকরণের আরেকটি মত হচ্ছে পাশ্চাত্য ইউরোপীয় পর্যটকগণ  বাংলাদেশে আগমনের সময় দূর থেকে দেখে এই দ্বীপকে বালির স্তুপ বা তাদের ভাষায় ‘স্যান্ড-হিপ’ (Sand-Heap) নামে অভিহিত করেন এবং তা থেকে বর্তমান ‘সন্দ্বীপ’ নামের উৎপত্তি হয়।

সন্দ্বীপের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং এই দ্বীপ থেকে অনেক বিখ্যাত ও কৃতি ব্যক্তিত্ব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এদের মধ্যে অন্যতম, রেডিওতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারী দ্বিতীয় ব্যক্তি আবুল কাসেম সন্দ্বীপ, মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি আব্দুল হাকিম, প্রখ্যাত ভাষাবিদ, নাট্যকার ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. রাজিব হুমায়ুন, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ, অর্থনীতিবিদ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের  উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।

চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় এলাকার মধ্যে আয়তনের দিক থেকে সন্দ্বীপ দ্বিতীয় বৃহত্তম। যা চট্টগ্রাম-৩ নামে পরিচিত। এটি জাতীয় সংসদের ২৮০ তম আসন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ৫জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও তিনজনের মনোনয়ন পত্র বাতিল হয়ে যায়। বাকী থাকে দুইজন। তারা হচ্ছেন  বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মদ আলাউদ্দীন সিকদার। কেমন হবে আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ভোটের লড়াই? সেই বিশ্লেষণে

১৯৯১ সালের ২৭ই ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই আসনে ভোটার ছিলেন ১ লাখ ৬৭ হাজার ২ শত ২২ জন। ভোট প্রদান করেন ৮৫ হাজার ৬ শত ৪৭ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের  মোস্তাফিজুর রহমান বিজয়ী হন। নৌকা  প্রতীকে তিনি পান ৫৫ হাজার ৫ শত ২৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির এ কে এম রফিক উল্যাহ চৌধুরী । ধানের শীষ  প্রতীকে  তিনি পান ২২ হাজার ৮ শত ৫ ভোট ।

১৯৯৬ সালের ১২ই জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১ লাখ ২১ হাজার ৮ শত ৯৯ জন। ভোট প্রদান করেন ৭৯ হাজার ৬ শত ৫৩ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মোস্তাফিজুর রহমান  বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৪০ হাজার ৯ শত ১১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির মোস্তফা কামাল পাশা । ধানের শীষ  প্রতীকে  তিনি পান ৩৩ হাজার ৫ শত ৫৭ ভোট।

২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১ লাখ ৬০ হাজার ৯ শত ২৩ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৯ হাজার ৮৮ জন। নির্বাচনে বিএনপির মোস্তফা কামাল পাশা বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে  তিনি পান ৬৯ হাজার ৫ শত ৪৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের মোস্তাফিজুর রহমান। নৌকা প্রতীকে   তিনি পান ৩৯ হাজার ১ শত ৩৫ ভোট।

২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১ লাখ  ৫২  হাজার ৯ শত ৮০ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ১৬ হাজার ৮ শত ৮২ জন। নির্বাচনে বিএনপির মোস্তফা কামালা পাশা  বিজয়ী হন। ধানের শীষ   প্রতীকে  তিনি পান  ৬২ হাজার ৩ শত ৯৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহফুজুর রহমান মিতা। আনারস প্রতীকে তিনি পান ৩৩ হাজার ৫ শত ৪৪ ভোট। আওয়ামী লীগের জামাল উদ্দিন চৌধুরী তৃতীয় হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ২০ হাজার ২ শত ৪৫ ভোট।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনের ফলাফল পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পঞ্চম, সপ্তম,  সংসদে আওয়ামী লীগ, অষ্টম ও নবম  সংসদে বিজয়ী হয় বিএনপি।

এবার আসা যাক,  তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে রাজনৈতিক দলগুলো কত শতাংশ ভোট পেয়েছিল সেই বিশ্লেষণে।

নির্বাচন কমিশনের প্রাপ্ত ফলাফল দেখা যায়, চট্টগ্রাম-৩ সংসদীয় আসনে ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৫১.২২% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৬৪.৮৩%, বিএনপি ২৬.৬৩%, জাতীয় পার্টি ০.৯৭%, জামায়াত ইসলামী ৬.৯৮% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ০.৫৯% ভোট পায়।

১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৬৫.৩৪% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৫১.৩৬%, বিএনপি ৪২.১৩%, জাতীয় পার্টি ০.৩৩%, জামায়াত ইসলামী ৫.৭৮% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ০.৪০% ভোট পায়।

২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৬৭.৭৯% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩৫.৮৭%, ৪ দলীয় জোট ৬৩.৭৫%, জাতীয় পার্টি ০.২৪% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ০.১৪% ভোট পায়।

২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৮২.১৭% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে ৪ দলীয় জোট ৫৩.৩৮%, স্বতন্ত্র ২৮.৭০% ১৪ দলীঁয় জোট ১৭.৩২% , অন্যান্য ০.৬% ভোট পায়।

চলুন দেখে আসি, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন কেমন ছিল? কারা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন?

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে র্নিবাচনের দাবিতে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এই নির্বাচনে অংশ গ্রহণ  করেনি। একতরফা, ভোটারবিহীন এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মাহফুজুর রহমান মিতাকে  বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ২ হাজার ৬ শত ৩৫ জন। এই নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। প্রার্থী ছিলেন ৫ জন। নৌকা  প্রতীকে মাহফুজুর রহমান মিতা, ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির মোস্তফা কামাল পাশা, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনসুরুল হক,  আম প্রতীকে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মোকতাদের আজাদ খান এবং গামছা  প্রতীকে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সেলিম উদ্দীন হায়দার  প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন।

কিন্তু ভোটের আগের দিন রাতে প্রশাসনের সহযোগীতায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর লোকজন নৌকা প্রতীকে  সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখে। রাতের ভোট খ্যাত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মাহফুজুর রহমান মিতাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। কারচুপির অভিযোগে বিএনপির নেতৃতাধীন জাতীয় ঐক্যজাট এই সংসদ নির্বাচন বর্জন ও ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে।

২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি-জামায়াত ইসলামীসহ তাদের সমমনা দল গুলো নির্বাচন বর্জন করে। আমি-ডামি খ্যাত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী এবং আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। ভোটারবিহীন এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মাহফুজুর রহমান মিতাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

আওয়ামী লীগের আমলে অনুষ্ঠিত তিনটি বিতর্কিত ভোটারবিহীন নির্বাচন বাদ দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়,  চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনটি একক কোন রাজনৈতিক দলের ঘাঁটি নয়। এই আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমানে সমান। তৃতীয় স্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তবে ১২ ফেব্রুযারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। নিবন্ধন স্থগিত থাকায় এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোন প্রার্থী নেই।

এবার বিএনপি থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোস্তফা কামাল পাশা। তিনি ২০০১ সালের অষ্টম সংসদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির আলাউদ্দিন সিকদার।

সাদা চোখে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক তৎপরতা দেখা না গেলেও সন্দ্বীপের ২০টি ইউনিয়নেই জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী কমিটি রয়েছে। এই সব কমিটি ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর থেকে ডোর-টু ডোর নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে আসছে। এতে দলটির বিশাল একটি ভোট ব্যাংক তৈরি হয়েছে। এছাড়া আলাউদ্দিন সিকদারের ক্লিন ইমেজের কারণে সাধারণ ভোটারদের  একটি অংশ  দাড়িপাল্লার প্রতীকে সিল মারবে।

বিএনপি প্রার্থী মোস্তফা কামাল পাশা একজন প্রবীন রাজনীতিক। সাধারণ মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সন্দ্বীপে বিএনপি সাংগঠনিক দিক থেকে বেশ শক্তিশালী। এছাড়া বিএনপির চেয়ারপাসন তারেক জিয়া দেশে ফিরে আসার পর সারাদেশে যে গণ জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে তার টেউ আছড়ে পড়েছে বঙ্গোপসাগের মাঝখানে অবস্থিত এই দ্বীপ সংসদীয় এলাকায়।

তবে জয়-পরাজয় অনেকাংশে নির্ভর করছে আওয়ামী লীগের বিপুল ভোট ব্যাংকের ওপর। দলটির বেশিরভাগ ভোটার এলাকায় অবস্থান করার জন্য ইতোমধ্যে বিএনপির ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়েছে। তারা ভোট কেন্দ্রে গেলে বিএনপির ধানের শীষে সিল দিবে। সেই ক্ষেত্রে বিএনপির মোস্তফা কামাল পাশা বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে এমনটাই মনে করেন দৈবচয়ন পদ্ধতিতে পরিচালিত বিএনএ নিউজ টুয়েন্টিফোরের জরিপে অংশগ্রহণকারী বেশিরভাগ ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

শামীমা চৌধুরী শাম্মী

 

Loading


শিরোনাম বিএনএ