বিএনএ, বিশ্বডেস্ক : পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেলুচিস্তানকে স্বাধীন করার বজ্রকন্ঠে আহ্বান জানান ডা. মাহরং বালোচ। বর্তমানে পাকিস্তানের একটি কারাগারে বন্দি থাকা বেলুচিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অত্যাচার ও নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে এক বিশাল সমাবেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের উদাহরণ টানেন বালুচ ইয়াকজেহতি কমিটির এই প্রতিষ্ঠাতা।

প্রশ্ন ওঠেছে ’পাকিস্তান’ কি আরও একবার ভেঙে টুকরো হতে চলেছে? ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের পর, এই ২০২৬ সালের আগস্টে এসে পাকিস্তানের বুকে কি জন্ম নিতে যাচ্ছে আরেকটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র? ‘স্বাধীন বেলুচিস্তান’—এই দাবিতে এখন কাঁপছে পুরো দক্ষিণ এশিয়া। আগামী ১১ই আগস্ট প্রতিটি বাড়ি, পাড়া-মহল্লা, স্কুল-কলেজ এবং সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় বেলুচিস্তানের স্বাধীন পতাকা উত্তোলনের চূড়ান্ত ডাক দিয়েছে স্বাধীনতাকামীরা। যে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৪ শতাংশ, সেই বিশাল অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ আজ পুরোপুরি হাতছাড়া হওয়ার মুখে ইসলামাবাদের।
কেন দশকের পর দশক ধরে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা এই আগুন আজ চূড়ান্ত দাবানল হয়ে উঠল? কেন বালুচরা যেকোনো মূল্যে পাকিস্তান থেকে চিরমুক্তি চায়? আজকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আমরা উন্মোচন করব শোষণের সেই অন্ধকার ইতিহাস, গা শিউরে ওঠা পরিসংখ্যান এবং এর পেছনের আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি।”
এই লড়াই কিন্তু আজকের বা গতকালকের নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ এক ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতার গল্প, যা শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় আট দশক আগে। ১৯৪৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশ রাজত্বের অবসানের পর, ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না, সেই সময় ‘খান অব কালাট’-এর অধীনে বেলুচিস্তান একটি সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। এমনকি পাকিস্তান নিজেও শুরুতে কালাটের এই স্বাধীন সত্ত্বাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
কিন্তু সেই স্বাধীনতা স্থায়ী হয়েছিল মাত্র কয়েক মাস। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নির্দেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনী চারদিক থেকে বেলুচিস্তান ঘেরাও করে। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে স্বাধীন কালাট রাজ্যকে জোরপূর্বক পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বালুচ জনগণ এই সংযুক্তিকে কখনো মন থেকে মেনে নেয়নি। তাদের চোখে এটি ছিল একটি স্বাধীন ভূখণ্ডকে অবৈধভাবে দখলদারিত্ব এবং চরম এক ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতা। আর সেই ১৯৪৮ সাল থেকেই শুরু হয় বালুচদের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ।
বেলুচিস্তান হলো পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ, যা খনিজ সম্পদে সবচেয়ে ধনী। ১৯৫২ সালে বেলুচিস্তানের ‘সুই’ (Sui) নামক এলাকায় বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাসের খনি আবিষ্কৃত হয়। এই গ্যাস দিয়ে পুরো পাকিস্তানের শিল্প-কারখানা সচল করা হলো, লাহোর-করাচির মতো বড় বড় শহরের বাড়িঘর আলোকিত করা হলো। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যে মাটির বুক থেকে এই গ্যাস বের হলো, সেই বেলুচিস্তানের স্থানীয় মানুষ আজ বুলেটের ধোঁয়া আর অন্ধকারের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
শুধু গ্যাস নয়, বেলুচিস্তানের রেকাদিক এবং সেনডিক এলাকায় রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সোনা ও তামার খনি। প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ এখান থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু তার বিনিময়ে স্থানীয় বালুচ যুবকেরা কী পাচ্ছে? চরম বেকারত্ব, বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট এবং শিক্ষা ও চিকিৎসার নূন্যতম সুযোগ থেকেও বঞ্চিত এক মানবেতর জীবন। বালুচদের সম্পদ দিয়ে ইসলামাবাদ সুখে দিন কাটাচ্ছে, আর বালুচরা নিজেদের মাটিতেই আজ ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছে।”
বর্তমান যুগে এই ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে চীন- পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর এবং মেগা প্রজেক্ট— গোয়াদর বন্দর। আরব সাগরের তীরে অবস্থিত এই কৌশলগত গোয়াদর বন্দরকে চীনের কাছে কার্যত লিজ দিয়েছে পাকিস্তান। হাজার হাজার কোটি টাকার এই প্রজেক্ট গড়ে উঠেছে, বালুচদের শত বছরের পুরনো ভিটেমাটি আর মাছ ধরার ঘাটগুলো উচ্ছেদ করে।
উন্নয়নের নামে পুরো গোয়াদর শহরকে আজ কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে, ঘিরে ফেলা হয়েছে, যেখানে স্থানীয় বালুচদের ঢুকতে হলেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিশেষ পারমিট লাগে! এই প্রজেক্টে যত চাকরি বা ব্যবসা তৈরি হয়েছে, তার সব সুবিধা পাচ্ছে পাঞ্জাবি আর চীনা নাগরিকেরা। স্থানীয়রা কোনো সুফল তো পায়ইনি, উল্টো তারা নিজেদের ভূমিতেই আজ বহিরাগত এবং চরম প্রান্তিকতার শিকার। বালুচদের কাছে এই চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর এখন ‘উন্নয়ন’ নয়, বরং ‘চীনা উপনিবেশবাদ’।
অধিকারের কথা বললেই বালুচদের কপালে জোটে রাষ্ট্রীয় নির্যাতন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের রিপোর্ট অনুযায়ী, পরিস্থিতি এখন এক চরম রূপ নিয়েছে। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে গা শিউরে ওঠে! হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল অব বেলুচিস্তানের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ১২৪ জন এবং জুন মাসে ৬৩ জন বালুচ নাগরিককে জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় সদ্য সমাপ্ত জুলাই মাসেও গুমের ঘটনা এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এমনকি গত ২৪শে জুলাই বেলুচ ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ নেতা জিয়ান্দ বালোচকেও তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যার কোনো হদিস আজও মেলেনি।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই নিখোঁজ হওয়া মানুষদের মধ্যে ৫৭ শতাংশই হলো তরুণ ছাত্র সমাজ, যা বালুচদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে ধ্বংস করার একটি সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় চেষ্টা। বছরের পর বছর ধরে বালুচ মায়েরা তাদের সন্তানদের ছবি হাতে নিয়ে হাজার কিলোমিটার পায়ে হেঁটে লং মার্চ করছেন। কিন্তু রাষ্ট্র তাদের চোখের জলের জবাব দিচ্ছে, বুলেট আর লাঠিচার্জ দিয়ে। এই নির্মম অত্যাচারই আজ শিক্ষিত বালুচ তরুণ-তরুনীদের, অস্ত্র, হাতে তুলে নিতে বাধ্য করছে।”
কিন্তু এখানে একটি বড় প্রশ্ন জাগে—পাকিস্তানের মতো একটি পারমাণবিক ও বিশাল সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এই বেলুচ আর্মি, অস্ত্র আর অর্থ, পাচ্ছে কোথা থেকে?
পাকিস্তান সরকারের দীর্ঘদিনের দাবি—এর পেছনে সরাসরি হাত রয়েছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভকে কাউন্টার করতে এবং পাকিস্তানকে ব্যস্ত রাখতে ভারত, আফগান ও ইরান সীমান্ত ব্যবহার করে বেলুচ লিবারেশন আর্মি -কে কোটি কোটি ডলার ফান্ডিং ও লজিস্টিকস সহায়তা দিচ্ছে বলে ইসলামাবাদের স্পষ্ট অভিযোগ। যদিও ভারত সরকার সবসময় এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
তবে কেবল ভারতই নয়, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর সেখানে অবিন্যস্তভাবে ফেলে যাওয়া আধুনিক আমেরিকান স্নাইপার রাইফেল, এম-১৬ এবং অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম, চোরাপথে এখন বালুচ বিদ্রোহীদের হাতে এসে পৌঁছেছে। এছাড়া ইরান ও আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী অরক্ষিত অঞ্চলে, মাদক ও তেল চোরাচালানের ব্ল্যাক মার্কেট এবং বড় বড় প্রজেক্ট থেকে কর্মকর্তাদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের মাধ্যমে বেলুচ আর্মি তাদের এই বিপুল সামরিক খরচ চালিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, বেলুচিস্তান আজ কেবল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, এটি হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিদের এক রক্তাক্ত দাবা খেলার মাঠ।”
১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান যেভাবে শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল, ইতিহাসের চাকা কি ২০২৬ সালে এসে বেলুচিস্তানেও ঠিক একই রূপ নিচ্ছে? পাকিস্তানের মানচিত্র কি সত্যিই বদলে যাবে? নাকি সামরিক শক্তি দিয়ে এবারও বালুচদের কণ্ঠ রোধ করা হবে?
সৈয়দ সাকিব
![]()

