বিএনএ, ঢাকা: ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি জরুরি শাসনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন ১/১১ খ্যাত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন সাবেক মেজর জেনারেল এম এ মতিন। একই সঙ্গে তিনি দুর্নীতি বিরোধী এবং গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির প্রধান ছিলেন। এই কমিটির নির্দেশেই সে সময় তারেক রহমানসহ শীর্ষ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের আটক করা হয়।
যদিও জেনারেল মতিন এই কমিটির প্রধান ছিলেন, তবে অভিযোগ রয়েছে যে পর্দার আড়ালে থেকে তৎকালীন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীই যৌথ বাহিনীর কার্যক্রম এবং এই সমন্বয় কমিটি কার্যত পরিচালনা করতেন। প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, জেনারেল মাসুদের তত্ত্বাবধানেই তারেক রহমানের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানকে গ্রেফতারের পর চোখ বেঁধে আয়নাঘর হিসেবে পরিচিতি অজ্ঞাত স্থানে রাখা হয়েছিল। চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। মূলত তাঁকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার একটি নীল নকশা ছিল, তৎকালীন সেনাবাহিনীর প্রভাবশালী লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গং এর।

নির্যাতনে তারেক রহমানের শারীরিক অবস্থা যখন অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হয়ে পড়েছিল, তখন উন্নত চিকিৎসার দাবিতে তাঁর স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মতিনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তারই হস্তক্ষেপে তারেক জিয়া প্রাণে বাঁচে যান —এমনটা দাবি করেছেন, তৎকালীন মেজর রেজাউল করিম রেজা।
২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসে বিএনপি সমর্থিত পত্রিকা ‘দৈনিক দিনকাল’ এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তারেক রহমানকে রিমান্ডে নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও প্রকাশিত হয় । দিনকাল পত্রিকায় হেডলাইন ছিল: “রিমান্ডে তারেক রহমানের ওপর অমানুসিক নির্যাতনের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ”।
২০০৮ সালের ১৬ জানুয়ারি সচিবালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্র সচিব আব্দুল করিম এই নির্যাতনের দাবি অস্বীকার করেন। তাঁর এই বক্তব্য পরদিন অর্থাৎ ১৭ জানুয়ারি আব্দুল করিমের এই প্রতিবাদী বক্তব্য দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলোসহ তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়।
আব্দুল করিম দাবি করেছিলেন যে, দিনকাল পত্রিকায় প্রকাশিত ছবিতে থাকা ব্যক্তি তারেক রহমান নন, বরং তিনি ছিলেন চুরির দায়ে অভিযুক্ত রতন নামের একজন আসামি। তিনি একে “ভিত্তিহীন ও কল্পনাপ্রসূত” হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এ ধরনের সংবাদ সরকারের এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে।
তৎকালীন স্বরাষ্ট্র সচিব পরবর্তীতে শেখ হাসিনার আমলে মূখ্য সচিব আব্দুল করিম আরও দাবি করেছিলেন যে, রিমান্ডে কোনো বন্দিকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করার কোনো অবকাশ নেই এবং নিয়ম মেনেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ৯ই জানুয়ারি আদালতে হাজির করার সময় তারেক রহমান নিজে বিচারকের কাছে দাবি করেছিলেন, তাকে চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে, ঝুলিয়ে অমানবিক শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে ।তারেক রহমানকে নির্যাতন করা হয়নি —স্ব-রাষ্ট্র সচিবের এমন মিথ্যাচার পরবর্তীতে মানবাধিকার সংস্থা ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল।
সেই সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তারেক রহমানকে হুইলচেয়ারে করে আদালতে আনা-নেওয়ার ছবি প্রকাশিত হলে জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তারেক রহমানের মেরুদণ্ডের আঘাত ও শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ডা. জোবায়দা রহমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে জেনারেল মতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
তিনি স্বামীর জীবন বাঁচাতে এবং দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সন্তান হিসাবে মানবিক দিকগুলো বিবেচনা করে প্যারোলে মুক্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে সঠিক চিকিৎসার জন্য দ্রুত বিদেশে পাঠানোর আবেদন করেন। জোবায়দা রহমানের দৌড়ঝাঁপ এবং পরিবারের পক্ষ থেকে প্রবল চাপের মুখে পরবর্তীতে সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দিন- মঈনউদ্দিন সরকার তাঁকে চিকিৎসার জন্য লন্ডন যাওয়ার অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। ২০০৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান এবং ডা. জোবায়দা রহমানও তাঁর সঙ্গে দেশ ছাড়েন।
সৈয়দ সাকিব
![]()

