বিএনএ, ডেস্ক : কুষ্টিয়া-৩ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজার একের পর এক বিতর্কিত ও বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
বিশেষ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসের অসুস্থতা নিয়ে হাসিঠাট্টা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে ‘আপাদমস্তক নাস্তিক ও ইসলামবিদ্বেষী’ আখ্যা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছোট ভাই প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোকে নিয়ে বিদ্রুপ এবং নারী সংসদ সদস্যদের শারীরিক গঠন নিয়ে তাঁর কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যগুলো জামায়াতে ইসলামীর জন্য একটি বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে ।

বক্তা হিসেবে তাঁর বিশাল ভক্তগোষ্ঠী জামায়াতের জন্য একটি রাজনৈতিক “সম্পদ” হলেও, তাঁর অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্যগুলো বর্তমানে দলের জন্য “বোঝা” হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবার আসা যাক সেই বিশ্লেষণে।
কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা মুফতি আমির হামজা গত এক সপ্তাহে অন্তত: তিনটি বিতর্কিত বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেছেন।
গত ২৭শে মার্চ কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর বড় মসজিদে জুমার নামাজের আগে এক আলোচনায় আমির হামজার বক্তব্যের ১ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
ভাইরাল ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, জ্বালানি ও বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু নাস্তিক এবং ইসলামবিদ্বেষী। তিনি জামায়াতে ইসলামী কিংবা চরমনাই বিদ্বেষী নন, তিনি ইসলামবিদ্বেষী।”
একই সময় তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ঢাকা -৮ আসনের এমপি মির্জা আব্বাসের অসুস্থতা নিয়ে রসিকতা করেন। যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়েছে। অনেকে আমির হামজাকে উম্মাদ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, একজন উম্মাদ ছাড়া রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে এই ধরনের বক্তব্য দেয়া সম্ভব নয়। দেখুন হাসতে হাসতে কী বলেছেন হামজা।
মির্জা আব্বাসকে বিদ্রুপমূলক মন্তব্যের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এই ঘটনায় সিরাজগঞ্জে একশত কোটি টাকার মানহানির মামলা হয়েছে আমির হামজার বিরুদ্ধে। মামলাটি আমলে নিয়ে সমন জারি করেছেন আদালত।
শুধু তাই নয়- সম্প্রতি এক ওয়াজ মাহফিলে কুষ্টিয়া-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও ইসলামি বক্তা আমির হামজা নারী সংসদ সদস্যদের নিয়ে বডি-শেমিং করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে রুমিন ফারহানা এবং ফারজানা শারমিনের শারীরিক গঠন নিয়ে বিদ্রূপ করতে দেখা যায় ।
আমির হামজার এমন মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাড়িয়ে স্পিকারের কাছে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আমির হামজার বিচার চেয়েছেন।
রুমিন ফারহানা বলেন, আমির হামজা যাদের ডানে-বামে বসার কথা বলেছেন, বাস্তবে সেখানে কেউ ছিলেন না। জামায়াতের এমপি হিসেবে তিনি অন্য জামায়াত সদস্যদের সঙ্গেই বসেন।’স্বতন্ত্র এই নারী সংসদ সদস্য আরও বলেন, তার অতীত আচরণ ও অসভ্য মন্তব্যের ধারাবাহিকতায় এটি নতুন কিছু নয়। নারীদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। দুর্ভাগ্যজনক হলো, তারা এখন জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
এ বিষয়ে নারী ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন বলেন, ‘ভিডিওটি দেখেছি। এ বিষয়ে কথা বলাও আমার জন্য অসম্মানজনক।’ তিনি বলেন, ‘এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি শুধু নারী এমপি নয়, পুরো সংসদ ও দেশের সব নারী, এমনকি নিজের মাকেও অপমান করেছেন।’
প্রসঙ্গত আমির হামজা প্রায়ই জান্নাতের হুর বা আদি মাতা হাওয়া (আ.)-এর সৌন্দর্যের তুলনা করতে গিয়ে সমসাময়িক নায়িকাদের উদাহরণ টানেন। এই ধরণের তুলনামূলক বয়ানে তিনি এমন সব শব্দ ও ভাবভঙ্গি ব্যবহার করেন যা শ্রোতাদের মধ্যে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক সুড়সুড়ি বা উত্তেজনা তৈরি করে। তাঁর ওয়াজ মাহফিলগুলোতে বিভিন্ন সময়ে সিনেমার নায়িকাদের সৌন্দর্য এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এমন সব মন্তব্য করেছেন যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
২০২৪ সালের শেষের দিকে জামায়াত নেতা আমির হামজা একটি ওয়াজ মাহফিলে দাবি করেন ১৫৭টি রাষ্ট্রের মধ্যে চেহারার সৌন্দর্যে ভারতের দক্ষিণি অভিনেত্রী রাশমিকা বর্তমানে ১ নম্বরে আছেন। তিনি দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলেন, রাশমিকার দিকে একটু আল্লাহর নাম নিয়ে তাকাবেন। এই সময বাংলাদেশের অভিনেত্রী পরী মণিকে নিয়েও আমির হামজা বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেন।
এশিয়া ও ভারতের অন্যতম ধনী মুকেশ আম্বানির স্ত্রী নীতা আম্বানির যৌবন নিয়ে মন্তব্য করেন জামায়াতে ইসলামীর টিকেটে কুষ্টিয়া-৩ সংসদীয় আসন থেকে সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য আমির হামজা।
জামায়াতে ইসলামীর নেতা মুফতি আমির হামজা এতটাই মানসিক প্রতিবন্ধি যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রয়াত ভাই আরাফাত রহমান কোকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন।
ধর্মীয় আলোচনার ছলে নারীর যৌবন ও শারীরিক সৌন্দর্যের এমন খুঁটিনাটি বর্ণনা সাধারণ শ্রোতাদের মধ্যে অস্বস্তির উদ্রেক করে। অতীতে জামায়াতে ইসলামীর এই নেতা একাধিকবার সমালোচনার মুখে পড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলেও তাঁর বক্তব্যের ধরণ খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।একজন সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর এই ধরণের অসংলগ্ন আচরণ বর্তমানে তাঁর পদের যোগ্যতা নিয়ে আইনি ও নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকে তার মুফতি উপাধি নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কিছু বক্তা যখন বিশাল জনসমর্থন পান, তখন তাঁদের মধ্যে এক ধরণের ‘সুপিয়রিটি কমপ্লেক্স’ তৈরি হয়। শ্রোতাদের তাৎক্ষণিক হাততালি বা সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার নেশায় তারা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে অশালীন বা চটকদার উদাহরণ ব্যবহার করেন। তবে সমালোচকদের একটি অংশ তাঁর বক্তব্যে ‘সেক্সুয়াল ফ্রাস্ট্রেশন’ বা বিকৃত রুচির প্রতিফলন দেখছেন। যদিও আমির হামজা একে কারাগারের নির্যাতনের ফলে সৃষ্ট মানসিক অসুস্থতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন।
হামজার রুচিহীন ও যৌন সুড়সুড়ি দেওয়া বক্তব্যের কারণে জামায়াতে ইসলামীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে নারী নেতৃত্ব, নারীর প্রতি অশালীন বক্তব্য এবং অসুস্থ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ে তাঁর বিদ্রূপ মন্তব্য ইসলামি শিষ্টাচার পরিপন্থী বলে মনে করছেন খোদ দলের নেতাকর্মীরা। তার একের পর এক ‘লাগামহীন’ ও বিতর্কিত বক্তব্যে চরম অস্বস্তিতে পড়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র বলেছে, হামজার সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য দলের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আমির হামজা বিপুল জনসমর্থনের কারণে দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলেও, তাঁর বর্তমান “লাগামহীন” অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যগুলো জামায়াতে ইসলামীর ভাবমূর্তির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দল তাঁকে সতর্ক করলেও আইনি জটিলতা এবং নৈতিক বিতর্কের কারণে কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আমির হামজা বর্তমানে জামায়াতের জন্য একটি ‘রাজনৈতিক দায় বা বোঝা’ হিসেবেই বেশি বিবেচিত হচ্ছেন। এক কথায় আমির হামজা জামায়াতের ‘গলার কাঁটা’ হয়ে উঠেছে?
শামীমা চৌধুরী শাম্মী
![]()

