।।সৈয়দ সাকিব।।
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের ৪ সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। অনেকে মনে করছেন, দেশের অপরাধ দমনের খাতা থেকে নতুন কোনো ‘কালজয়ী স্ক্রিপ্ট’ মঞ্চস্থ করার চেষ্টা চলছে। চার-চারটি তরতাজা প্রাণ নিঃশব্দে শেষ হয়ে গেল, আর পুলিশ আমাদের একটি রূপকথা বিশ্বাস করাতে চাইছে—সবকিছু হয়েছে স্রেফ ‘ছাদে ইয়াবা খাওয়ার বাধা’ দেওয়ায়! অপরাধীদের ঠান্ডা মাথায় ১৫ ঘণ্টার পিকনিক।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনারের কান্না এবং তদন্তকারী ডিবি কর্মকর্তা ও আসামির গায়ে হুবহু একই রকম প্রিন্টের শার্টের মিল কি শুধুই কাকতালীয়, নাকি দেশের অপরাধ ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত ‘জজ মিয়া নাটক’-এর কোনো আধুনিক সংস্করণ মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে? সাধারণ মানুষের মনে আজ তীব্র প্রশ্ন—রংপুরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড কি, শুধুই একটি মাদকাসক্তের অপরাধ, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে, সমাজকে গিলতে আসা ভয়ঙ্কর কোন ঘটনা।
এবার আসা যাক বিশ্নেষণে।
এক নম্বর অসংগতি-
এ দেশের অপরাধ ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত শব্দবন্ধ, ‘জজ মিয়া নাটক’! ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর আসল অপরাধীদের আড়াল করতে পুলিশ যেভাবে নোয়াখালীর এক সাধারণ যুবক জজ মিয়াকে ধরে এনে জোরপূর্বক জবানবন্দি দিয়ে একটি সাজানো নাটক মঞ্চস্থ করেছিল, রংপুরের এই ঘটনা কি, ঠিক সেই পথেই হাঁটছে?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ছবিটা এখন টক অব দ্য কান্ট্রি, তা হলো—মামলার তদন্তকারী ডিবি কর্মকর্তা এবং প্রধান আসামির গায়ে হুবহু একই রকম প্রিন্টের, একই ডিজাইনের শার্ট! নেটিজেনরা ক্ষোভে ও হাসিতে ফেটে পড়ে প্রশ্ন তুলছেন, এটা কি একই টেইলর থেকে বানানো কোনো ক্রাইম পার্টনারশিপ, নাকি কোনো অদৃশ্য পরিচালকের লিখে দেওয়া নাটকের সুনির্দিষ্ট কস্টিউম ডিজাইন?
পুলিশ অবশ্য সাফাই গেয়ে বলেছে, রংপুরে নাকি এমন শার্ট আরও ২০০ মানুষের আছে। কিন্তু অতীত ইতিহাস বলে, যখনই কোনো বড় অপরাধের পেছনে কোনো প্রভাবশালী মহল থাকে, তখনই কি পুলিশ আমজনতার চোখ ধাঁধিয়ে দিতে এমন সস্তা চিত্রনাট্য আর জজ মিয়াদের সামনে খাড়া করে? এই শার্ট কি শুধুই এক অদ্ভুত কাকতালীয় ঘটনা, নাকি নেপথ্যের কোনো বড় অপরাধীকে বাঁচানোর নতুন এক ‘জজ মিয়া নাটক ‘টু পয়েন্ট ও’ ( ২.০)’—সেই প্রশ্ন কিন্তু বাতাসের চেয়েও দ্রুত ছড়াচ্ছে!
অসংগতি নম্বর দুই
রংপুরের পুলিশ কমিশনার সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, দুই যুবক ছাদে ইয়াবা খেতে গেলে শিক্ষক বাধা দেন, আর তাতেই নাকি তারা পুরো পরিবারকে শেষ করে দেয়! প্রশ্ন হলো, রংপুর শহরের কি আর কোনো নিরাপদ জায়গা ছিল না যে মাদক সেবনের জন্য ওই শিক্ষকের নির্মাণাধীন ছাদেই যেতে হবে? কোনো পূর্বশত্রুতা নেই, কোনো বড় বিরোধ নেই—স্রেফ একটা কথার জেরে দুজন সাধারণ মাদকাসক্ত তরুণ, কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়া, শুধু গামছা আর রশি দিয়ে একে একে চারজন মানুষকে সম্পূর্ণ নিঃশব্দে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলল? রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরাও রাস্তায় নেমে পুলিশের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে উচ্চ পর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত করে আসল রহস্য ও জড়িতদের শানাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
অসংগতি নম্বর তিন
খুনিদের অবিশ্বাস্য মনস্তত্ত্ব। চারজনকে নৃশংসভাবে খুন করার পর সাধারণ চোর-ডাকাতরা কী করে? জান বাঁচিয়ে পালায়। কিন্তু রংপুরের এই খুনিরা খুন করার পর পালালো না, উল্টো সেই বাড়িতেই কাটিয়ে দিল প্রায় ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা! ফ্রিজ খুলে শসা খেল, বয়াম থেকে খেজুর খেল, বাথরুমে গিয়ে আরাম করে গোসল করল, এবং বাকি ইয়াবাটুকুও সেবন করল! এত বড় অপরাধের পর এমন চরম নির্লিপ্ত আচরণ কি কোনো অপেশাদার মানুষের পক্ষে সম্ভব? নাকি তারা কোনো প্রশিক্ষিত কিলিং স্কোয়াডের অংশ, যারা জানত—নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার আগে তাদের ধরার ক্ষমতা কারও নেই?
সবশেষে, অসংগতি নম্বর চার—সংবাদ সম্মেলনে শিশু প্রিয়মের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। একদল মানুষ একে মানবিকতা বললেও, সচেতন মহলের চোখ কিন্তু অন্য কিছু দেখছে। আমজনতা যখন একে সস্তা নাটক বলছিল, তখন পুলিশের অনেকে একে ‘মানবিকতা’ বলে ডিফেন্ড করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এবার এই কান্নার স্ক্রিপ্টকে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন খোদ সাবেক এসবি প্রধান এবং পুলিশেরই অন্যতম ঝানু গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম! একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, রংপুর পুলিশ কমিশনারের ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজ’ বা শারীরিক ভাষা পরিষ্কার বলে দিচ্ছে—এটা তাঁর আসল কান্না নয়!
যিনি নিজে বছরের পর বছর দেশের সবচেয়ে বড় বড় অপরাধের রহস্য উন্মোচন করেছেন, সেই সাবেক এসবি প্রধান নিজেই খোদ পুলিশ কমিশনারের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
প্রশ্ন উঠছে, যখন পুলিশের অবিশ্বাস্য তদন্তের গল্প নিয়ে সাংবাদিকরা একের পর এক তীক্ষ্ণ প্রশ্নবাণ ছুড়ছিলেন, ঠিক তখনই কি এই কান্না পুরো পরিবেশটাকে আবেগ দিয়ে ঢেকে দেওয়ার, একটা ঢাল হিসেবে কাজ করেনি? এই কান্নার মাধ্যমে কি তদন্তের গাফিলতি, ডাবল শার্টের বিতর্ক আর আইন-শৃঙ্খলার চরম ব্যর্থতাকে এক ধরণের “মানবিক সহানুভূতি”র চাদরে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা হলো? বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশের মানুষ পুলিশের চোখে পানি দেখতে চায় না, মানুষ চায় নিখুঁত, নিরপেক্ষ এবং প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক চাপমুক্ত তদন্ত!
একটি ১৬৪ ধারার জবানবন্দি আর কিছু উদ্ধার হওয়া গামছা-চুড়ি দিয়েই কি এই ’কোয়াড্রাপল’ মার্ডারে ফাইল চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে? কোনো সাজানো জজ মিয়ার গল্পে, নেপথ্যের আসল মাস্টারমাইন্ডরা কি তবে অন্ধকারেই থেকে যাবে?
বিএনএ
![]()

