বিএনএ, ঢাকা: রডের বদলে বাঁশ! কোনো সাধারণ কালভার্ট নয়, মরাগাঙ্গী নদীর ওপর নির্মাণাধীন পুরো ১০ কোটি টাকার একটি বৃহৎ সেতুতে ঘটেছে এই নজিরবিহীন জালিয়াতি! বিষয়টি ফেসবুকে ভাইরাল হতেই দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। সাধারণ মানুষ বলছেন, “এটা চুরি নয়, এটা সরাসরি খুনের চেষ্টা!”
ইতিমধ্যেই সাব-ঠিকাদার শাহ আলম গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং একজন প্রকৌশলী বরখাস্ত হয়েছেন। কিন্তু জনমনে ক্ষোভ কমেনি। আজ আমরা দেখাব কীভাবে রাতের আঁধারে এই জঘন্য কাণ্ড ঘটানো হচ্ছিল এবং সাধারণ মানুষ এই নিয়ে ঠিক কী বলছেন!
ঘটনাটি ঘটেছে টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার মরাগাঙ্গী নদীর ওপর নির্মাণাধীন একটি পিএসসি গার্ডার সেতুতে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা এলজিইডির অধীনে এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা! ভোলার একটি যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পেলেও স্থানীয়ভাবে কাজটি তদারকি করছিলেন ঠিকাদার এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন। সেতুটির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গত রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঠিকাদারের লোকজন সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ের সময় রডের পরিবর্তে বাঁশের ফালা বা কঞ্চি বিছিয়ে ঢালাই দিতে শুরু করে! স্থানীয় কয়েকজন সচেতন নাগরিক বিষয়টি ধরে ফেলেন এবং মোবাইলে ভিডিও রেকর্ড করে কাজ বন্ধ করে দেন।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, স্থানীয়রা বাধা দিয়ে চলে যাওয়ার পর, ওই রাতেই ঠিকাদারের লোকবল আবার চোরের মতো বাকি ঢালাইয়ের কাজ শেষ করে ফেলে! এই খবর ও ভিডিও যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন নেটদুনিয়ায় সাধারণ মানুষ তাদের ক্ষোভ উগরে দেন।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমানের দায়ের করা মামলায় সাব-ঠিকাদার শাহ আলম গ্রেপ্তার হলেও প্রধান ঠিকাদার এসএম জাহাঙ্গীর আলম এখনও পলাতক রয়েছেন। একই সাথে দায়িত্ব অবহেলার কারণে উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং আরও দুই শীর্ষ প্রকৌশলীকে শোকজ করা হয়।
এই বিষয়ে এক দর্শক মন্তব্য করেছেন, “ইঞ্জিনিয়ার বরখাস্ত করে কী লাভ? কোটি টাকার প্রজেক্টে যখন কাজ হয়, তখন ইঞ্জিনিয়াররা সাইটে না থেকে এসি রুমে ঘুমাচ্ছিলেন কেন? তাদেরও জেলের ভাত খাওয়ানো উচিত!”
এই জঘন্য দুর্নীতির খবর পেয়ে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন । দুদকের একটি বিশেষ টিম প্রজেক্ট সাইটে গিয়ে ল্যাব টেস্টের জন্য নমুনা সংগ্রহ করেছে এবং সেতুর বাকি ২০ শতাংশ ও আগের ৮০ শতাংশ কাজে কোনো জালিয়াতি আছে কি না তা খতিয়ে দেখছে। দুদক কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ পান। তারা সেতুর ফুটপাতের বিতর্কিত স্ল্যাব এবং রেলিংয়ের পিলার হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে ভেতরের নির্মাণসামগ্রী ও রডের উপস্থিতি পরীক্ষা করেন। সেতুর ঢালাইয়ে সিমেন্ট, বালু ও পাথরের অনুপাত ঠিক ছিল কি না এবং পুরো কাঠামোতে বড় ধরনের কোনো জালিয়াতি হয়েছে কি না, তা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য ঢালাইয়ের বিভিন্ন অংশ ও উপাদানের নমুনা সংগ্রহ করেছে দুদক টিম।
এলজিইডির সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইউনুছ আল মামুন ও মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ এর মূল কার্যাদেশ, ইস্টিমেট ও বিল পেমেন্টের যাবতীয় নথিপত্র খতিয়ে দেখার জন্য দুদকের হেফাজতে নেয়া হয়েছে। দূদক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরেজমিন তদন্তের এই বিস্তারিত রিপোর্ট দ্রুতই প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হবে এবং কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তীতে অপরাধী ঠিকাদার ও জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে।
এদিকে এলজিইডি প্রধান কার্যালয় থেকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, নকশাবহির্ভূত এবং বাঁশ দিয়ে তৈরি করা পুরো ফুটপাতের অংশটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে নতুন করে রড দিয়ে তৈরি করতে হবে।
বিএনএ/সৈয়দ সাকিব
![]()

