বিএনএ, ঢাকা : বাংলাদেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সবচেয়ে আলোচিত আসনের নাম চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুন্ড)। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী এবং দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা লায়ন আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নের বৈধতাকে কেন্দ্র করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গণ। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ১০দলীয় জোটের শরীক জাতীয় নাগরিক পার্টি। দলটি এই ইস্যুতে নির্বাচন বর্জন করারও হুমকি দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানিতে দীর্ঘ যুক্তিতর্কের পর আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। তবে সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় নির্বাচন কমিশনার ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম। ব্যাংকের টাকাটা দিয়ে দিয়েন। টাকাটা না দিলে জনরোষ তৈরি হবে। মানুষ হিসেবে কথাটা বললাম।’ নির্বাচন কমিশনারের এমন বক্তব্য ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
কমিশনের এমন সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর শুনানিকক্ষে হট্টগোল শুরু হয়। জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মো. আনোয়ার ছিদ্দিকের পক্ষে আইনজীবী ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির বলেন, আসলাম চৌধুরী কনভিক্টেড। ইসি কোনোভাবেই তার প্রার্থিতা বহাল রাখতে পারে না। ইসিতে ন্যায়বিচার পাওয়া যায়নি, উচ্চ আদালতে রিট করা হবে। সে ক্ষেত্রে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর দাবি তার প্রতিপক্ষ জামায়াত ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের প্রার্থীর নিশ্চিত পরাজয় জেনে রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা করছে।
আসুন এবার জেনে নিই- সারাদেশে আলোচিত এই সংসদীয় এলাকার পরিচয়। চট্টগ্রাম-৪ সংসদীয় আসনটি সিতাকুন্ড উপজেলা এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৯ নং উত্তর পাহাড়তলী ও ১০ নম্বর উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। এটি জাতীয় সংসদের ২৮১ তম আসন।
এই আসনটি ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ থেকে ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত চট্টগ্রাম ২ হিসাবে পরিচিত ছিল। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে এই আসনটি সীমানা পরিবর্তন হওয়ার পর চট্টগ্রাম-৩ নামকরণ করা হয়। বর্তমানে জাতীয় সংসদের ২৮১ আসনটি চট্টগ্রাম-৪ হিসাবে পরিচয় বহন করছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর মোঃ আনোয়ার ছিদ্দিক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোঃ দিদারুল মাওলা, গণ-অধিকার পরিষদের এ টি এম পারভেজ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মোঃ জাকারিয়া খালেদ, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি মোঃ শহীদুল ইসলাম চৌধুরী, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির মোঃ মছিউদদৌলা, গণসংহতির জাহিদুল আলম, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মোঃ সিরাজুদ্দৌলা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মোঃ নুরুর রশীদসহ ১০ জনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষিত হয়েছে। এদের বেশিরভাগই পোস্টার নির্ভর প্রার্থী। মুল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মধ্যে।
কেমন হবে বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরী ও জামায়াত ইসলামী প্রার্থী আনোয়ার ছিদ্দিকের মধ্যে ভোটের লড়াই? সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে আসুন জেনে নেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনের ফলাফল।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুয়ায়ি ১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ভোটার ছিলেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ২ শত ১৭ জন। ভোট প্রদান করেন ৮০ হাজার ৩ শত ৯৪ জন। নির্বাচনে বিএনপির এল কে সিদ্দিকি বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৩৬ হাজার ৮ শত ৫৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের এবিএম আবুল কাশেম । নৌকা প্রতীকে তিনি পান ২৮ হাজার ৯ শত ২৮ ভোট ।
১৯৯৬ সালের ১২ই জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫ শত ৮৬ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৪ হাজার ৬ শত ৩৫ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এবিএম আবুল কাশেম বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৪৫ হাজার ৪ শত ৭৮ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির এলকে সিদ্দিকী। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৪৩ হাজার ১ শত ২১ ভোট।
২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১ লাখ ৭৯ হাজার ১ শত ১০ জন। ভোট প্রদান করেন ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯ শত ১৯ জন। নির্বাচনে বিএনপির এল কে সিদ্দিকি বিজয়ী হন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ৬৭ হাজার ৫ শত ১২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের এবিএম আবুল কাশেম । নৌকা প্রতীকে তিনি পান ৪৬ হাজার ৪৫ ভোট।
২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৬ হাজার ৮ শত ৩৩ জন। ভোট প্রদান করেন ২ লাখ ৫২ হাজার ১ শত ৩৫ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এ বি এম আবুল কাশেম বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪ শত ৮৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির আসলাম চৌধুরী। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ১ লাখ ১২ হাজার ৬ শত ৫১ ভোট।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পঞ্চম, অষ্টম সংসদে বিএনপি, সপ্তম, নবম সংসদে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়।
এবার আসা যাক, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুন্ড)আসনে রাজনৈতিক দলগুলো কত শতাংশ ভোট পেয়েছিল সেই বিশ্লেষণে।
নির্বাচন কমিশনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম-৪ সংসদীয় আসনে ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৫৮.১৭% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩৫.৯৮%, বিএনপি ৪৫.৮৪%, জাতীয় পার্টি ৪.২২%, জামায়াত ইসলামী ১০.৬৩% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ৩.৩৩% ভোট পায়।
১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৭৬.৬১% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪৩.৪৬%, বিএনপি ৪১.২১%, জাতীয় পার্টি ৭.২৭%, জামায়াত ইসলামী ৭.১৬% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ০.৯০% ভোট পায়।
২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৭৬.৪৪% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩৩.৬৩%, ৪ দলীয় জোট ৪৯.৩১%, জাতীয় পার্টি ৩.৬৩% স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ১৩.৪৩% ভোট পায়।
২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন ৭৫.৮৯% ভোটার। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে ১৪ দলীয় জোট ৫৩.১১%, ৪ দলীয় জোট ৪২.৯৯%, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ৩.৯০% ভোট পায়।
এবার আসা যাক, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম ৪ (সীতাকুন্ড) আসনে দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন কেমন ছিল? কারা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন?
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে র্নিবাচনের দাবিতে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এই নির্বাচনে অংশ গ্রহন করেনি। এক তরফা ভোটারবিহীন এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মোঃ দিদারুল আলম চৌধুরীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৯৩ হাজার ২ শত ২৮ জন। নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন ৬ জন। নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের মোঃ দিদারুল আলম চৌধুরী, ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির ইসহাক চৌধুরী, লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির দিদারুল কবির, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সামছুল আলম হাসেম, মোমবাতি প্রতীকে ইসলামী ফ্রন্টের মুহাম্মদ আশরাফ হোসাইন এবং চেয়ার প্রতীকে ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের মোজাম্মেল হোসেন প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন।
কিন্তু নির্বাচনের আগের দিন রাতে প্রশাসনের যোগসাজসে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর লোকজন বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ৩০-৪০ শতাংশ ব্যালট নিজেদের কব্জায় নিয়ে নৌকা প্রতীকে সিল মেরে রাখে। কারচুপির অভিযোগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বর্জন ও ফলাফল প্রত্যাখান করে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দিদারুল আলমকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি-জামায়াত ইসলামীসহ তাদের সমমনা দল গুলো নির্বাচন বর্জন করে। আমি-ডামি খ্যাত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী এবং আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। ভোটারবিহীন এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এস এম আল মামুনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি। এই নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরী ও জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার ছিদ্দীক চৌধুরীর সরাসরি লড়াই হবে।
তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম- ৪ (সীতাকুন্ড) আসনটি একক কোন রাজনৈতিক দলের ঘাটি নয়। এই আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমানে সমান। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। আওয়ামী লীগকে গণহত্যার দায়ে নির্বাচনের বাইরে রাখার পক্ষে অবস্থান নিলেও দলটির সমর্থকদের ভোট পক্ষে নিতে চায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। সীতাকুন্ডেও এর ব্যাতিক্রম নয়। বিশেষ করে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ভোট নিজেদের ব্যালটে নিতে চায় উভয় দল।
সীতাকুন্ড সংসদীয় আসনে বিএনপির শক্ত সাংগঠনিক অবস্থান রয়েছে। এছাড়া উচ্চ শিক্ষিত, ক্লিন ইমেজের কারণে তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক জনপ্রিয় আসলাম চৌধুরী। ৮ বছরের বেশি সময় কারাগারে থাকার কারণে তার প্রতি সাধারণ ভোটারদের সহানুভূতি রয়েছে। তাছাড়া আওয়ামী লীগের অনেকে এলাকায় শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস ও মামলা- হামলা থেকে বাঁচতে আসলাম চৌধুরীর ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়েছে।
সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম-৪সীতাকুন্ড সংসদীয় আসনে বিএনপির আসলাম চৌধুরী জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার ছিদ্দিককে বিপুল ভোটে পরাজিত করবে এমনটা মনে করেন বিএনএ নিউজ টুয়েন্টিফোর এর পরিচালিত দৈবচয়ন পদ্ধতিতে অংশগ্রহণকারি বেশির ভাগ ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কাকতালীয় হলেও সত্য ১৯৯১ সাল থেকে যে দল এই আসনে বিজয়ী হয়েছে সেই দলই সরকার গঠন করেছে।
বিএনএনিউজ/ শামীমা চৌধুরী শাম্মী/এইচ.এম।
![]()
