বিএনএ, ঢাকা: ২০২৫ সালের ২রা মে জাতীয় নাগরিক পার্টির মূখ্য সমন্বয়ক বর্তমানে কুমিল্লা ৪ আসনের সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার জন্য প্রথম দাবি জানান। বায়তুল মোকারম দক্ষিণ গেইটে অনুষ্ঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির ঢাকা মহানগর আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে দলটির সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেছিলেন আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ না হলে দেশে কোনো নির্বাচন হবে না।
এনসিপি’র দাবি মেনে ২০২৫ সালের ১২ই মে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। তারই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশন দলটির কার্যক্রম স্থগিত করে। আওয়ামী লীগবিহীন অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও দলের অন্যতম নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ, আখতার হোসেনসহ ৬ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন কিন্তু পাওয়ার পলিটিক্সে টিকে থাকার জন্য এনসিপি এখন আতাঁতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। তারই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরশনের সাবেক মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ মনজুর আলমকে এনসিপি আসন্ন মেয়র নির্বাচনে মেয়র হিসাবে মনোনয়ন দিতে চায়! গত ১ মাসের বেশি সময় ধরে এই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
প্রসঙ্গত, জাতীয় নাগরিক পার্টি গত ২রা মার্চ চট্টগ্রামে বিভাগীয় ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে। চট্টগ্রামের পাঁচলাইশে একটি কনভেনশন সেন্টারে এই ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। ইফতার মাহফিলে বক্তব্য দিতে গিয়ে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘চট্টগ্রামে এখনো ‘ফ্যাসিস্ট শক্তির’ প্রভাব রয়েছে। যে জেলায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম শুরু হবে, সেখানে হয় আওয়ামী লীগ থাকবে, নয়তো এনসিপি থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি এলাকায় এনসিপির অল্পসংখ্যক সক্রিয় কর্মী থাকলেও সেখানে আওয়ামী লীগের কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম চলতে দেওয়া হবে না।’
ইফতারে সরবরাহ করা পানির বোতলে সাবেক চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র মনজুর আলমের ছবি দেখা যায়। বিষয়টি নজরে আসার পর উপস্থিত কয়েকজন আয়োজকদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চান।
অভিযোগ রয়েছে, ইফতারের পুরো ব্যয় বহন করেন সাবেক মেয়র এবং ২০২৪ সালে আমি-ডামি নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মনজুর আলম। ব্যবসায়ি এই রাজনীতিক চট্টগ্রামের রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার ছবিযুক্ত বোতলের উপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ এটিকে রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন।
একমাস যেতে না যেতেই এনসিপির গোপন পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেছে, প্রমাণ পাওয়া যায় মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রামের কাট্টলি এলাকায় মনজুর আলমের বাসভবনে গিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ’র সাক্ষাৎ করার ঘটনায়। খবর পেয়ে এ সময় মনজুর আলমের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন একদল লোক, যাঁরা নিজেদের জুলাই যোদ্ধা বলে পরিচয় দেন।
সাক্ষাৎ শেষে হাসনাত আবদুল্লাহ ওই বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাঁকে নানা প্রশ্ন করেন জুলাই যোদ্ধা পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, মনজুর আলমের বাসার সামনে হাসনাত আবদুল্লাহকে ঘিরে কয়েকজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন। এ সময় একজন হাসনাত আবদুল্লাহকে প্রশ্ন করেন, আপনি একজন জুলাই যোদ্ধা। সংসদে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার কথা বলেছেন। তাহলে আওয়ামী লীগের দোসরের বাসায় কেন?’এ সময় হাসনাত আবদুল্লাহকে খুবই বিব্রতকর দেখা যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একটি বড় রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহকে ঘেরাও করা জুলাই যোদ্ধাদের সাবেক মেয়র মনজুর বাড়িতে পাঠিয়ে ‘এক ঢিলে কয়েক পাখি শিকার’ করেছেন!
এ বিষয়ে এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগরের সমন্বয়কারী সদস্য ও মিডিয়া সেলের প্রধান সমন্বয়কারী রিদুয়ান হৃদয় গণমাধ্যমকে বলেন, হাসনাত আবদুল্লাহ মূলত ব্যক্তিগত কাজে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। এ সময় সাবেক মেয়র মনজুর আলমের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তিনি তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
সাবেক মেয়র মনজুর আলম বলেন, ‘সংসদ সদস্য এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ চট্টগ্রামে এসেছিলেন। পরে উনি আমার বাসায় বেড়াতে আসেন। তার সঙ্গে কোন রাজনৈতিক আলাপ হয়নি।
কিন্তু হাটে হাঁড়ি ভেঙ্গে দিয়েছে খোদ জাতীয় নাগরিক পার্টি। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্বীকার করেছে তাদের মধ্য অনুষ্ঠিত, ‘বৈঠকে তাঁরা দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করেন। বৈঠকে উভয় নেতাই আগামী দিনে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।’
এনসিপির প্রার্থী হয়ে আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে মনজুর আলম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে। এর মধ্যে তাঁর বাসায় হাসনাত আব্দুল্লাহর আগমনে এই গুঞ্জনকে আরও জোরদার করেছে।
মোহাম্মদ মনজুর আলম ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন নিয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় আসেন। ‘রাজনৈতিক গুরু’ হিসেবে পরিচিত সাবেক মেয়র প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে পরাজিত করে চমক সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। মেয়র হওয়ার পর বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাও হয়েছিলেন।
২০১৫ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে অআওয়ামী লীগ প্রার্থী আ.জ.ম নাছির উদ্দিনের বিপক্ষে বিএনপির সমর্থনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। একপর্যায়ে নির্বাচনের দিন সকালে কারচুপির অভিযোগ তুলে ভোট বর্জন করে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন মনজুর আলম। এর পর থেকে তাঁকে আর বিএনপির রাজনৈতিক কার্যক্রমে দেখা যায়নি ।
এর মধ্যে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের একটি আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হন মনজুর আলম। ওই বছর তিনি আর নির্বাচন করেননি। ২০২০ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কেনেন মনজুর আলম। তবে সেবারও তাঁকে মনোনয়ন দেয়নি আওয়ামী লীগ।
বিএনপির রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার পর দুই দফায় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইলেও দলটির কোনো পদে ছিলেন না মনজুর আলম। ক্লিন ইমেজ ও দানশীল ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত সাবেক মেয়র মনজুর আলমের বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। এটি কাজে লাগিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী ডাক্তার শাহাদাৎ হোসেনকে পরাজিত করে রাজনীতিতে চমক সৃষ্টি করতে চায়। যেমনটি করেছিলেন ২০১০ সালের সিটি করপোরশন নির্বাচনে বিএনপি। সে সময় ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের টানা তিন বারের মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন কাট্টলী ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মনজুর আলম।
প্রসঙ্গত গত ২৯ শে মার্চ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পাঁচটি সিটি করপোরেশনে দলের মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে এনসিপি। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে প্রার্থী এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। ঢাকা উত্তর সিটিতে প্রার্থী দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব।
এ ছাড়া কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম, রাজশাহী সিটি করপোরেশনে রাজশাহী মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মো. মোবাশ্বের আলী এবং সিলেট সিটি করপোরেশনে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক আবদুর রহমান আফজালের নাম ঘোষণা করা হয়। কিন্তু চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে কারও নাম ঘোষণা করেনি। এখানে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাকে মনোনয়ন দেয়ার বিষয়টি এক প্রকার চুড়ান্ত করেছে এনসিপি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের ১৩ টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে ১২টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বগুড়া সিটি করপোরেশন এখনো প্রক্রিয়াধীন। এই ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে ১০টি জামায়াত ইসলামীকে ছেড়ে দিতে চায় এনসিপি। তাদের ভাগে রাখতে চায় ২টি। এর একটিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। ইতোমধ্যে মেয়র পদে প্রার্থী এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। আর অন্যটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরশন। এই করপোরেশন থেকে এনসিপির প্রার্থী হিসাবে বর্তমান মেয়র ডাক্তার শাহাদাৎ হোসনের সঙ্গে সাবেক মেয়র মনজুর আলমকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেখা যাবে। আওয়ামী লীগ গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছে এমন গুঞ্জন আছে। কিন্তু ক্ষমতায় এসে বিএনপি আওয়ামী লীগের কফিনে শেষ পেরেকটি মারেন! অর্থ্যাৎ সংসদে ইউনূস সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করে আওয়ামী লীগকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। আওয়ামী লীগ স্থানীয় নির্বাচন ও বিভিন্ন পেশাজীবি সংগঠনের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিকে সমর্থন দিয়ে বিএনপি প্রার্থীদের শোচনীয় পরাজয় দেখার অপেক্ষায় রয়েছে, এমনটাই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিএনএ/সৈয়দ সাকিব
![]()

