বিএনএ, ডেস্ক : সিনেমা হলের অন্ধকার পর্দায় আমরা চঞ্চল চৌধুরীকে দেখেছিলাম অন্যের বদলে জেল খাটতে। পর্দার সেই ‘আয়নাবাজি’ দেখে আমরা তালি দিয়েছিলাম, শিউরে উঠেছিলাম। কিন্তু সিনেমা যখন বাস্তবকে ছাড়িয়ে যায়, তখন শিউরে ওঠার চেয়েও মেরুদণ্ড দিয়ে হিমস্রোত বয়ে যায়! হ্যাঁ, ঠিক তেমনই এক অবিশ্বাস্য, রোমহর্ষক আর গা শিউরে ওঠা ‘আয়নাবাজি’ এবার ঘটলো বাস্তবে, আমাদের চিরচেনা কক্সবাজার কারাগারে!
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালে। কক্সবাজারে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয় এক ব্যক্তি, যার নাম নথিতে লেখা হয় ‘সোনা মিয়া’। এরপর ২০২২ সালে আদালত থেকে জামিন নিয়ে চম্পট দেয় সেই আসল অপরাধী। দীর্ঘ শুনানির পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত সেই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায় কী? মৃত্যুদণ্ড! ফাঁসির আদেশ!

ফাঁসির আসামিকে ধরতে পুলিশ যখন রামু থেকে ‘সোনা মিয়া’ নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে কনডেমড সেলে পাঠায়, তখনই ঘটে মূল টুইস্ট! খাঁচায় বন্দি থাকা দিনমজুর সোনা মিয়া চিৎকার করে বলতে থাকে— “আমি অপরাধী নই! আমি কোনো ইয়াবা পাচার করিনি! আমি সেই সোনা মিয়াই নই!” প্রথমে কেউ তার কথা বিশ্বাস করেনি। ভেবেছিল ফাঁসির ভয়ে বাঁচার আকুতি।
কিন্তু খোদ পুলিশের তদন্তে যখন কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে এলো, তখন দেশের মানুষের চোখ চড়কগাছ! তদন্ত বলছে— ২০২০ সালে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ যে ব্যক্তি ধরা পড়েছিল, সে আসলে সোনা মিয়াই ছিল না! সে ছিল রমজান নামের এক রোহিঙ্গা নাগরিক! চতুর রমজান নিজের আসল পরিচয় লুকাতে প্রকৃত সোনা মিয়ার একটি হারিয়ে যাওয়া জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়েছিল। আর মামলার চার্জশিটেও পুলিশ সেই ভুয়া নামটাই বসিয়ে দেয়!
আইনের এই অন্ধ গলিতে এক নিরীহ মানুষের জীবন প্রদীপ যখন নেভার উপক্রম, তখনই রক্ষক হয়ে দাঁড়ায় এদেশের গণমাধ্যম! এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় এক নিরপরাধ মানুষের জীবন বাঁচাতে গণমাধ্যম “ফোর্থ এস্টেট” বা সমাজের দর্পণ হিসেবে তার দায়িত্ব শতভাগ পালন করেছে। দেশের প্রধান জাতীয় দৈনিক, টেলিভিশন চ্যানেল ও অনলাইন পোর্টালগুলো এই রোমহর্ষক জালিয়াতির ঘটনা নিয়ে একের পর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকে। মিডিয়ার এই চাবুকের মতো প্রতিবেদনের কারণেই দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং তদন্তকারী প্রশাসন ও বিচার বিভাগ নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়।
গণমাধ্যমের তৈরি করা তীব্র চাপের মুখে অবশেষে জয় হলো সত্যের। আদালতের নির্দেশে হওয়া পুনঃতদন্তে সোনা মিয়ার নির্দোষিতা শতভাগ প্রমাণিত হয় । যার পরিপ্রেক্ষিতে, ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত ৪টি শর্ত সাপেক্ষে এই নিরীহ দিনমজুর সোনা মিয়াকে মুক্তির চূড়ান্ত আদেশ দেন ! আর সমস্ত প্রশাসনিক আইনি প্রক্রিয়া শেষে শুক্রবার দুপুরে সোনা মিয়া কারাগার থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পেয়ে ফিরে গেছেন তার পরিবারের কাছে ।
প্রশ্ন, কোথায় আসল অপরাধী? সেই চতুর রোহিঙ্গা রমজান এখন পলাতক। পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। সে ধরা পড়লেই কার্যকর হবে আদালতের সেই মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত রায় এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
সিনেমার আয়নাবাজি শেষ হয়েছিল তালি আর প্রশংসায়। আর বাস্তবের এই আয়নাবাজি শেষ হলো গণমাধ্যমের বলিষ্ঠ ভূমিকা আর এক নিরীহ ব্যক্তির প্রাণে বেঁচে যাওয়ার মধ্য দিয়ে । তবে এই ঘটনা আমাদের তদন্ত আর বিচার ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা গাফিলতিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। যদি গণমাধ্যম সোচ্চার না হতো, তাহলে অন্য কারও পাপে এক নিরপরাধ মানুষের প্রাণ যেত। শুধু তাই নয় তার খেসারত বয়ে বেড়াতে হতো তার পরিবারকে।
বিএনএ/ শামীমা চৌধুরী শাম্মী
![]()

