বিএনএ, ঢাকা: ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক, শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহচর এবং নয়বারের সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ। পহেলা জুন ৮২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তার এই প্রস্থান কেবল একজন প্রবীণ নেতার মৃত্যু নয়, বরং এটি সমকালীন বাংলাদেশের রাজনীতির এক জটিল ও নির্মম বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। যিনি ইতিহাস তৈরি করেন, ইতিহাস কি সবসময় তার প্রতি সদয় থাকে?
১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন যে তোফায়েল আহমেদ, তিনিই শেষ জীবনে এসে নিজ দলে চরমভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। কিন্তু কেন?

যে মানুষটি আজীবন ক্ষমতার শীর্ষ বলয়ে ছিলেন, তার জানাজা কেন সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় হতে দেওয়া হলো না? শহীদ মিনারে কেন মিলল না সর্বস্তরের শ্রদ্ধার অনুমতি? অথচ কয়েক মাস আগে নিহত হওয়া ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদির ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সম্পূর্ণ ভিন্ন আচরণ করেছিল! আজ আমরা আবেগ সরিয়ে, ক্ষমতার ভেতরের সেই মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করব।
তোফায়েল আহমেদের অবহেলিত হওয়ার সূত্রপাত আজকের নয়। এর মূল প্রোথিত রয়েছে ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন বা সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। সেই সময় আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ ‘মাইনাস-টু ফর্মুলা’ ও সংস্কারপন্থার পক্ষে অবস্থান নেয়, যার অন্যতম অগ্রভাগে ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। শেখ হাসিনা একে রাজনৈতিক ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখেছিলেন।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর শেখ হাসিনা এই ক্ষত ভোলেননি। তোফায়েল আহমেদকে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম বা প্রেসিডিয়াম থেকে সরিয়ে নামেমাত্র ‘উপদেষ্টা পরিষদে’ পাঠানো হয় । শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দর্শনে অনুগত তরুণ নেতৃত্ব প্রাধান্য পেতে শুরু করে এবং তোফায়েল আহমেদের মতো প্রবীণ ও নিজস্ব জনভিত্তি থাকা নেতাদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। তিনি হয়ে পড়েন নিজ দলেই এক প্রকার কোণঠাসা ও ক্ষমতাহীন আইকন।
অনেকের মনেই প্রশ্ন, তোফায়েল আহমেদ তো দেশের একজন লিজেন্ডারি সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ছিলেন। তবে ২০২৬ সালের জুনে এসে কেন তার জানাজা বা বিদায়ের এই রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় বাধা এলো? এখানে বুঝতে হবে টাইমিং বা সময়কাল। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং আওয়ামী লীগের ওপর তীব্র রাজনৈতিক ও আইনি চাপ তৈরি হয়।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে স্বৈরাচারী শাসনের সহযোগী বা সেই শাসনের অংশীদারদের প্রতি কঠোর মনোভাব বজায় রাখা হচ্ছে। তোফায়েল আহমেদ শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বড় কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলেননি—এই রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থেকেই বর্তমান প্রশাসন সংসদ ভবনের মতো রাষ্ট্রীয় সংবেদনশীল স্থানে তার জানাজা কিংবা শহীদ মিনারে বড় ধরনের গণজমায়েতের অনুমতি দেয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার এখানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা বা আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের সুযোগ দিতে চায়নি।
এখানেই তৈরি হয় সবচেয়ে বড় বিতর্ক। দর্শক, অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি—যিনি রাষ্ট্রের কোনো আনুষ্ঠানিক পদে ছিলেন না—তার জানাজা সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় হয়েছে এবং তাকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে সমাহিত করা হয় । তাহলে ৯ বারের এমপি তোফায়েল আহমেদ কেন বঞ্চিত হলেন?
রাজনীতিতে এর উত্তর খুব সরল কিন্তু রূঢ়। ওসমান হাদিকে দেখা হয় জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার অন্যতম প্রতীক বা ‘শহীদ’ হিসেবে । বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ওসমান হাদি হচ্ছেন বর্তমান ব্যবস্থার বৈধতা ও শক্তির উৎস, যার কারণে তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, তোফায়েল আহমেদ যতই বড় ঐতিহাসিক নেতা হোন না কেন, তার শেষ পরিচয়টি ছিল পতন হওয়া বিতর্কিত শাসনব্যবস্থার একজন প্রবীণ সংসদ সদস্য হিসেবে। তাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পুরনো ব্যবস্থার কোনো নায়ককে রাষ্ট্রীয়ভাবে বড় মঞ্চ দিতে অনীহা প্রকাশ করেছে।
ইতিহাস বড্ড নির্মম। ১৯৬৯-এর ছাত্র আন্দোলনের যে তরুণ তোফায়েল শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের জোয়ার এনেছিলেন, জীবনের শেষলগ্নে এসে তিনি নিজেই নিজ দলের ভেতর ব্রাত্য হয়ে রইলেন। আর মৃত্যুর পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার শিকার হয়ে নীরবেই তাকে চলে যেতে হলো নিজ জন্মভূমি ভোলায় । তোফায়েল আহমেদের এই শেষ পরিণতি কি বাংলাদেশের রাজনীতির এক চিরন্তন ট্র্যাজেডি? নাকি ক্ষমতার অপব্যবহারের এক অলিখিত খেসারত?
শামীমা চৌধুরী শাম্মী
![]()

