বিএনএ, ঢাকা: ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান আর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অগ্রসৈনিক, ডাকসুর সাবেক ভিপি—তোফায়েল আহমেদ। যিনি একসময় রাজপথ কাঁপিয়েছেন, যার কণ্ঠে প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ক্ষমতার পালাবদলে তাকে কাটাতে হয়েছে এক চরম নিষ্ঠুর ও বেদনাবিধুর সময়।”

বয়সের ভারে ন্যুব্জ, স্মৃতিশক্তি হারিয়ে নির্বাক তোফায়েল আহমেদকে শেষ বয়সেও আইনি কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। ২৪ বছরের পুরোনো একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে জারি করা হয়েছিল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। যেখানে তার আইনজীবীরা বারবার আদালতকে জানিয়েছেন—তোফায়েল আহমেদ কাউকে চিনতে পারেন না, স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন—সেখানে এমন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৈরি করেছে এক চরম প্রশ্নচিহ্ন।”
তোফায়েল আহমেদের পরিবারের, বিশেষ করে তার বোনের কান্নাবিজড়িত দাবি—মৃত্যুকালে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। তিনি তার ভাইয়ের এই পরিণতি মেনে নিতে পারেননি। শুধু তোফায়েল আহমেদই নন, বোন এবং পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, সারাদেশের কারাগারগুলোতে যেন এক অমানবিক পরিবেশ বিরাজ করছে। তাদের দাবি—কারান্তরীণ আওয়ামী লীগের নেতাদের কেউ বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরছেন, আবার কারও বিরুদ্ধে বিষ প্রয়োগের মতো গুরুতর অভিযোগও আছে।”
সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাজনীতিতে জয়-পরাজয় থাকে, থাকে উত্থান-পতন। কিন্তু মৃত্যুকালে একজন সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, গ্রেপ্তার আতঙ্ক আর বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর অভিযোগ—এই সবকিছুই আমাদের আইনের শাসন ও মানবতার জায়গাটিকে নাড়া দেয়। আজ তিনি পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। তার দীর্ঘ সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবন এবং শেষ জীবনের এই নির্মম ট্র্যাজেডি হয়তো যুগ যুগ ধরে আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।”
সব বাধা, সব নিষেধাজ্ঞা আর রাজনৈতিক বৈরিতাকে উপেক্ষা করে প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো দেখতে নেমেছিল মানুষের ঢল। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক, আওয়ামী লীগের রাজনীতির অন্যতম অভিভাবক তোফায়েল আহমেদের শেষ বিদায়ে সৃষ্টি হলো এক অভূতপূর্ব ও আবেগঘন দৃশ্য। প্রিয় নেতাকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন উপস্থিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের হাজারো নেতাকর্মী।
দীর্ঘদিন পর রাজপথে আবার ধ্বনিত হলো সেই চিরপরিচিত স্লোগান। জানাজা প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে চারপাশের বাতাস কাঁপিয়ে উঠল ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে। প্রবীণ এই নেতার বিদায়লগ্নে উপস্থিত নেতাকর্মীদের এই স্লোগান যেন ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা আবেগ আর প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এই আবেগঘন পরিবেশেও কাটেনি রাজনৈতিক উত্তাপ।
একদিকে স্বজন আর নেতাকর্মীদের আহাজারি, অন্যদিকে জানাজাস্থল ও এর আশপাশ থেকে আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও থমথমে হয়ে ওঠে। কড়া নিরাপত্তার মাঝেই প্রিয় নেতাকে চিরবিদায় জানাতে এসে গ্রেপ্তার আতঙ্কে ভুগতে হয়েছে অনেককে। তবুও তোফায়েল আহমেদের প্রতি ভালোবাসার টানে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মাঠ ছাড়েননি তারা।”
রাজনীতির মাঠে কত চড়াই-উতরাই দেখেছেন এই মানুষটি। যিনি একসময় লক্ষ কোটি জনতাকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আজ তিনি নিজেই চিরতরে শান্ত। তোফায়েল আহমেদের এই বিদায় শুধু একটি পরিবার কিংবা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি করল। অশ্রুসিক্ত নয়নে, ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের প্রতিধ্বনিতে মাটি চাপা পড়ল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক প্রোজ্জ্বল অধ্যায়।
শামীমা চৌধুরী শাম্মী
![]()

