Bnanews24.com
কভার সম্পাদকীয়

অভিশপ্ত ২০, প্রত্যাশার ২১ এবং বাংলাদেশ

বিএনএ নিউজ সম্পাদকীয়

।। মিজানুর রহমান মজুমদার।।

১৭২০ সাল থেকে ২০২০ এই চার শতাব্দিতে, প্রতি ১০০ বছর অন্তর অন্তর মানব সভ্যতা পড়েছে হুমকির মুখে। ১৭২০ সালে, ইউরোপ শেষবারের মতো এবং সর্ববৃহৎ আকারের প্লেগ মহামারী দেখা দিয়েছিল, যা পরিচিত ‘গ্রেট প্লেগ।

১৮১৭ সালে ভারতের কলকাতা শহরেই প্রথম কলেরা রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। কলেরার ব্যাকটেরিয়ায় দূষিত এক জলাশয়ের ছড়িয়ে পড়া এ রোগে লক্ষাধিক লোক মারা যায়। ১৮২৪ পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল।

১৯১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯২০-র ডিসেম্বর পর্যন্ত চলেছিল স্প্যানিশ ফ্লু বা ১৯১৮ ফ্লু প্যানডেমিক। সেই ফ্লুতে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। তার ১০০ বছর পর এলো কোভিড-১৯ যা করোনা ভাইরাস নামে পরিচিত।

সারা বিশ্বকে থমকে দেয়া সেই প্রাণঘাতি ভাইরাসটি প্রথম সন্ধান পাওয়া যায় চীনের উহানে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের শেষে লি ওয়েনলিয়াং নামের চীনের এক এপিডেমোলজিস্ট বা মহামারি বিশেষজ্ঞ হুবেই প্রদেশের উহান শহরে উদ্ভূত হওয়া এক নতুন ভাইরাস সম্পর্কে চীনের অন্যান্য এলাকার চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা পাঠানোর চেষ্টা করেন।পরবর্তীতে অযথা আতঙ্ক ছড়ানোর অভিযোগে তাকে সতর্ক করে পুলিশ। উহানে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে ৬ই ফেব্রুয়ারি মারা যান ডক্টর লি। এর পর তোলপাড় শুরু হয় সারা বিশ্বে।

তবে ২০১৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর প্রথমবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে চীন জানায় যে অজানা কারণে নিউমোনিয়া হয়ে তাদের দেশে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা হচ্ছে। ৩ জানুয়ারি উহানের ‘অজানা ভাইরাস’ নিয়ে প্রথম প্রতিবেদন তৈরি করে বিবিসি। সেসময় মাত্র ৪৪ জনের মধ্যে ঐ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল, যাদের মধ্যে ১১ জনের অবস্থা গুরুতর ছিল।

বাংলাদেশে প্রথম কোভিড-১৯ শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। ২৬ মার্চ থেকে লকডাউনে চলে যায় দেশ। ফলে অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা দেয়। জুলাই থেকে নতুন অর্থবছর শুরু হলে অর্থনীতিও ধীরে ধীরে উত্তরণের পথে যেতে শুরু করে।

করোনার কারণে দেশের শিল্পকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল, তা এরই মধ্যে কাটতে শুরু করেছে। ঝুঁকি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অর্থনীতি সচল করার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠনের ঘোষণা দেন। শুধু সাহসের ওপর ভর করে প্রধানমন্ত্রী হাত ধোয়া ও মাস্ক পড়া ফর্মুলা দিয়ে দেশের মানুষকে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রেরণা দিয়েছেন। এটি ছিল  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার  যুগোপযোগী সাহসী পদক্ষেপ। তারই ধারাবাহিকতায় মানুষের নিরাপদ আবাসন ও অর্থনীতিতে অনেক দেশের তুলনায় এখনো ভালো অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ। সেটি খুবই আশাব্যঞ্জক দিক। বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি নিয়ে আমাদের মধ্যে যে ভীতি তৈরি হয়েছিল, সেটি কেটে গেছে। অর্থনীতির চাকা আবারও আগের মতো ঘুরতে শুরু করেছে।করোনাভাইরাসের মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বা ৩৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে রেকর্ড।

করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনীতি প্রায় তিন মাস কার্যত অচল থাকলেও এ সময় বাংলাদেশের মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু গড় আয় ২০০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থ বছর শেষে দেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় দাঁড়ায় ২ হাজার ৬৪ ডলার, আগের অর্থবছরে যা ছিল ১ হাজার ৯০৯ ডলার। এর মানে হচ্ছে, মাথাপিছু গড় আয় এক বছরের ব্যবধানে ১৫৫ ডলার বেড়েছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ি, বাংলাদেশি মুদ্রায় মানুষের মাথাপিছু আয় বছরে দাঁড়াচ্ছে গড়ে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ, মাসে গড় আয় প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ টাকার মতো।

শিল্পকারখানাগুলো করোনার ধাক্কা যেভাবে মোকাবিলা করেছে, তাতে নতুন বছরে শেয়ারবাজার নিয়ে বেশ আশাবাদী বিশেষজ্ঞরা। ২০২১ সাল হতে পারে শেয়ারবাজারে টার্নিং ইয়ার বা ঘুরে দাঁড়ানোর বছর।

গেল বছরে বাংলাদেশে ‘নিধিরাম সরদার’এর মতো কোভিড-১৯ মোকাবেলা অত্যন্ত জোরালো ভূমিকা পালন করেছে দেশের ডাক্তার, নার্সসহ স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কর্মরত কর্মকর্তা–কর্মচারিরা। কোন অভিজ্ঞতা ছাড়াই তারা দেশের লাখ লাখ মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে সেবার মাধ্যমে ফিরিয়ে এনেছেন। অনেকে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। এছাড়া দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী মানবিক সহায়তায় এগিয়ে এসেছে। রাতদিন মানবিক সেবা ও নিরাপত্তা দিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন শত শত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। এর পরে রয়েছে ব্যাংক কর্মীরা।

করোনাভাইরাসের আর্থিক ক্ষত মোকাবিলায় সরকার যে উদ্যোগ নেয়, তা বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোর  ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ব্যাংকগুলোকে বাড়তি কাজ করতে হয়েছে। যখন দেশে লকডাউন ছিল, তখনো ব্যাংক খোলা ছিল। করোনার কারণে অনেক ব্যাংক কর্মকর্তাকেও আমরা হারিয়েছি। এ সব শহীদের পরকালীন শান্তি কামনা করি।

বাঙ্গালি বীরের জাতি! কোন ট্রেনিং, অভিজ্ঞতা, সমরাস্ত্র ছাড়াই শুধু মাত্র কৌশল ও সাহসের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের  নির্দেশনায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করেছে। বিশ্বের দরবারে সমর বীরত্ব  দেখিয়ে তাক লাগিছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে তারই সুযোগ্য কন্যা শুধু সাহস ও কৌশলের মাধ্যমে কোভিড-১৯ ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে রেখে অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবন সচল রেখেছেন। করোনার মধ্যে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো যখন পিছিয়ে গেছে, তখন বাংলাদেশ অর্থনীতিতে চমক এনেছেন। কোন ষড়যন্ত্র বাংলাদেশের অগ্রগতিকে রুখতে পারবে না। বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ তার ভাষণে বলেছিলেন, ‘‌‌‌‌‌‍‌‌দাবিয়ে রাখতে পারবা না’। ৭১ এ স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে এটি প্রমাণ করেছেন বঙ্গবন্ধু, এর  ৫০ বছর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতার কথাকে আবারও সত্য প্রমাণ করলেন। বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছেন আমরাও পারি! পদ্মা সেতু তারই প্রমাণ। অভিনন্দন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। অভিনন্দন কোভিড-১৯ লড়াইয়ের সম্মুখ সারির সকল যোদ্ধাসহ দেশের উন্নয়নকামি জনগণকে।