Bnanews24.com
অর্থ-বাণিজ্য কভার চট্টগ্রাম বিশেষ সংবাদ সব খবর

সিইউএফএল’এ ঘুষে বয়স কমে!

সিইউএফএলএ-ঘুষে-বয়স-কমে

বিএনএ,ঢাকা, বিশেষ প্রতিনিধি: ‘সবাই বলে বয়স বাড়ে, আমি বলি কমে রে’ এটি প্রয়াত গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীতজ্ঞ আলাউদ্দিন আলীর জনপ্রিয় গানের কথার প্রথম দুই চরণ। গানের এ চরণগুলো প্রমাণ পাওয়া গেছে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) এর শ্রমিক-কর্মচারিদের ক্ষেত্রে। কারখানার ১২১ জন শ্রমিক-কর্মচারির আবেদনপত্র, শিক্ষা সনদ ও পুলিশ ভেরিফিকেশনে ভিন্ন ভিন্ন জন্ম তারিখ রয়েছে। এর মধ্যে অনেকে ঘুষ দিয়ে বয়স কমিয়েছেন। অনেকে চেষ্টা তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।

অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (বিএসআর) ও বিসিআইসি’র পরিপত্রের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সিইউএফএল ‘এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে যুগযুগ ধরে চাকুরি করে যাচ্ছেন শ্রমিক-কর্মচারিদের একটি অংশ। বিভিন্ন সময় অডিট আপত্তির পর সিইউএফএল এর শীর্ষ কর্মকর্তা ও সিবিএ নেতাদের ম্যানেজ করে অনেক শ্রমিক-কর্মচারি আবেদনপত্র, শিক্ষা সনদ ও পুলিশ ভেরিফিকেশন বদল করে বয়স কমিয়েছেন! ২০১৮-২০১৯ ও ২০১৯-২০২০ সালের অডিট আপত্তিতে বিষয়টি ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ফলে বয়সজনিত সমস্যা রয়েছে এমন শ্রমিক-কর্মচারিরা দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন। অনেকে সিবিএ নেতাদের শরণাপন্ন হয়েছেন।

ভোটের রাজনীতিতে শ্রমিক-কর্মচারিদের আস্থায় আনতে সিবিএ’র কতিপয় নেতা বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে দেন-দরবার করে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে শ্রমিক-কর্মচারিদের  থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। গত ১৫ দিনে অন্তত: ৮ জনের কাছ  দেড়লাখ হারে ঘুষ নিয়েছেন। যাদের থেকে ঘুষ নেয়া হয়েছে তাদের বলা হয়েছে এ টাকায় সিইউএফএল; এর শীর্ষ কর্মকর্তা এবং বিসিআইসি’র নিরীক্ষা দলকে ম্যানেজ করা হবে। ওপেন-সিক্রেট ঘুষ নেয়ার বিষয়টি নিয়ে সিইউএফএল’র শ্রমিক-কর্মচারি-কর্মকর্তাদের মধ্যে তোলপাড় চলছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) এ’ প্রশাসন বিভাগে সংরক্ষিত শ্রমিক-কর্মচারিদের নথি গুলোর মধ্যে  দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ৯টি নথি নিরীক্ষা করার জন্য নেয় বিসিআইসি’র নিরীক্ষা দল। এর মধ্যে ৯ জনের নথিতে বয়সজানিত গোঁজামিল পায়। বিষয়টি সুত্র নং- নিবিভা/নিদখ/ সিইউএফএল/২০১৮-২০২০/৬৮ তারিখ ২৮/১২/২০২০ এর মাধ্যমে অডিট আপত্তি দেয় উপ-প্রধান নিরীক্ষক এস এম শাহনেওয়াজ।

অডিট আপত্তিতে বলা হয়, ‘নমুনা ভিত্তিতে সিইউএফএল এর ৯ জন শ্রমিক-কর্মচারির ব্যক্তিগত নথি পরীক্ষান্তে দেখা যায় নথিতে সংযুক্ত আবেদনপত্রে উল্লেখিত জন্ম তারিখের সাথে শিক্ষা সনদ, পুলিশ ভেরিফিকেশন, জীবন বৃত্তান্ত, এনরোলমেন্ট নাম্বার ও মেডিকেল সার্টিফিকেটের জন্ম তারিখের কোন মিল পাওয়া যায়নি। ভিন্ন ভিন্ন কাগজপত্রে ভিন্ন ভিন্ন জন্ম তারিখ পরিলক্ষিত। একই নথিতে একাধিক জন্ম তারিখ থাকায় বয়স জনিত কারণে অবসর প্রদানে ভবিয্যতে আইনগত জঠিলতার সৃষ্টি হতে পারে। আইনগত জঠিলতা এড়ানোর লক্ষ্যে বিষয়টি তদন্তপূর্বক বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস ( বিএসআর) ও বিসিআইসি’র পরিপত্র অনুসরণ করত: কারখানার সকল শ্রমিক/ কর্মচারির প্রকৃত বয়স নির্ধারণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক’ বলে  মন্তব্য করা হয়।

সূত্র জানায়,  চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) এ অসংখ্য শ্রমিক কর্মচারির নথিতে বয়সজানিত সমস্যা রয়েছে।  চাকুরি নেয়ার সময় এসএসসি পাশ করেনি এমন  শ্রমিক-কর্মচারিদের নিয়ে জঠিলা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের জীবন বৃত্তান্তের সঙ্গে দেয়া শিক্ষা সনদ এবং চাকুরি হওয়ার পর পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্টে বয়সের অমিল রয়েছে।

দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ১৫টি নথি নিরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৯ জনের বয়সের ভিন্নতা রয়েছে। তাদের বিষয়ে অডিট আপত্তি দেয়া হয়েছে। এরা হচ্ছে, ১. কামাল আহমেদ, কর্মচারি নং-৪৪০৩, পদবী নিরাপত্তা হাবিলদার,  যোগদানের তারিখ ২৮ এপ্রিল ১৯৮৮ সাল। আবেদন পত্রে জন্ম তারিখ উল্লেখ করা হয় ৫ জানুয়ারি ১৯৬১ সাল। মেডিকেল সার্টিফিকেটে জন্ম তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ৫ জানুয়ারি ১৯৬০ সাল। পুলিশ ভেরিফিকেশনে জন্ম তারিখ ৪ মে ১৯৫৯ সাল।

২.  যেকব মুরমু, কর্মচারি নং-৭২০৬, পদবী এমটি,  যোগদানের তারিখ, ৩ জানুয়ারি ১৯৮৮ সাল। অডিট আপত্তিতে তার নামের পাশে তিনটি জীবন বৃত্তান্তে তিনটি জন্ম দেখা যায়। এগুলো হচ্ছে, ১ জানুয়ারি ১৯৫৮ সাল, ১ জানুয়ারি ১৯৫৯ সাল এবং  ২৪ ডিসেম্বর ১৯৬৯ সাল। পুলিশ ভেরিফিকেশনে উল্লেখ রয়েছে ১ জানুয়ারি ১৯৫৯ সাল।

৩.  আব্দুল সবুর, কর্মচারি নং-৬০৪০, পদবী এমটি,  যোগদানের তারিখ, ৫ জুন ১৯৮৮ সাল। জীবন বৃত্তান্তে জন্ম তারিখ ১ জানুয়ারি ১৯৬২, ইউপি সার্টিফিকেটে ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৭ এবং মেডিকেল সার্টিফিকেটে ১ জানুয়ারি ১৯৫৯ সাল উল্লেখ রয়েছে।

৪.  আবু জাহের, কর্মচারি নং-৬০৪৬, পদবী এমটি,  যোগদানের তারিখ, ২৯ মে ১৯৮৮ সাল। আবেদন পত্রে তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। শুধু সাল উল্লেখ আছে ১৯৬৪। তবে শিক্ষা সনদ ও পুলিশ ভেরিফিকেশনে ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫ সাল জন্ম তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে।

৫. মো: মুজিবুর রহমান, কর্মচারি নং- ৭৬০৯, পদবী এমটি, যোগদানের তারিখ ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮ সাল। তার কোন আবেনপত্র বা জীবনবৃত্তান্তের উল্লেখ নেই অডিট আপত্তিতে। শিক্ষা সনদে ৫ এপ্রিল ১৯৬৫ সাল এবং এনরোলমেন্ট মেম্বারে জন্ম তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ১৫ জুন ১৯৬১ সাল।

৬.  মোহাম্মদ ইউসুফ কর্মচারি নং- ৬০৫৩, পদবী এমটি (অবসরপ্রাপ্ত) , যোগদানের তারিখ ২৪ ফেব্রুয়ারি অক্টোবর ১৯৮৭ সাল। আবেদনপত্রে জন্ম তারিখ ১৫ জুন ১৯৫৯ সাল। পুলিশ ভেরিফিকেশন ও শিক্ষা সনদে ১৫ জুন ১৯৫৩ সাল জন্ম তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে।

৭. মো: মাহবুবুল আলম, কর্মচারি নং- ৪৬০২, পদবী ড্রাইভার, যোগদানের তারিখ ১০ মে ১৯৮৮ সাল। আবেদনপত্রে জন্ম তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ১৫ মার্চ ১৯৬৭ সাল, পুলিশ ভেরিফিকেশনে উল্লেখ আছে ১৫ মে ১৯৬৯ সাল।

৮. মোজাম্মেল হক, কর্মচারি নং- ৪৬৪৬, পদবী ড্রাইভার, চাকুরিতে যোগদানের করেন ১৯ আগস্ট ১৯৮৫ সাল। তার দুইটি আবেদনপত্র রয়েছে।  অডিট আপত্তিতে দেখা যায়, একটি আবেদনপত্রে জন্ম তারিখ ২৩ জুন ১৯৫৬ সাল, অন্যটিতে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬২ সাল। তার ড্রাইভিং লাইসেন্সের উল্লেখ করা  জন্ম তারিখ ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬০ সাল।

৯. মো: ইলিয়াস, কর্মচারি নং-৩৭০২, পদবী ড্রাইভার,  যোগদানের তারিখ, ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮ সাল। আবেদন পত্রে জন্ম তারিখ ৩ ফেরুয়ারি ১৯৬৫ সাল, পুলিশ ভেরিফিকেশনে উল্লেখ রয়েছে ১৮ অক্টোবর ১৯৬৫ সাল। অবাক বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে মেডিকেল সার্টিফিকেটে বয়স উল্লেখ করা হয়েছে ৩ ফেরুয়ারি ১৯৮৮ সাল। অডিট আপত্তিতে দেখা যায় মেডিকেল সার্টিফিকেট  অনুয়ায়ি  ড্রাইভার ইলিয়াস  সিইউএফএ’এ চাকুরিতে যোগদানের পরের দিন জন্ম গ্রহণ করেছেন! এখানে টাইপিং ভুল নাকি সত্যই সার্টিফিকেটে জন্ম তারিখ ৩ ফেরুয়ারি ১৯৮৮ সাল উল্লেখ করা হয়েছে তা নিশ্চিত করা যায়নি। প্রশ্ন হচ্ছে,  ড্রাইভার ইলিয়াস কখন অবসরে যাবেন?

অডিট আপত্তিতে বলা হয়, কি অবস্থার প্রেক্ষিতে, কারখানার শ্রমিক-কর্মচারিদের ব্যক্তিগত নথিতে সংযুক্ত আবেদনপত্রের উল্লেখ করা জন্ম তারিখের সঙ্গে শিক্ষা সনদ, পুলিশ ভেরিফিকেশন, জীবন বৃত্তান্ত, এনরোলমেন্ট নাম্বার ও মেডিকেল সার্টিফিকেটে জন্ম তারিখের  মিল না থাকা সত্ত্বেও এতদ বিষয়ে কেন ব্যবস্থা গ্রহণ হচ্ছে না। তার বিস্তারিত ব্যাখা সিইউএফএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিভাগীয় প্রধান (হিসাব ও অর্থ/ প্রশাসন)কে নিরীক্ষা বিভাগে জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়।

এ বিষয়ে সিইউএফএল’ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রহীম  বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ)কে বলেছেন, অডিট আপত্তির বিষয়টি তিনি এখনো জানেন না। যদি কারখানার শ্রমিক-কর্মচারিদের ব্যক্তিগত নথিতে একাধিক জন্ম তারিখ থাকে তা হলে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস ( বিএসআর) ও বিসিআইসি’র পরিপত্র অনুসরণ করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিএনএ/ওয়াইএইচ,এসজিএন