Bnanews24.com
Home » হাজার কোটি টাকা পাচারকারী মোর্শেদ–মাহজাবিন দম্পতি দেশেই আছে!
কভার বিশেষ সংবাদ

হাজার কোটি টাকা পাচারকারী মোর্শেদ–মাহজাবিন দম্পতি দেশেই আছে!

বিএনএ, ঢাকা: এলিট ব্যবসায়ি দম্পতি। একই সঙ্গে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা। স্বামী পার্টির  ভাইস চেয়ারম্যান, স্ত্রী  জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসন (৪৫) এর  সাবেক সংসদ সদস্য। রাজনীতিতে সক্রিয় না হয়েও টাকার জোরে এ দম্পতি পদ-পদবি পেয়েছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গণে প্রচার রয়েছে। তাদের নামে-বেনামে তার পারিবারিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে অন্তত ৯৯০ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। যা পরিশোধ করেননি। বলছি, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ি ও রাজনীতিবিদ মোর্শেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও সাবেক এমপি বেগম মাহজাবিন মোর্শেদের কথা।

হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের সঙ্গে জড়িত এ দম্পতির বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে।  তারা এখন দেশেই আছে। কিন্তু পুলিশ তাদের খুঁজে পাচ্ছে না!

মোর্শেদ  মুরাদ ইব্রাহিম
মোর্শেদ  মুরাদ ইব্রাহিম

 

কে এই মোর্শেদ- মাহজাবিন?

চট্টগ্রাম সিটি করপোরশেন এর সাবেক প্রশাসক  সেকান্দর হোসেন মিয়ার পুত্র মোর্শেদ  মুরাদ ইব্রাহিমের বাড়ি চট্টগ্রামের মাঝিরঘাট সড়কের পূর্বমাদারবাড়ি। তিনি চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি। তার স্ত্রী মাহজাবিন মোর্শেদ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের (মহিলা আসন-৪৫) সাবেক সদস্য।মোর্শেদ মুরাদ ইব্রাহিম জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান এবং তার স্ত্রী বেগম মাহজাবিন  জাপা চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা। এই এলিট দম্পতি রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অঙ্গনে পরিচিত মূখ। মোর্শেদ মুরাদ সাবেক ফারমার্স ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক ছিলেন। ঋণ খেলাপি হওয়ায় তিনি এ পদ হারিয়েছেন।

সাবেক ফারমার্স ব্যাংকের ১ কোটি শেয়ার বা ২ দশমিক ৪৯ শতাংশ মালিকানা ছিল মোর্শেদ মুরাদের হাতে। প্রতিটি শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকা হিসাবে ফারমার্স ব্যাংকে মোর্শেদ মুরাদের শেয়ার ছিল ১০ কোটি টাকার। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ব্যাংকটির অন্যতম পরিচালক ছিলেন তিনি। ওই সময় ব্যাংকটি থেকে নামে-বেনামে ঋণ সুবিধাও নিয়েছে তার পরিবার।

মোরেশেদ মুরাদ
বাম থেকে ২য় মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম

বেসিক ব্যাংকের ৬৩৩ কোটি টাকা!

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু বেসিক ব্যাংকেরই খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬৩৩ কোটি টাকা।  এ ছাড়া আরও ৩৬০ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে বিভিন্ন ব্যাংকে। এর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপ ব্রেকিং লিমিটেডের নামে ১৩৪ কোটি ৯৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা, আইজি নেভিগেশনের নামে  ১৪১ কোটি ৫ লাখ টাকা, ক্রিস্টাল ফিশারিজের নামে ১৮ কোটি টাকা এবং একই ব্যাংকের ঢাকার দিলকুশা শাখায় বে নেভিগেশনের নামে ১৩৭ কোটি টাকা।

রুপালী ব্যাংকের ১১৩ কোটি!

রূপালী ব্যাংকের ঢাকার মতিঝিল শাখায় ক্রিস্টাল গ্রুপের নামে ১১৩ কোটি টাকা। দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংকের বনানী শাখায় ৭৫ কোটি টাকা। আল আরাফাহ ব্যাংকের চট্টগ্রামের ও আর নিজাম রোড শাখায় ১৩ কোটি টাকা।  ট্রাস্ট ব্যাংকের ঢাকার দিলকুশা শাখায় ৫০ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংকে মোর্শেদ মুরাদের ফারুক অ্যান্ড সন্সের নামে ২২ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংকের গুলশান শাখায় ৩ কোটি টাকা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিডি ফিন্যান্স থেকে নেওয়া ১৫ কোটি টাকা।

স্বজনদের নামে ঋণ !

মোর্শেদ মুরাদ ইব্রাহিম নিজে জিম্মাদার হয়ে পরিবারের সদস্য, আত্বীয় ও ঘনিষ্ঠজনের প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে আবার তা নিজের প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আত্মসাৎ করার অভিযোগও আছে। এর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের চট্টগ্রামের জুবিলী রোড শাখায় মোর্শেদের ভাই রাশেদের মালিকানাধীন এমআরএফ ট্রেডিংয়ের নামে ৭০ কোটি টাকা। শীতল শিপ ব্রেকার্সের নামে ৭৮ কোটি টাকা ও শাহেদ শিপ ব্রেকার্সের নামে ৪৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা।

ফারমার্স ব্যাংকের চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ শাখায় ভাইয়ের স্ত্রী কানিজ ফাতেমার নামে ৩০ কোটি টাকা। চিটাগাং ফিশারিজের নামে ২৯ কোটি টাকা ও গরিবে নেওয়াজ ফিশিংয়ের নামে ১৭ কোটি টাকা। মোর্শেদ-মাহাজাবিন পরিবারের মালিকানায় থাকা প্রোটেকটিভ ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির নামে ৩ কোটি টাকা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে এসব টাকার পুরোটাই বিদেশে পাচার করেছে। গত এক বছর ধরে তারা নিরুদ্দেশ। ঘরে-অফিসে তালা।

মাহজাবিন মোরশেদ
জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলুর সাথে সাবেক এমপি মাহজাবিন মোরশেদ(ডান থেকে ৩য়)

কোথায় মোর্শেদ-মাহজাবিন দম্পতি?

প্রচার আছে,  মোর্শেদ-মাহজাবিন দম্পতি বর্তমানে কানাডার অন্টারিও প্রদেশের অশাওয়া শহরে বসবাস করছেন বলে জোর প্রচার আছে। গণমাধ্যমে এ সংবাদ প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ)কে তাদের বাড়ির দারোয়ান ও  স্বজনরা এমন তথ্য দিলেও তাকে সম্প্রতি চট্টগ্রাম ক্লাবে দেখা গেছে। এমনকি সেন্টপ্লাসিড স্কুলের একটি অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন বলে একটি সূত্র বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ) কে নিশ্চিত করেছেন। তবে গত এক বছরের বেশি সময় ধরে মাহাজাবিন মোর্শেদকে কোথাও দেখা যায়নি।

ক্রিস্টাল শিপার্স লিমিটেড
ক্রিস্টাল শিপার্স লিমিটেড

ক্রিস্টাল গ্রুপে আছেন কারা?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তরাধিকার সূত্রে ইব্রাহিম কটন মিলের মালিক মোর্শেদ মুরাদ ইব্রাহিম ১৫ বছর আগে মিলটি বিক্রি করে দেন। পরে প্রতিষ্ঠা করেন ক্রিস্টাল গ্রুপ। নিজে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবং মা গুলশান আরা বেগমকে চেয়ারম্যান, স্ত্রী মাহজাবিন ও ভাইয়ের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা রাশেদসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের করা হয় গ্রুপটির পরিচালক। এছাড়া এক ভাই রাশেদ মুরাদ ইব্রাহিমকে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, আরেক ভাই ফয়সাল মুরাদ ইব্রাহিমকে অর্থ-পরিকল্পনা পরিচালক পদ দেন।

প্যাড সর্বস্ব প্রতিষ্ঠান!

ক্রিস্টাল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপ ব্রেকার্স লিমিটেড, ক্রিস্টাল ল্যান্ড মার্ক লিমিটেড, ক্রিস্টাল ফিশারিজ লিমিটেড, ইব্রাহিম ফার্মস লিমিটেড, ম্যাক্স ট্রেড লিমিটেড, এমআরএফ ফিশারিজ লিমিটেড, ফারুক অ্যান্ড সন্স লিমিটেড, হামিদা দোজা লিমিটেড, আইজি নেভিগেশন, বে- নেভিগেশনসহ বেশ কয়েকটি আন্ডার গ্রাউন্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যা শুধু ব্যাংক ঋণ আত্মসাৎ করার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা ছিল না। ব্যাংক থেকে  ঋণখেলাপির বিজ্ঞাপন প্রকাশ হওয়ার পর থেকে সব বন্ধ।

২০১৩ সালে অনুমোদন পাওয়া প্রোটেকটিভ ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের ৬০ শতাংশ শেয়ারের মালিকানায় রয়েছেন মোর্শেদ মুরাদ পরিবারের। এর চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন তার ভাই রাশেদ মুরাদ। মোর্শেদ মুরাদ পরিচালক ছিলেন ইউনিয়ন ইনস্যুরেন্সেরও। এর আগে আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালকও হয়েছিলেন তিনি।

জামানত না রেখে এবং ঋণ!

বেসিক ব্যাংক ১৩৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মোর্শেদ মুরাদের ভাই ফয়সাল মুরাদ ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ১৭ জানুয়ারি মতিঝিল থানায় একটি মামলা করে দুদক। মামলার অভিযোগে বলা হয়, বে নেভিগেশনের এমডি ফয়সাল মুরাদ ইব্রাহিমকে পর্যাপ্ত জামানত না রেখে এবং ঋণ মঞ্জুরের আবেদনে ব্যাংকের দিলকুশা শাখার নেতিবাচক মতামত থাকা সত্ত্বেও ঋণ মঞ্জুর করা হয়। বেসিক ব্যাংকের চট্টগ্রামের জুবিলী রোড শাখা থেকে এমআরএফ ট্রেড হাউজের নামে ঋণ নিয়েছেন মোর্শেদ মুরাদের আরেক ভাই রাশেদ মুরাদ ইব্রাহিম। বতর্মানে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ওই শাখার পাওনার পরিমাণ প্রায় ৭০ কোটি টাকা। তারাও পলাতক রয়েছে।

নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠান

মোর্শেদ মুরাদ ইব্রাহিম  ফারমার্স ব্যাংকের পরিচালক থাকাকালে তিনি উদ্যোক্তা পরিচালকের প্রভাব খাটিয়ে নিজ ব্যাংক থেকে ছয় প্রতিষ্ঠানকে ১৭২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে দেন। এর মধ্যে রয়েছে মো. মনজুরুল ইসলামের মালিকানাধীন রয়েল ডিপ সি ফিশারিজের কাছে ২৪ কোটি ৩৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা, জাহাজ ভাঙা ব্যবসায়ী দিদারুল ইসলামের শীতল এন্টারপ্রাইজে ৭৭ কোটি ৭৫ লাখ ৮৭ হাজার টাকা, জাহাজ ভাঙা খাতের খেলাপি ব্যবসায়ী সাহেদ মিয়ার মালিকানাধীন সাহেদ শিপব্রেকিং ৪৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা, হারুন উর রশিদের বেঙ্গল ট্রেডিংয়ে ১২ কোটি ৪৬ লাখ ৩৫ হাজার টাকা এবং মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের চাচা ও পলাতক খেলাপি ব্যবসায়ী জাহিদ হোসেন মিয়ার জাহিদ এন্টারপ্রাইজে আট কোটি ১০ লাখ ২১ হাজার টাকা।  ফারমার্স ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার মাধ্যমে ঋণ দেওয়া হয়। সব ঋণ খেলাপি হয়ে আছে। এছাড়া মোহাম্মদ দানিয়ালের মিরাজ এগ্রো কমপ্লেক্স এর নামে আছে ২৭ কোটি ৯২ লাখ ৪১ হাজার টাকা।

মাহবুবুল হক চিশতি
মাহবুবুল হক চিশতি

মাহবুবুল হক চিশতি উপখ্যান!

রয়েল ডিপ সি ফিশারিজ একটি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান। তবে তিনি ভুয়া মালিক দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নামে ঋণ পাইয়ে দেন ফারমার্স ব্যাংক থেকে। এ প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজের মালিকানাধীন ক্রিস্টাল ফিশারিজের পুরাতন ও অকেজো ট্রলার বিক্রি করে কৌশলে টাকাগুলো হাতিয়ে নেন। এ কাজে জড়িত ছিলেন তৎকালীন অডিট কমিটির সভাপতি মাহবুবুল হক চিশতি। এ দুজন মিলে কল রিপোর্ট ছাড়াই ঋণ অনুমোদন এবং টাকা ছাড় করাতে সরাসরি সহযোগিতা করেন।

 নিরুদ্দেশ মোর্শেদ-মাহজাবিন দম্পতি!

অনুসন্ধানে জানা যায়, বেসিক ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ২০১৮ সালের ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানায় মোর্শেদ-মাহজাবিন দম্পতির বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেন দুদক।  এর মধ্যে একটি মামলায় মোর্শেদ মুরাদের মালিকানাধীন ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপ ব্রেকিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে ১৩৪ কোটি ৯৩ লাখ ৬৬ হাজার ১৮৫ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।  এছাড়া মাহজাবিন মোর্শেদের বিরুদ্ধে মামলায় বেসিক ব্যাংকের চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখা থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করে ১৪১ কোটি ৫ লাখ ৪৫ হাজার ১০৫ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।

মামলা হওয়ার পর মোর্শেদ মুরাদ ও মাহজাবিন আদালতে উপস্থিত হন। দুইজনই  আত্মসাৎ করা টাকা কিস্তিতে পরিশোধ করার অঙ্গীকার নামা দিয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে লিখিত ও মৌখিকভাবে জানান। আদালত এ অঙ্গীকারের  শর্তে জামিন দেন। কিন্তু ব্যাংকে কোন কিস্তি জমা দেননি, আদালতেও আসেননি। জামিনের শর্ত ভঙ্গ করায়  ২০২১ সালে ১৯ এপ্রিল চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ দুজনের জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এ ব্যাপারে মোর্শেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও মাহজাবিন ইব্রাহীম মোবাইলে বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ) এর পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাদের মোবাইল  বন্ধ পাওয়া যায়।

বিএনএনিউজ২৪,ওয়াই এইচ