Bnanews24.com
Home » ধামরাইয়ে গাজীখালী নদীর বুকে মরুর প্রান্তর!
টপ নিউজ ধামরাই বিশেষ সংবাদ সব খবর

ধামরাইয়ে গাজীখালী নদীর বুকে মরুর প্রান্তর!

গাজীখালী নদী

।। ইমরান খান।। 

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যে খ্যাতি রয়েছে তার পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান নদীর। ছোট বড় প্রায় ৭০০টি নদ-নদী বয়ে গেছে এদেশের ওপর দিয়ে। বাড়িয়েছে বাংলাদেশের সৌন্দর্য। নদীবহুল দেশ বলে স্বভাবতই এদেশের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর দিয়ে নদীর প্রভাব রয়েছে। কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলাদেশে অসংখ্য নদীর সমাবেশ দেখে একে ‘জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলা বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু বর্তমানে নদীগুলোর অবস্থা দেখলে মনে হবে কবিদের কবিতা কাল্পনিক গল্প!

কারণ বাংলাদেশের শহরের কোলঘেঁষা বেশকিছু নদী বর্তমানে মারাত্মক দূষণের শিকার। তারমধ্যে ঢাকার অদূরে ধামরাই উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া গাজীখালী নদী আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। হাটবাজারের ময়লা-আবর্জনা, শিল্প কারখানার বর্জ্য, বসত বাড়ির আবর্জনা ইত্যাদি প্রতিনিয়ত এই গাজীখালী নদীকে বিষাক্ত বর্জ্যের বহমান আঁধারে পরিণত করে চলেছে। তার উপরে রয়েছে নদীতীরে অবৈধ স্থাপনা। এতে নদীগুলো ক্রমশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এবং বিপন্ন হতে চলেছে নদীর মাছ ও অন্যান্য জলজ সম্পদ। আর নদী তার নাব্যতা হারাচ্ছে। দেখে যেন মনে হয় নদীর বুকে বালুর চর পড়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে ধামরাই, সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকার কৃষিজমি, বিল ও জলাশয়ের উপর গড়ে উঠেছে অসংখ্য শিল্প কারখানা। এগুলোর মধ্যে হাতেগোনা দু’চারটা বাদে প্রায় সবগুলোই ইটিপি নেই। পরিশোধন না করেই পাইপের মাধ্যমে তরল বর্জ্য নদী, খাল বিল ও ডোবায় ফেলে দূষিত করছে। ইতোমধ্যে নদী ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে  এবং নদীর পানির দুর্গন্ধে চারপাশে বসবাস করা যাচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।

গাজী নদী
গাজী নদী

আরও জানা যায়, অনেকে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের দেখানোর জন্য ইটিপি প্লান্ট তৈরি করে রাখলেও তা ব্যবহার করেনা। বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্যও দুটি পাইপ রাখেন। একটি দিয়ে ইটিপি থেকে পরিশোধিত পানি ছাড়েন এবং অন্যটিতে সরাসরি ক্ষতিকর বর্জ্য মিশ্রিত পানি ছেড়ে দেন। প্রশাসন বা পরিবেশ অধিদপ্তরের কেউ দেখতে চাইলে ইটিপি প্লান্টের পাইপ চালু করেন। অন্য সময় পরিশোধন ছাড়াই ক্ষতিকর শিল্প বর্জ্য ফেলে দেন জলাশয়ে। দিনের বেলায় বেশিরভাগ কারখানা থেকে পানি ফেলা হয় না। তবে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হলেই তীব্র গন্ধযুক্ত পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। কেমিক্যাল মিশ্রিত তরল বিষাক্ত বর্জ্যে দূষিত হয়ে পড়েছে গাজীখালী নদী।

নদীর পাড়ের বাসিন্দা কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এই নদীতে আমরা গোসল করছি। গরু ঝাঁপাইছি। পানি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের কাজ করছি। আবার বর্ষায় পানি থাকছে। উন্না মাসেও পরিষ্কার থাকছে। মাছ মারছি। এখন তো নদীতে নামানই যায় না। ৫-৬ টা ফ্যাক্টরির পানি নামে। কেবিসি, আকিজ, রাইজিং ও তারাসিমা নামে। এই ফ্যাক্টরির পানি নামিয়া পানিডারে নাপাক কইরা ফালাইছে।

নদীর পাড়ের বাথুলী কবরস্থান মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রধান শিক্ষক (মুহতামিম) মাওলানা আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ছোটকালে আমরা দেখতাম এই নদীটা প্রানবন্তর ছিল। এখানে আমাদের বাপ-দাদা আরও আত্মীয়-স্বজন সবাই গোসল করত। আমাদের গবাদি পশুগোলোকে গোসল করাইতাম। বিশেষ করে আমাদের এলাকার ভিতরে রোগব্যাধী আগে ডায়রিয়া, কলেরা ছিল না। নদীর পানি এমন খারাপ হয়ে গেছে তার বাস্তব প্রমাণ আপনারা দেখতে পাচ্ছেন। মনে হয় নদীতে চর পড়ে গেছে। আসলে এগুলো সম্পূর্ণ খারাপ পানি। কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান তৈরি করে বর্জ্য ফেলতে। পানি শোষন না করে  ফেলানোর কারণে আজকে আমাদের এই নদীটা এইরকম হয়ে গেছে। পানির অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। আমরা গোসল করতে পারি না। ২৫০ জনের উপরে ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে আমরা ঠিকমত মাদ্রাসায় বসবাস করতে পারি না। মোটকথা আমাদের এলাকায় বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, কিছুদিন আগে আমাদের সরকার নদী খনন করে দিয়েছে পানি চলাচলের জন্য। যেহেতু নদী কাটছে অবশ্যই পানি ভালো করার জন্যই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন হলো আমাদের এই নদীটা যেন আগের মতো প্রাণবন্ত হয়। আমরা যেন সবাই আবার সুন্দরভাবে এই নদীতে গোসল করতে পারি। নদীতে আবার আমাদের কাজকর্ম গুলো সুন্দর মতো করতে পারি। ফ্যাক্টরির পানি গুলো নর্দমা বন্ধ করে দেয়া হোক। আমাদের জীবনকে আপনারা বাঁচান। আমরা অনেক অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি।

গাংগুটিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমজাদ মোল্লা বলেন, আমরা ছোটকালে দেখেছি এই গাজীখালী নদীটা অনেক চলমান ছিল। এখানে সারা বছর লঞ্চ, স্টিমার ও নৌকা চলছে। এলাকার সমস্ত লোক এই নদীতে গোসল করত। সকলের গরু, মহিষ এই নদীতে গোসল করাইত। সারা বছর জেলেরা মাছ ধরত। দেখতাম বড় বড় বোয়াল মাছ, চিতল মাছ, রুই মাছ সহ বিভিন্ন ধরনের মাছ পাওয়া যেত।

আজকে সেই নদী এমন এক অবস্থায় চলে গেছে এই ইন্ডাস্ট্রিয়াল বর্জের কারণে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে কে বি সি এগ্রো প্রোডাক্টস প্রাইভেট লিমিটেড। এদের যে বর্জ্য নদীতে আসে তাতে ব্যাপক পানি দূষণ হচ্ছে। এখন এই নদীতে গোসল করা তো দূরের কথা নদীর পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া যায় না। নদীর পাশে যাদের বাড়ি তারা এই নদীর দুর্গন্ধে ঘুমাইতে পারে না। এই নদী দূষণের কারণে মানুষের অসুখ-বিসুখ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতেছে। এই নদীর গন্ধের কারণে যারা এখানকার ছাত্র পোলাপান বয়স্ক লোক আছে তাদের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সমস্যা হইতেছে। ডায়রিয়া জনিত রোগ পানিবাহিত রোগ অন্যান্য বিভিন্ন রোগব্যাধি এই নদী দূষণের কারণে দেখা দিতেছে। আমরা এই নদীটার সুস্থতা ফিরে পেতে চাই। যদি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পানি এখানে দেয়া হয় সে পানিটা ইটিপি মাধ্যমে ট্রিটমেন্ট করে ছাড়া হোক। তাহলে এই নদীটা দূষণের হাত থেকে রক্ষা পাবে।

ধামরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকী বলেন, আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি, মূলত এগুলো পরিবেশ অধিদপ্তরের দেখার কথা। নদী দূষণে বেশ কিছু ইন্ডাস্ট্রির তালিকা তৈরি করছি, দ্রুত পরিবেশ অধিদপ্তরে পাঠাবো।

বিএনএ/ ওজি