Bnanews24.com
আওয়ামী লীগ কভার পজেটিভ বাংলাদেশ সম্পাদকীয়

ঝুড়ির তলা আছে!

।। মিজানুর রহমান মজুমদার।। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতার শুধু বিরোধীতাই করেনি, স্বাধীনতাকামী মানুষকে হত্যা করার জন্য যুদ্ধ বিমানবাহি ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ বঙ্গোপসাাগরে পাঠিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সন এর পাঠানো জাহাজটি ১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বরে বঙ্গোপসাগরে এসে পৌঁছায়। ততদিনে মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে যায়। বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের কুটনৈতিক তৎপরতা ও বিরোধীতার মূখে শেষ পর্যন্ত ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ ফিরে যেতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র।

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে। ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে খরা এবং ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে বড় বন্যা হয়। আবার আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সংকটও ছিল প্রকট। এর মধ্যে ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুতগতিতে বেড়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য ছিল পাট। কিন্তু সিনথেটিক পণ্যের প্রসার বাড়লে পাট রপ্তানিও ধাক্কা খায়। এসব কারণে সাহায্যনির্ভর হয়েই থাকতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কসিঞ্জার বিদেশি সাহায্য দেওয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে বলেছিলেন ‘বাংলাদেশ একটি তলাবিহীন ঝুড়ি’।

বাাংলাদেশ স্বাধীন হলেও এমন একটি দেশ, যে দেশকে যাই দেওয়া হোক না কেন, তা থাকবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরে এটি প্রমাণিত হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার সরকারকে আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে হেয় করার জন্য হেনরি কিসিঞ্জার বিদ্বেষমূলকভাবে বাংলাদেশ সর্ম্পকে বিভ্রান্তিকর ও ভুল মন্তব্য করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। তার মেধা, যোগ্যতা ও দূরদর্শীতার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে গেছেন। বাংলাদেশকে এখন আর কেউ তলাবিহীন ঝুড়ি বলে না। বাংলাদেশকে নিয়ে এখন বিদেশি গণমাধ্যমে লেখা হয়, ‘বাংলাদেশ, বাস্কেট কেস নো মোর।’ ‘বাস্কেট কেস’ শব্দ দুটি প্রথম ব্যবহার করা হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। আহত যে সৈনিকের পা কাটা গিয়েছিল, ছিল না হাত, অপরের কাঁধে ছাড়া চলার শক্তি ছিল না, তাদের বলা হতো বাস্কেট কেস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবার শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়। তারও পরে আহত সৈন্য বাদ দিয়ে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বলা শুরু হলো।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর কখনো সামরিক পোশাকে, কখনো বেসামরিক পোশাকে সামরিক লোকজন ক্ষমতাসীন হন। তারা অনেক আশার বাণী শোনায়। যত দিন গেছে পরিস্থিতি ততই খারাপ হয়েছে। একটা সময় তো প্রায় পুরো উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশই এসেছে বৈদেশিক ঋণ থেকে।

১৯৮২ সালে অধ্যাপক রেহমান সোবহান লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশ আজ চরম অনিশ্চয়তার সম্মুখীন। তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দুর্যোগের মুখোমুখি। মনে হয়, সমাজ যেন আজ ঋণের টাকায় এবং ধার করা সময়ের ওপর বেঁচে আছে।’

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ ২১ বছর ক্ষমতাসীন হলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রপতি ক্লিনটনের অনুরোধে ভারতকে গ্যাস দিতে অস্বীকার করায় ২০০১ সালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে কৌশলে হারিয়ে দেয় আর্ন্তজাতিক চক্রটি। কিন্তু ২০০৮ সালে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগ সব ষড়যন্ত্রের শিকড় উপড়ে ফেলে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষসতাসীন হন। তখন থেকে বাংলাদেশ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যায়, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। নিজস্ব অর্থে পদ্মার ওপর ৬ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করার সাহস দেখিয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে যাওয়ার পর বিশাল এ প্রকল্প হাতে নেয়ার ঘটনায় অনেক দেশ ও সংস্থার সন্দেহ ও বিস্ময় প্রকাশ করলেও সে স্বপ্ন এখন দৃশ্যমান। এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করছে বাংলাদেশ। এখন বিশ্বের ৩১টি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট স্থাপন, মাতারবাড়ি কোল পাওয়ার, পায়রা বিদ্যুত প্রকল্প, সোনাদিয়া সমুদ্র বন্দর, এলএনজি টর্মিনাল, কর্ণফুলী নদীতে বঙ্গবন্ধু টানেল, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বঙ্গবন্ধু ইকোনিমিক পার্ক, দোহাজারি-রামু-ঘুমধুম রেল, চট্টগ্রাম বন্দরের বে-টার্মিনালসহ বিভিন্ন মেঘা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে।

দেশের মানুষের জীবন মান উন্নয়য়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার কাজ করে যাচ্ছে। যে দেশটিতে খাদ্য অভাবে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল সে দেশটি এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। শুধু তাই নয়- খাদ্য রপ্তানিও করছে। পোশাক রপ্তানির পাশাপশি ১৪৫টি দেশে পাঠাচ্ছে ঔষধ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রযুক্তিকে পৌঁছে দিয়েছে জনগনের হাতের মুঠোয়। বাস্তবায়ন করেছে ডিজিটাল বাংলাদেশ। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, বেকারদের কর্মসংস্থান, স্বাবলম্বী, উদ্যমী যুব সমাজ গঠন, শিল্প ও বাণিজ্যের উন্নয়ন, উপজাতি ও অবহেলিত মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, সবার জন্য যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা, বিনামূল্যে বই ও করোনা ভ্যাকসিন প্রদান। পরিবেশ সুরক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, ধর্মীয় সম্প্রতি ও সংস্কৃতির উন্নয়ন, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌছানোসহ বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করেছে। দেশের ৯৮ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানি পান করে। ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ পয়ঃ নিস্কাশন ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। স্বাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৪ শতাংশ,মাথা পিছু আয় ২০৬৪ ডলার, বৈদেশিক মুদ্রা ৪৪ বিলিয়ন ডলারের মাইল ফলক অর্জন করেছে। এসব কারণে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ুও বেড়েছে। বাংলাদেশ এখন সাহায্যনির্ভর দেশ নয়। পরিণত হয়েছে বাণিজ্যনির্ভর দেশে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ এখন অনেক দেশের জন্য উদাহরণ।

অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বারবার বলেন, অনেক সামাজিক সূচকে ভারতের চেয়েও এগিয়ে থাকার কথা। দেশটির অর্থনীতি অনেক সংহত। এই বাংলাদেশে এখন গড়ে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ৬ শতাংশের বেশি।

সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ করেছে জাতিসংঘ। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি বা ইউএন-সিডিপির ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা সভায় তিনটি সূচকের ভিত্তিতে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের বিষয়টি পর্যালোচনা করে। তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ শর্ত পূরণ করে অনেক এগিয়ে গেছে। ক) মানবসম্পদ সূচকে উন্নয়নশীল দেশ হতে ৬৬ পয়েন্টের প্রয়োজন; বাংলাদেশের পয়েন্ট এখন ৭৫.৩। খ) দেশের মাথাপিছু আয় হতে হয় কমপক্ষে ১২৩০ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশ ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১৮২৭ ডলার। গ)অর্থনৈতিক সূচকে কোনো দেশের পয়েন্ট ৩৬ এর বেশি হলে সেই দেশকে এলডিসিভুক্ত রাখা হয়, ৩২ এ আসার পর উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতা অর্জন হয়। সেখানে বাংলাদেশের পয়েন্ট এখন ২৫ দশমিক ২। প্রসঙ্গত, ১৯৭৫ সাল থেকে স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে থাকা বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে সিডিপির সব শর্ত পূরণ করে ২০১৮ সালে।

জাতিসংঘের নিয়মানুযায়ী, কোন দেশ পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় উত্তরণের মানদন্ড পূরণে সক্ষম হলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ পায়। সিডিপির প্রবিধান অনুযায়ী, উত্তরণের সুপারিশ পাওয়ার পর একটি দেশ তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত প্রস্তুতিকালীন সময় ভোগ করতে পারে। পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল শেষে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে আনুষ্ঠানিক উত্তরণ ঘটবে। উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠলে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া এবং বিভিন্ন রপ্তানি সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। তবে প্রস্তুতির এই সময়ে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে প্রাপ্ত সব সুযোগসুবিধা ভোগ করতে পারবে।

তাছাড়া বর্তমান নিয়মে ইউরোপিয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশ ২০২৬ সালের পর আরও তিন বছর অর্থাৎ ২০২৯ সাল পর্যন্ত শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মানুষের জীবনমান, শিল্প ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মকান্ড অব্যাহত থাকলে ২০৩৬ থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে। সেই সঙ্গে বাস্তবায়ন হবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ‘সোনার বাংলা’।