Bnanews24.com
এক নজরে টপ নিউজ বিশেষ সংবাদ সব খবর

বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন

বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন

।। ওসমান গনী।।

বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সংগ্রামী জনতার পুরোভাগে। বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতিসত্তা, স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য আজীবন লড়াই করেছেন।

বস্তুত জেল-জুলুম ও নিপীড়ন বঙ্গবন্ধুর জীবনে এক নিয়মিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছিল। জনগণের জন্য, দেশের জন্য তিনি প্রায় এক যুগ কারান্তরালে বন্দি জীবন-যাপন করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর কারাপঞ্জি

বছর সময়কাল

১৯৩৮ ৭ দিন

১৯৪৮ ৪ মাস

১৯৪৯ ৯ মাস

১৯৫০ ১ বছর

১৯৫১ ১ বছর

১৯৫২ ২ মাস

১৯৫৪ ৮ মাস

১৯৫৮ ৩ মাস

১৯৫৯ ১ বছর

১৯৬০ ১ বছর (কার্যত গৃহবন্দি; রাজনীতি নিষিদ্ধ)

১৯৬১ ১ বছর (কার্যত গৃহবন্দি; রাজনীতি নিষিদ্ধ)

১৯৬২ ৬ মাস

১৯৬৪ ১০ মাস

১৯৬৫ ১ বছর

১৯৬৬ ১১ মাস

১৯৬৭ ১ বছর

১৯৬৮ ১ বছর

১৯৬৯ ২ মাস

১৯৭১ ১০ মাস

১৯৭২ ৮ দিন

৫৪ বছরের জীবনে বঙ্গবন্ধু ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে ছিলেন, যা তার মোট জীবনের এক-চতুর্থাংশ। বঙ্গবন্ধু স্কুলের ছাত্রাবস্থায় ১৯৩৮ সালে সর্বপ্রথম কারাগারে যান। ওই সময় তিনি সাত দিন কারাভোগ করেন। এরপর বঙ্গবন্ধু ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত ৫ দিন কারাগারে ছিলেন। একই বছর ১১ সেপ্টেম্বর কারাগারে গিয়ে মুক্তি পান ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি।

এ দফায় তিনি ১৩২ দিন কারাভোগ করেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল আবারও কারাগারে গিয়ে ৮০ দিন পর মুক্তি পান ওই বছরের ২৮ জুন। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি আবারও ২৭ দিন কারাভোগ করেন। ১৯৪৯ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৩ দিন বঙ্গবন্ধু কারাভোগ করেন। ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি টানা ৭৮৭ দিন বঙ্গবন্ধু কারাগারে ছিলেন।

ট্রাজেডি হল, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পরও বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে যেতে হয়েছিল এবং এ দফায় বঙ্গবন্ধু ২০৬ দিন কারাভোগ করেছিলেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের মার্শাল ল’ জারির পর বঙ্গবন্ধু ১১ অক্টোবর গ্রেফতার হন। এসময়ই বঙ্গবন্ধুকে একটানা সবচেয়ে বেশি সময়- এক হাজার ১৫৩ দিন অর্থাৎ ৩ বছরের বেশি সময় কারাগারে কাটাতে হয়। ১৯৬২ সালের ৬ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পুনরায় গ্রেফতার হয়ে একই বছরের ১৮ জুন মুক্তি পান। এ দফায় তিনি কারাভোগ করেন ১৫৮ দিন।

এরপর ১৯৬৪ ও ১৯৬৫ সালে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন মেয়াদে ৬৬৫ দিন কারাগারে ছিলেন। বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে বিবেচিত ছয় দফা দেয়ার পর বঙ্গবন্ধু এর পক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ করতে গিয়ে কয়েক দফায় গ্রেফতার হন ও কারাভোগ করেন। এরপর ১৯৬৬ সালে ৮ মে আবারও গ্রেফতার হয়ে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান বঙ্গবন্ধু।

এসময় তিনি এক হাজার ২১ দিন কারাগারে ছিলেন। কারামুক্তির পর ছাত্র-গণসংবর্ধনায় তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয়া হয়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার পরপরই পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে।

১৯৭১ সালে সাড়ে নয় মাস পশ্চিম পাকিস্তানের লায়ালপুরের মিয়ানওয়ালী কারাগারে বন্দি থাকেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; মুক্তিলাভ করেন ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি।

কেমন ছিল তার জেলজীবন? বঙ্গবন্ধু জানাচ্ছেন- ‘জেলে যারা যায় নাই, জেল যারা খাটে নাই- তারা জানে না জেল কি জিনিস।

বাইরে থেকে মানুষের যে ধারণা জেল সমন্ধে ভিতরে তার একদম উল্টা। জনসাধারণ মনে করে চারদিকে দেওয়াল দিয়ে ঘেরা, ভিতরে সমস্ত কয়েদি একসাথে থাকে, তাহা নয়। জেলের ভিতর অনেক ছোট ছোট জেল আছে’ (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা ২৭)।

কারাগারে নির্মম অত্যাচারের কথা, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার বঙ্গবন্ধুর লেখায় উঠে এসেছে এভাবে- ‘রাজবন্দি হিসেবে জেল খেটেছি, সশ্রম কারাদণ্ডও ভোগ করতে হয়েছে। আবার হাজতি হিসেবেও জেল খাটতে হয়েছে। তাই সকল রকম কয়েদির অবস্থা নিজের জীবন দিয়ে বুঝতে পেরেছি’ (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা ২৭)।

জন্মের পর থেকেই শিশু রাসেল দেখে আসছে, তার বাবা বাসায় থাকেন না; থাকেন কারাগারে। অবুঝ শিশুমনে তাই ধারণা হয়েছিল- কারাগারটাই বুঝি তার ‘আব্বার বাড়ি’। ১৯৬৬ সালের ১৫ জুন। রাসেল গেছে বাবাকে দেখতে। বঙ্গবন্ধু বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- ১৮ মাসের রাসেল জেল অফিসে এসে একটুও হাসে না, যে পর্যন্ত আমাকে না দেখে। দেখলাম দূর থেকে পূর্বের মতোই ‘আব্বা আব্বা’ বলে চিৎকার করছে। জেল গেট দিয়ে একটা মাল বোঝাই ট্রাক ঢুকছিল।

আমি তাই জানালায় দাঁড়াইয়া ওকে আদর করলাম। একটু পরেই ভিতরে যেতেই রাসেল আমার গলা ধরে হেসে দিল। ওরা বলল, আমি না আসা পর্যন্ত শুধু জানালার দিকে চেয়ে থাকে, বলে ‘আব্বার বাড়ি’। এখন ওর ধারণা হয়েছে এটা ওর আব্বার বাড়ি। বঙ্গবন্ধু আরও লিখেছেন- ৮ ফেব্রুয়ারি ২ বৎসরের ছেলেটা এসে বলে, ‘আব্বা বালি চলো’। কি উত্তর ওকে আমি দেব।

আরেক জায়গায় লিখেছেন- জেলে রাতটাই বেশি কষ্টের। আবার যারা আমার মতো একাকী নির্জন স্থানে থাকতে বাধ্য হয় যাকে ইংরেজিতে বলে সলিটারি কনফাইয়েনমেন্ট তাদের অবস্থা কল্পনা করা যায় না।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক বন্দিকে থাকতে না দেয়ায় ঈদের দিনও তাকে একা থাকতে হতো। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- একাকী কি ঈদ উদযাপন করা যায়? তারপরও যতটা সম্ভব ঈদের দিন বঙ্গবন্ধু অন্য বন্দিদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেন।

বঙ্গবন্ধুর জবানীতে তারই একটি চিত্র হচ্ছে এরকম- নামাজ পড়ার পর শত শত কয়েদি আমাকে ঘিরে ফেলল। সকলের সাথে হাত মিলাতে আমার প্রায় আধাঘণ্টা সময় লেগেছিল। বঙ্গবন্ধু জানতেন, জীবনের আরও অনেক ঈদ হয়তো জেলে কাটাতে হবে। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- আগামী ১৩ জানুয়ারি ঈদের নামাজ। ছেলেমেয়েরা জামা-কাপড় নেবে না। ঈদ করবে না, কারণ আমি জেলে। অন্য এক জায়গায় তিনি লিখেছেন- আজ কোরবানির ঈদ।

গত ঈদেও জেলে ছিলাম। এবারও জেলে। বন্দি জীবনে ঈদ উদযাপন করা একটি মর্মান্তিক ঘটনা বলা চলে। ঈদের দিন পাকিস্তানের জেলে কাটানোর স্মৃতিচারণ করেছেন বঙ্গবন্ধুর এভাবে- আমার প্রিয় জনগণ কীভাবে তাদের ঈদ উৎসব পালন করছে? এই প্রশ্ন আমি করলাম, জানি না কাকে! সেই দিন, আবার কখনো তাদের দেখা পাবো কিনা সেটা না জেনেই, আমি মোনাজাত করে আমার জনগণের মঙ্গল ও নিরাপত্তা দয়াময় আল্লাহতা’লার হাতে সমর্পণ করলাম। এটাই ছিল আমার ঈদ।

১০ জানুয়ারি, ১৯৭২। বেলা ১টা ৪১ মিনিটে জাতির অবিসংবাদিত নেতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার স্বপ্নের মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে বিজয়ীর বেশে এলেন ইতিহাসের মহানায়ক, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিকাল ৫টায় তিনি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান, বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে ভাষণ দেন।

সশ্রদ্ধচিত্তে তিনি সবার ত্যাগের কথা স্মরণ করেন, সবাইকে দেশ গড়ার কাজে উদ্বুদ্ধ করেন। রাজনীতির ধ্র“পদী কবি বলেন- যে মাটিকে আমি এত ভালোবাসি, যে মানুষকে আমি এত ভালোবাসি, যে জাতিকে আমি এত ভালোবাসি; আমি জানতাম না, সে বাংলায় আমি যেতে পারব কিনা। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।

স্বাধীন দেশে ফেরার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। তিনি এজন্য সবুজবিপ্লবের ডাক দিলেন। দেশের মানুষের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, কৃষির উন্নয়নে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে লাগলেন।

তিনি জানতেন, এ দেশের সব সম্পদ হারিয়ে গেছে। পাকিস্তানি বিত্তবানরা সব ধন-সম্পদ লুট করে নিয়ে গেছে। আমাদের রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার, মসজিদ-মন্দির, শিল্প-কারখানা তারা ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। যুদ্ধের তাণ্ডবে আমাদের দেশের শ্রমিক-মুজুর, কৃষক-জেলে, তাঁতী-ধোপা সবাই সর্বস্বান্ত। দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ শোষকের শোষণে নিঃস্ব।

বিএনএ/