Bnanews24.com
Home » রেলওয়ের গলার কাঁটা কোরিয়ার ১০ ইঞ্জিন
টপ নিউজ ঢাকা বিভাগ সব খবর

রেলওয়ের গলার কাঁটা কোরিয়ার ১০ ইঞ্জিন

বিএনএ, ঢাকা : রেলওয়ের যাত্রী সেবার মান বাড়াতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়ণে ১০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) কিনেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। তবে ইঞ্জিনগুলোয় দরপত্রের শর্তানুসারে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সংযোজন করা হয়নি। নিম্নমানের যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এসব ইঞ্জিন।

প্রকল্পের পরিচালক মো.নূর আহমেদ হোসাইন বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানি করা এসব ইঞ্জিন দেশটির কোম্পানি ফেরত নেয়ার দরজা খোলা নেই। তিনি জানান, অর্থ ছাড় নেয়ার জন্য এডিবি বার বার চাপ দিচ্ছেন। রেলপথ মন্ত্রণালয় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থ গ্রহন না করায় বিপাকে আছে ঋণ দাতা প্রতিষ্ঠান।

এদিকে বাংলাদেশ সরকারের ক্রয়মূল্যের শতকরা ২৫ ভাগ অর্থ নিয়ে ওই দশটি ইঞ্জিন তৈরী করতে বাঁকি টাকা ইনভেস্ট করেছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান হুন্দাই রোটেম প্রিশিপমেন্ট ইন্সপেকশন কোম্পানি সিসিআইসি। তারাও চুক্তির বাঁকি ৬৫ শতাংশ টাকা হাতে নিতে জোড় তদ্ববির চালাচ্ছেন। ঠিকাদার প্রতিষ্টান টাকা না পাওয়ায় রয়েছে বিপদে। অপরদিকে ক্রয় করা ১০টি ইঞ্জিনের কোন কূলকিনারা করতে পারছে না রেলপথ মন্ত্রণালয়। এই দশটি ইঞ্জিন এখন উভয়ের গলার কাঁটা হয়ে দাড়িয়েছে । লোকো মোটিভগুলো নিয়ে দাতা গ্রহীতা উভয়েরই রয়েছেন বিপাকের মধ্যে।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, যে দশটি লোকোমোটিভ ক্রয় করা হয়েছে তার ইঞ্জিন নাম্বার-৩০০১ থেকে ৩০১০ পর্যন্ত। লোকোমোটিভগুলোর গুণগত মান খারাপ হলেও তা আর ফেরত দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে একটি ইঞ্জিন লাইটিং ট্রায়ালের জন্য পাহাড়তলী ওয়ার্কশপ থেকে লাইনে নেয়া হয়েছে। পিডি বলেন, চুক্তির ক্রয়াদেশের সাথে ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশের মিল নেই। মন্ত্রণালয় চেয়েছে লেটেস্ট মডেল তারা সরবরাহ করেছে ওল্ড মডেল। যা চুক্তি ভঙ্গের বা প্রতারণার সামিল। করোনাকে পুঁজি করেই প্রতারণার ফাঁদ পেতেছিল সরবরাহকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এখন তারাই ওই গ্যাঁরাকলে পড়ে গেছে।

নূর আহমেদ বলেন, চুক্তি অনুসারে ২৫ শতাংশ অর্থ প্রদান করা হয়েছে। বাঁকি ৬৫ শতাংশ টাকা জাহাজে উঠানোর সময় দেওয়ার কথাছিল। কিন্তু তা এখনও প্রদান করা হয়নি। তারা বারবার টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে। নিন্মমানের যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি করা এসব ইঞ্জিন দেওয়ার ঘটনা তদন্তে রেল কর্তৃপক্ষ ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বলে জানান পিডি। কমিটির আহবায়ক রেলপথ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব মো. ফারুকী, অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. মঞ্জুর উল-আলম চৌধুরী এবং বুয়েটের একজন সদস্য আছেন। কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম কোম্পানি গত ৩১ আগস্টে ইঞ্জিনগুলো সরবরাহ করেছে বাংলাদেশকে। রেলপথ মন্ত্রণালয় ইঞ্জিন গ্রহনের পর হুন্দাই রোটেমের সঙ্গে প্রিশিপমেন্ট ইন্সপেকশন কোম্পানি সিসিআইসির অর্থ প্রদানের জন্য প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে আসছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। তাঁদের প্রতারণার সঙ্গে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইঞ্জিনগুলোর গুণগত মান খারাপ হলেও তা ফেরত না দিয়ে গ্রহণ করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। আর এ সুযোগে নিম্নমানের ইঞ্জিন সরবরাহ করেও চুক্তিমূল্যের ৬৫ শতাংশ ছাড় করিয়ে নিতে নানা ধরনের তদ্ববির করছে হুন্দাই রোটেম। এদিকে রেলওয়ের নাম না প্রকাশ্য অনিচ্ছুক আরেক কর্মকর্তা জানান,আগামীতে দেশের যাত্রী সেবার জন্য মিটারগেজ ইঞ্জিন ক্রয় করার প্রয়োজন হবে না।

এই দশটি লোকো মোটিভ ক্রয়াদেশের কথা উল্লেখ করে রেলের এই কর্মকর্তা বলেন, চুক্তি হয়েছিল ৩২ হর্সের ইঞ্জিন তৈরী করে দেওয়ার । ঠিকাদার প্রতিষ্টান দিয়েছে ২২ হর্সের। যা ভবিষ্যতে মিটারগেজ ইঞ্জিনকে ব্রডগেজে রূপান্তর করা যাবে না। এবং এই ইঞ্জিনের গতিবেগ ক্রমশয় কমেই যাবে।

এসব লোকোমোটিভ কেনায় কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম কোম্পানির সঙ্গে ২০১৮ সালের ১৭ মে চুক্তি করে রেলওয়ে। এ চুক্তিমূল্য ছিল তিন কোটি ৭৯ লাখ ৬৩ হাজার ৪০০ ডলার। ইঞ্জিনগুলো প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) করার জন্য সিসিআইসির সঙ্গে চুক্তি করে রেলওয়ে। ইঞ্জিনগুলো জাহাজীকরণের আগে টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে মর্মে পিএসআই সার্টিফিকেট প্রদান করার কথা এই কোম্পানির। যদিও সিসিআইসি কখনোই রেলওয়েকে অবহিত করেনি যে, চুক্তির স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ইঞ্জিনগুলো তৈরি করা হচ্ছেনা। বরং ইঞ্জিনগুলোতে নিম্নমানের ক্যাপিটাল কম্পোনেন্ট সংযোজন করার বিষয়টি তারা বরাবরই গোপন করে গেছে। এছাড়া রেলওয়ের একাধিক টিম হুন্দাই রোটেমের কারখানা পরিদর্শনে যাওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু সিসিআইসি ইঞ্জিনগুলো ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে কখনোই রেলওয়ের টিমকে পরিদর্শনে নিয়ে যায়নি। সর্বশেষ যখন হুন্দাই রোটেম তাদের কারখানা পরিদর্শনের জন্য রেলওয়ের কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানায় তখন কোভিড-১৯ কোরিয়ায় ব্যাপকভাবে সংক্রমিত হয়ে পড়ে। তাই ইঞ্জিনের গুণগত মান নিশ্চিতে রেলওয়েকে সিসিআইসির ওপর নির্ভর করতে হয়। এ সুযোগে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ দিয়ে ইঞ্জিনগুলো তৈরি করে হুন্দাই রোটেম। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিন জাহাজীকরণের আগে পিএসআই সার্টিফিকেট ইস্যু না করা ও পরবর্তীতে একই তারিখে দুই ধরনের সার্টিফিকেট ইস্যু করার কারণে ওই সার্টিফিকেটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রকল্প পরিচালকের সন্দেহ হয়।

সে কারণে মালামালগুলো জাহাজ থেকে না নামিয়ে পুনরায় ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার ব্যাপারে মতদেন পিডি। কিন্তু লোকোমোটিভ সরবরাহকারি পিএসআই কোম্পানি বা অন্য কোন উৎস থেকে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জেনে প্রকল্প পরিচালককে ডেকে নিয়ে মালামালগুলো খালাস করার জন্য মৌখিক নির্দেশ দেন।

প্রকল্প পরিচালকের তরফ থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বুঝানোর চেষ্টা করা হয় যে, মালামাল খালাস করার সাথে সাথে ইঞ্জিনগুলো সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠান হুন্দাই রোটেম এলসির শর্তমতে ৬৫ শতাংশ চুক্তিমূল্য পরিশোধের শর্ত তুলবে। আর তা করা হলে অগ্রিম প্রদান ২৫ শতাংশসহ মোট ৯০ শতাংশ মূল্য পরিশোধ হয়ে যাবে। এতে ইঞ্জিনের ত্রুটি বিচ্যুতি পাওয়া গেলেও তা সংশোধনের কোন উপায় থাকবে না। এমন জটিলতা নিরসনে পরবর্তীতে রেলপথমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ইঞ্জিনগুলো জাহাজ থেকে খালাস করে পাহাড়তলী ওয়ার্কশপে নেয়া হয়। লোকোমোটিভগুলো বাংলাদেশে লোকোমোটিভগুলো বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর সিসিআইসি প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর জানায় যে, সংযোজিত অলটারনেটরটি টিএ-৯ মডেলের, যা চুক্তির শর্তের সঙ্গে মিল নাই। উক্ত ত্রুটিসমূহ সমাধান করার জন্য ইঞ্জিন সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠানকে বারবার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু হুন্দাই রোটেম এসব ত্রুটি দূর না করে বিভিন্ন অপকৌশলে ৬৫ শতাংশ বিল তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছে। চুক্তিপত্র বর্হিভূতি তিনটি ক্যাপিটাল কম্পোনেটের ভিন্নতা আছে। এর মধ্যে অলটারনেটর, ট্র্যাকশন মটর সম্পূর্ণ ভিন্নতর।

এছাড়া চুক্তিপত্র অনুযায়ী ইঞ্জিনগুলো কমিশনের জন্য সব ধরনের মেশিনারিজ, পার্টস, টুলস হুন্দাই রোটেমের সরবরাহ করার কথা। কিন্তু হুন্দাই রোটেম লোডব· টেস্ট পান্ট সরবরাহ করেনি এবং ক্যাপিটাল কম্পোনেন্ট ভিন্নতর হওয়ায় পাহাড়তলী ওয়ার্কশপে সেই টেস্টটি করা হয়নি। যদিও ১০টি মিটারগেজ ইঞ্জিনের কমিশনিং কাজ সম্প্রতি শেষ হয়েছে। এতে কমিশনিং কমিটি ভিন্ন মডেলের অলটারনেটর সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বিএনএনিউজ/আজিজুল/জেবি