মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-১৫ (রূহানী ডাক্তার)

।।ইয়াসীন হীরা।। 

আরো পড়ুন

নাফ নদী থেকে শুরু, নাফ নদীতে শেষ ১৯৬ জন-পর্ব-১৬

প্রদীপ একাই ১৬১ জন! পর্ব-১৫

মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ’র সভাপতি ও মহাসচিব অধ্যাপক ফোরকান মিয়া কাগতিয়া হুজুর নামে খ্যাত শায়খ তফজ্জল আহমদকে উপলক্ষ করে ভণ্ডামির যে সব কেরামতি প্রকাশ করেছেন তার নতুন মাত্রা হচ্ছে ‍‌”রূহানী ডাক্তার”। কথিত গাউছুল আজম (তফজ্জল আহমদ) রূহানী ডাক্তার সেজে হাসপাতাল-ক্লিনিকে উপস্থিত হন। অসুস্থ মুরিদ (অনুসারি)বা তাদের স্বজনকে কঠিন রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্ত করেছেন এমন দাবি মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ’র। এ বিষয়ে বিভিন্ন এশায়েত সম্মেলনে এবং সংগঠনটির প্রকাশিত প্রকাশনায় অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। এ ধরণের তথ্য-প্রমাণাদি বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ)’র অনুসন্ধানী টিমের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

কেস স্টাডি.

‌‘আল হাবীবু মা ‘আল হাবীবে ফিল হিসরা’ স্মরণিকায় ১২৩ পৃষ্টায় ‍“রূহানীভাবে হাজির হওয়ার বাস্তব প্রমাণ” শিরোনামে একটি বর্ণনা রয়েছে। শাহেলা আকতার, (তাহেরাবাদ আবাসিক এলাকা, আতুরার ডিপো, পাঁচলাইশ, চট্টগ্রাম)বরাত দিয়ে লেখা হয়েছে, ২০১২ সালের ১২ অক্টোবর চট্টগ্রামের সার্জিস্কোপ হাসপাতাল ইউনিট-২ এ মুমুর্ষু অবস্থায় তার মা’কে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তার মাকে লাইফ সাপোর্ট দেয়া হয়।

শাহেলা আকতার কাগতিয়া দরবারের ত্বরিকত এর কাজ করতেন না। তার মা, দু’ভাই হাফেজ শাহাদাত হোসেন ও সাজ্জাদ হোসেন কাজ করতেন। শাহেলা মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করলেন যে, “তার মা যদি আল্লাহর রহমতে সুস্থ হয়ে যায় তা হলে তিনিও গাউছুল আজমের দরবার শরীফের কাজ করবেন। ১৮ অক্টোবর (২০১২) শাহেলা আক্তার এশার নামাজের পর তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় দেখতে পাচ্ছেন গাউছুল আজম (শায়খ তফজ্জল আহমদ) সার্জিস্কোপ হাসপাতাল ইউনিট-২ এ রূহানীভাবে উপস্থিত হয়ে তার মাকে তাওয়াজ্জুহ্ দিচ্ছেন। এরপর শাহেলার মা সুস্থ হয়ে যায়!

কেস স্টাডি.

‘আল হাবীবু মা ‘আল হাবীবে ফিল হিসরা’ স্মরণিকার ১২৭ পৃষ্টায় শিরোনাম করা হয় ‌“তাঁর দোয়ায় জটিল রোগ থেকে আরোগ্য’’।সাল  তারিখ উল্লেখ না করে লেখা হয়, “চট্টগ্রামের হাটহাজারি উপজেলার বাঘঘোনা নুর আহমদ বাড়ির নিলুফার ইয়াছমিন, (স্বামী শফিউল আলম) পেটে ব্যথা অনুভব করেন। চট্টগ্রামের এক অভিজ্ঞ গাইনি স্পেশালিষ্ট এর শরণাপন্ন হলে তিনি এক্স-রে করার পরার্মশ দেন। এক্স-রে করলে দেখা যায় জরায়ু মুখে তিনটি টিউমার হয়েছে। নিশ্চিত হতে আরো কয়েকটি ল্যাবে চারবার এক্স-রে করা হয়। ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত দেয় অপারেশন করতে হবে। অপারেশনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এ জন্য তার স্বামী বাহারাইন থেকে দেশে আসে। তার স্বামী আবারও পরীক্ষা করার জন্য ল্যাবে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ল্যাবে যাওয়ার  আগে নিলুফার ইয়াছমিন কাগতিয়া মাদ্রাসার দানবাক্সে একশত টাকা ও একটি ছাগল দেয়ার নিয়ত করেন। আল্লাহ কী মহিমা! এক্স-রে করে ডাক্তারকে দেখা তিনি (ডাক্তার) অবাক হয়ে বলেন, আপনি কি অন্য কোন ডাক্তরের কাছে চিকিৎসা করেছেন? এখন তো আপনার জরায়ুতে কোন টিউমার দেখা যাচ্ছে না। পরে বিনা অপারেশনে নিলুফার ইয়াছমিনকে রিলিজ করে দেন।

উল্লেখিত ঘটনাটিকে মুনিরীয়া যুবতবলীগ কমিটি, বাংলাদেশে’র প্রকাশনায় ‘আল হাবীবু মা ‘আল হাবীবে ফিল হিসরা’ স্মরণিকা ‘গাউছুল আজমের কুবলিয়্যাতের এক মহা নির্দশন’ বলে অবহিত করা হয়।

বিভিন্ন এশায়েত সম্মেলনে মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ’র সভাপতি ও মহাসচিব অধ্যাপক ফোরকান মিয়া যোগসাজসে বিভিন্ন এশায়েত সম্মেলনে “রূহানি ডাক্তার” হিসাবে অসুস্থ মুরিদ ও তাদের স্বজনদের সুস্থ করার বর্ণনা দেয়া হয়। এ সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ)’র নিকট বেশ কিছু ভিডিও রয়েছে। এর একটি ২০০৯ সালে বায়েজিদ বোস্তামি (রা:)গাউছুল আজম কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত গাউছুল আজম কনফারেন্স। ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, কাগতিয়ার দরবারকে দারুস শেফা এবং মুনিরীয়া অনুসরারীদের পীরকে রূহানী ডাক্তার হিসাবে উল্লেখ করেন মাওলানা সেকান্দর আলী।

কেস স্টাডি.

আল হাবীবু মা’আল হাবীবে ফিল হিসরা’র ১৩৩-১৩৪ নম্বর পৃষ্টায়  উল্লেখ করা হয়, “চট্টগ্রামের রাউজান থানার মুন্সিরঘাটা এলাকার ছৈয়দ আলী মুন্সী বাড়ির মুহাম্মদ আবু জাফর, পিতা: এস.এম জাকারিয়া ঠিকানা উল্লেখ করা হয়। তার বরাত দিয়ে বর্ণনা করা হয়, চন্দ্রঘোনা খ্রিষ্টান হাসপাতালে  ১৯৯২ সালের ১৮ ডিসেম্বর তার টিউমার (বাম পায়ের উপরিভাগে কোমরের নিচে) অপারেশন হয়। অপারেশনে সাফল্য আসেনি। অপারেশনের স্থানে পচন ধরে, অনবরত পুঁজ বের হতে থাকে। এ অবস্থায়  দ্বিতীয়বার অপারেশনের প্রয়োজন দেখা দেয়। ডাক্তারা জানান, দ্বিতীয় দফা অপারেশনে সাফল্য না আসলে পা কেটে ফেলে দিতে হবে। এ কথা শুনে জাফর ভড়কে গেলেন। আল্লাহকে ডাকতে লাগলেন। ২৬ ডিসেম্বর (১৯৯২) বেলা ১১টার দিকে  দ্বিতীয় দফা অপারেশন করার জন্য অপারেশন থিয়েটারে ঢুকানো হয়।

হঠাৎ জাফর কাগতিয়ার তার গাউছুল আজমকে স্মরণ করলেন। আর মনে মনে ভাবতে লাগলেন,  তিনি (মুনিরীয়াদের পীর) প্রতিটি রূহানী সন্তানকে বিপদের সময় রক্ষা করেন। তার এ বিপদের সময় গাউছুল আজমের নজর আছে কিনা জানি না। এ কথা মনে আনার সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল অপারেশন থিয়েটারের দরজায় কাগতিয়ার গাউছুল আজম (শায়খ তফজ্জল আহমদ) দাঁড়িয়ে আছেন! মুখে মুচকি মুচকি হাসি। ডান হাত তুলে ইশারা করে বললেন ভয় করো না। ইনশাআল্লাহ ভাল হয়ে যাবে। এরপর চোখের পলকেই কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন।

ভণ্ডামির মাধ্যমে প্রকাশ করা এ কেরামত বর্ণনায় আরো লেখা হয়, “অল্পক্ষণ পরেই অপারেশন করার জন্য আগের ব্যান্ডেজ খুলতেই দেখতে পেলেন রক্ত ঝড়া ও পুঁচ পড়া জায়গাটা একেবারেই শুকনা। সেখানে কোন রক্ত বা পুঁজ নেই। অথচ ওই জায়গায় ১০ মিনিট আগেও পুঁজে ভেজা ছিল”!

এ ঘটনা দেখে ডাক্তার, নার্সরা হতবাক হয়ে পড়েন। এরপর ইনজেকশন মারেন, কোন পুঁজ মাংসের ভিতরে আছে কিনা জানার জন্য। কোন কিছুর হদিস না পয়ে তাকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিয়ে দেন”।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিভিন্ন এশায়েত সম্মেলনসহ বিভিন্ন মাহফিলে মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ’র সভাপতি মুনিরউল্লাহ ও অধ্যাপক ফোরকান মিয়া উল্লেখিত কেরামত লিখে দিতেন। যা পরে বয়ান করা হতো মাহফিলে।  শুধু তাই নয় ওই বক্তব্য ইউটিউবে সংযুক্ত করা হতো। যাতে এসব কেরামত শুনে সাধারণ লোকজন আকৃষ্ট হয় এবং মুনিরীয়া যুব তবলীগে যোগদান করেন। আর কেরামতে যাদের নাম ব্যবহার করা হয় তারা মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশের  সদস্য ও মুরিদ। কেউ জানতে চাইলে তারা ঘটনা সত্য বলে জবাব দেন। যদিও কাউকে মাহফিলে  সশরীরে উপস্থিত করা হয়নি। এতে একটি বিষয় উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে কাগতিয়ার দরবারে এসে মুরিদ হলেই অসুস্থ মানুষ সুস্থ হয়ে যায়! তাদের ডাক্তার প্রয়োজন হয় না!

নোট: (ভণ্ডামির বানোয়াট, অলৌকিক কেরামত বয়ানকারিদের কয়েকজন মাওলানা সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে কাগতিয়া দরবার ও মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ থেকে পদত্যাগ করেছেন। এছাড়া অনেকে ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি’ (বিএনএ) অনুসন্ধানী টিমের কাছে তাদের বক্তব্য দিয়েছেন।এ সব তথ্য প্রমাণ টীমের নিকট সংরক্ষিত রয়েছে।)

চলবে

আরো পড়ুন :

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-১৪( দুর্ঘটনায় রক্ষা )

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-১৩(মৃত্যুকালে কলেমা পড়ান)

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-১২(সুনামি তত্ত্ব ! )

মুনিরীয়ার ভণ্ডামী-১১ ( ঝুলন্ত কোরআন )

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-১০ ( রাসুল (স:) সঙ্গে দৈনিক সাক্ষাৎ!

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৯ (তাজে গাউছিয়্যত )

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৮(খেলাফতের স্বাক্ষী যারা)

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৭(ভ্রান্ত যত মতবাদ)

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৬

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৫

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৪
মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৩
মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-২
মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-১