Bnanews24.com
কভার বিশেষ সংবাদ সব খবর

সিইউএফএল-এর ভূমি দখলে উপজেলা প্রশাসন, সিবিএ নেতা ও প্রভাবশালীরা! – পর্ব-২

চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)

বিএনএ. ঢাকা, বিশেষ প্রতিনিধি: চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) এর মালিকানাধীন জেটিঘাট হতে চাতুরি চৌমুহনী পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ৫ কিলোমিটার রাস্তার উভয় পাশে কোটি কোটি টাকার জমি বেদখল হয়ে গেছে। গড়ে উঠেছে শত শত স্থাপনা। অবৈধ দখল ঠেকাতে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না সিইউএফএল কর্তৃপক্ষ। উল্টো দখলদারদের সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি জেটিঘাটে অবৈধ দোকানে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছে সিইউএফএল কর্তৃপক্ষ। লাখ লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল সিইউএফএল কর্তৃপক্ষ বহন করলেও মাসে মাসে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বাবদ ও দোকানের ভাড়া তুলছে কতিপয় সিবিএ নেতা। এর অংশ বিশেষ যাচ্ছে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পকেটে।

সূত্র জানায়, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) এ সাবেক  ব্যবস্থাপনা পরিচালকগণ নিজেদের দূর্নীতি ধামা চাপা দিতে সব সময় সিবিএ নেতাদের পক্ষে রাখার চেষ্টা করেছেন। সফলও হয়েছেন। ফলে তাদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিতেন। জেটি ঘাটে অবৈধ দোকান নির্মাণ ও বিদ্যুৎ সংযোগ এর অন্যতম। এখান থেকে লাখ লাখ টাকা বাড়তি আয় করেছেন সাবেক সিবিএ নেতারা। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রহীম। তিনিও আগের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের পথে হাটছেন। সিইউএফএল এর জমি দখল করে দোকান নির্মাণ ও সেই দোকান গুলোতে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ থাকার বিষয়টি জানেন উপ ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কাজী আমিনুল হক ও  ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রহীম। কিন্তু রহস্যজনকভাবে তারাও এ ব্যাপারে নিরব রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা নিধিরাম সর্দার।

উল্লেখ, জেটিঘাট এলাকায় বিএনপি নেতৃত্বাধীর জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২ এপ্রিল ভোররাতে ১০ ট্রাক অস্ত্র খালাস হয়। ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় জোট সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফরজ্জামান বাবরসহ ১৪ জনকে ফাঁসির দন্ডাদেশ দেয়। অস্ত্র আইনের পৃথক দুটি ধারায় ১৪ জনের প্রত্যককে দেয়া হয় যাবজ্জীবন ও সাত বছর করে দন্ডাদেশ দেয়া হয়। আদালত জেটি ঘাট এলাকাটিকে স্পর্শকাতর এলাকা ঘোষণা করে। জেটিঘাট এলাকাটিকে বিশেষ নজরদারিতে রাখার জন্য আদালতের নির্দেশনা রয়েছে।

এ ব্যাপারে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রহীম এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ)কে বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি, বিষয়টি আমার জানা নেই। অভিযোগ সত্য হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।’

সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে দক্ষ ও সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনা থাকলেও পরবর্তীতে তা শিথিল হয়ে পড়ে। এ সুযোগটি গ্রহণ করেছে কতিপয় সিবিএ নেতা। তাদের পৃষ্টপোষকতায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য দোকান ও স্থাপনা।জেটিঘাটের প্রবেশ পথে সংরক্ষিত এলাকা, জনসাধারণের নিষেধাজ্ঞা সাইন বোর্ড থাকলেও অবাধে লোকজন প্রবেশ করছে, বের হচ্ছে।

সিইউএফএল এর মালিকানাধীন জেটিঘাট হতে চাতুরি চৌমুহনী ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশে শত শত দোকান ও অবৈধস্থাপনা গড়ে উঠেছে এমন তথ্য স্থান পেয়েছে সিইউএফএল এর ২০১৮-১৯ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। ২০২০ সালের  ২৯ ডিসেম্বর  বিসিআইসি’র উপ- প্রধান নিরীক্ষক এসএম শাহনেওয়াজ স্বাক্ষরিত স্বাকক সূত্র নং-নিবিভা/নিদখ/ সিইউএফএল/ ২০১৮-২০২০/৬৩ তারিখ ২৮/১২/২০২০ নিরীক্ষা প্রতিবেদনটিতে সিএফএল কর্তৃপক্ষের গাফেলতির বিষয়টি তুুলে ধরা হয়।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের আপত্তিতে বলা হয়, সিইউএফএল এর  মালিকানাধীন জায়গা-জমি সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই এবং নিরীক্ষা দল কর্তৃক বাস্তব পরিদর্শন করেন। কারখানার  মালিকানাধীন ‘ জেটি ঘাট হতে চাতুরী চৌমুহনী পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ৫ কিলোমিটার রাস্তার উভয় পাশে বিভিন্ন স্থানে দোকান, হোটেল, গাড়ীর গ্যারেজ ও অফিসসহ বিভিন্ন ধরনের অসংখ্য স্থাপনা গড়ে উঠেছে। প্রতিটি স্থাপনা হতেই নিয়মিতভাবে অজ্ঞাত কোন একটি মহল ভাড়া আদায় করলেও তা কারখানার ফান্ডে জমা হচ্ছে না। অথচ উক্ত জায়গার বিপরীতে প্রতি বছর কারখানা হতে বিপুল পরিমাণ টাকা ভূমিকর পরিশোধ করা হচ্ছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, সিইউএফএল জেটি ঘাটে ছোট বড় প্রায় ৩০টি দোকান এবং হোটেল রয়েছে। অবস্থানকারিগণ প্রতিমাসে ৩ হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া প্রদান করছে,যা কারখানার ফান্ডে জমা হচ্ছে না। উল্লেখ, গত ২০০৪-০৫ অর্থ বছরে সিইউএফএল জেটি ঘাটে ১০ ট্রাক অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের তত্ত্বাবধানের অভাবে জেটি ঘাট এলাকায় পুনরায় নতুন করে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে।

অপরদিকে বিআরটিসি ট্রাক স্ট্যান্ড হতে চাতুরী চৌমুহনী রোড়স্থ জাইল্লাঘাটা, কাফকো কলোনী গেট, সেন্টারসহ বিভিন্ন স্থানে রাস্তার দু’পাশে শত শত স্থাপনা গড়ে উঠেছে। উক্ত অবৈধ স্থাপনা ব্যবহারকারীগণ নিয়মিতভাবে অজ্ঞাত কোন একটি মহলকে ভাড়া প্রদান করলেও উক্ত টাকা কারখানার ফান্ডে জমা হচ্ছে না। উল্লেখ, গত ২/৩ বছর পূর্বেও রাস্তাটিতে বিপুল স্থাপনা পরিলক্ষিত হয়নি। প্রতিনিয়ত কারখানার  মালিকানাধীন বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ স্থাপনার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

উল্লেখ,  ২০০৮-২০০৯ অর্থ বছরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে উল্লেখিত স্থানগুলোতে সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও পরবর্তীতে সুষ্টু তদারকি ও তত্ত্বাবধানের অভাবে পুনরায় নতুন করে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। নিরীক্ষা দল তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে কালুরঘাট পানি উত্তোলন কেন্দ্রে একটি মহল মাছ চাষ করছে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত কীভাবে বাহিরের কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান উক্ত জলাশয়ে মাছ চাষ করছে তা নিরীক্ষা দলের নিকট বোধগাম্য নয়। অনতিবিলম্বে বিসিআইসি প্রধান কার্যালয়ের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের মাধ্যমে তদন্তপূর্বক বেদখলকৃত সকল জায়গা-জমি উদ্ধার এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে অব্যবহার জায়গা-জমি ও জলাশয় লিজ প্রদানের কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়।

সরেজমিনে পরির্দশনে দেখা যায়, সেন্টার এলাকায় রাস্তার পাশে অনেক ভূমি স্থানীয়  প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে। স্থাপন করেছে পাকা স্থাপনাও। এসব স্থাপনা উদ্ধারে কোন তৎপরতা নেই সিইউএফএল এর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের। দখলের পর শুধু একটি চিঠি লিখে দায়িত্ব শেষ করেন। গত মাসেও সেন্টার এলাকায় স্বাস্থ্য কেন্দ্রের পাশে বেশ কিছু ভূমি দখল করে দোকান নির্মাণ করেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতা। একই অবস্থা চাতুরী চৌমহনী এলাকায়। আখতারুজ্জামান  চত্বরের পশ্চিম পাশে কাঁচা বাজারটি সিইউএফএল এর মালিকানাধীন হলেও সেটি দেখভাল করে আনোয়ারা উপজেলা প্রশাসন। শুধু কাঁচা বাজার নয়- রাস্তার লাগোয়া পশ্চিম পাশের বিশাল ভূমি দখলে নিয়েছে স্থানীয় লোকজন। প্রতি মাসে সেখানে অন্তত: একটি করে নির্মাণ কাজ হচ্ছে। জাইল্যাঘাটা এলাকায়, নবাব গ্রুপ অব কোম্পানি’র মাল্টি প্রোডাক্ট ইন্ডাস্ট্রিজ  নামে একটি সাইনবোর্ড দেখা গেছে। সাইনবোর্ডের পিছনে রাস্তার উপরে নির্মাণ করা হয়েছে টিনসেড ঘর। এ সব সিইউএফএল কর্তারা দেখেও না দেখার ভান করে আছেন।

আনোয়ারা উপজেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, চাতুরি চৌমুহনীতে সিইউএফএল পরিত্যক্ত জমিতে কাচা বাজার গড়ে উঠেছে।  জনস্বার্থেবাজারটি উন্নয়ন ও দেখভাল করে থাকে উপজেলা প্রশাসন। প্রতি বছর ইজারা দিয়ে যে অর্থ পাওয়া যায়, তা উপজেলার ফান্ডে জমা করা হয়। কাঁচা বাজারের এ অংশটি সিইউএফএল এর নামে নামজারি হয়নি বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এ ব্যাপারে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) এর উপ-ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কাজী আমিনুল হক বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ) কে জানান, লোকবলের অভাবে দখলকারিদের উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা দখল প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, দখল ঠেকাতে গিয়ে তিনি নিজে কয়েক দফা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।  সম্প্রতি সেন্টার এলাকায় স্থাপনা নির্মাণ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে সিইউএফএল এর ভূমি’র দায়িত্বে থাকা  কাজী আমিনুল হক বলেন, তিনি উচ্ছেদের জন্য আনোয়ারা থানার অফিসার ইনচার্জ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে চিঠি লিখেছেন। কিন্তু তারা উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় কোন ধরনের সহযোগিতা করছেন না। আওয়ামী লীগ নেতারা দখল ও স্থাপনা নির্মাণের সঙ্গে জড়িত উল্লেখ করে নিজের অসহায়ত্বের কথা জানান ব্যবস্থাপনা পরিচালরকের অতি আস্থাভাজন কাজী আমিনুল হক।

বিএনএ/ওয়াই এইচ/ এসজিএন