Bnanews24.com
Home » মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-১২(সুনামি তত্ত্ব ! )
বিশেষ সংবাদ

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-১২(সুনামি তত্ত্ব ! )

।।ইয়াসীন হীরা।।

মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি, বাংলাদেশ কথিত গাউছুল আজম (তফজ্জল আহমদ)এর নামে যে সব বানোয়াট কেরামতি প্রচার করেছেন তার আলোচিত- সমালোচিত অন্যতম হচ্ছে “সুনামি’’।যা সাধারণ মানুষের কাছে ভণ্ড মুনিরউল্লাহর “সুনামি তত্ত্ব” নামে পরিচিত। এ সুনামি তত্ত্বে মুল বক্তব্য হচ্ছে মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি, বাংলাদেশ এর সভাপতি মুনির উল্লাহ’র বাবা চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার কাগতিয়া দরবারের পীর, কথিত গাউছুল আজম শায়খ তফজ্জল আহমদ “সুনামি’’কে চলে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। নির্দেশ পেয়ে সুনামি চলে গেছে!

কিন্তু মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি, বাংলাদেশ’র সভাপতি মুনির উল্লাহ তার অনুসারিদের কাছে ভণ্ডামির “সুনামি তত্ত্ব” প্রচার করতে লেজে গোবরে করে ফেলেছেন। মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি, বাংলাদেশের ব্যানারে বিভিন্ন এশায়েত সম্মেলনে এটি প্রায় প্রচার করা হয়। বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ)’র অনুসন্ধানী টিমের কাছে ‌‌“সুনামি’’ সংক্রান্ত দু’টি ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। একটিতে বয়ানকারি মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি, বাংলাদেশ’র সভাপতি মুনির উল্লাহ আহমদী নিজে এবং অন্যটিতে তার ভাড়াটে বয়ানকারি মাওলানা সেকান্দর আলীকে বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে কথিত গাউছুল আজম’র বানোয়াট কেরামতি প্রকাশ করতে দেখা যায় । বিষয় এক হলেও এ সুনামি কাহিনী দু’জন দু’ভাবে উপস্থাপন করেছেন।

মুনিরীয়া অনুসারিদের এক মাহফিলের ভিডিও পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, মাওলানা সেকান্দর আলী বলেছেন বাংলাদেশ সরকার তথা আবহাওয়া অধিদপ্তর সুনামির সংকেত দিয়েছে। সুনামির সংকেতের তারিখ উল্লেখ করেছেন ২০০৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর, বুধবার। অপরদিকে মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি, বাংলাদেশের বর্তমান সভাপতি মওলানা মুনির উল্লাহ আহমদী উল্লেখ করেছেন ২০১০ সালের শেষের দিকে। তিনি সুনিদিষ্ট কোন তারিখ ও দিন উল্লেখ করেননি।

অুনসন্ধানে দেখা যায় মওলানা সেকান্দর আলী ২০০৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর দিন হিসাবে বুধবার উল্লেখ করা হলেও প্রকৃত পক্ষে ২০০৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ছিল শুক্রবার। বর্ণনায়ও রয়েছে ভিন্নতা। সেকান্দর আলী বলেছেন, গাউছুল আজম বঙ্গোপসাগরের পাড়ে গিয়ে আল্লাহ কাছে দু’হাত তুলে ফরিয়াদ করেছেন “তুমি সুনামিকে ধংস করে দাও’’ অন্যদিকে মুনির উল্লাহ বলেছেন,‘হে সুনামি, আমি কাগতিয়ার গাউছুল আজম তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি, তুমি চট্টগ্রাম থেকে বের হয়ে যাও’। বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি’ (বিএনএ)পাঠক ও দর্শকদের জন্য দু’টি ভিডিও উপস্থাপন করা হলো।

 

এশায়েত সম্মেলনে নিজের পিতার ও মুনিরিয়া দরবারের অলৌকিকতা বর্ণনা করতে গিয়ে মুনির উল্লাহ আহমদী হাজার হাজার ভক্ত অনুসারীদের উদ্দেশ্য বলেন,‌ “আমরা এমন একজন কালজয়ী মনীষীকে পেয়েছি। যার মাধ্যমে অনেক বিপদ আপদ থেকে বাংলাদেশের মানুষরা রক্ষা পেয়েছে”।

এ সংক্রান্ত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মুনিরউল্লাহ কেরামতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘শুনুন ভাইরা, কিছুদিন পূর্বে ২০১০ সালের শেষের দিকে, বাংলাদেশে চট্টগ্রামের মধ্যে সুনামির সংকেত দিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। বেতার থেকে, মিডিয়া থেকে, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া থেকে প্রচার করা হচ্ছে যে, সুনামি চট্টগ্রামে আঘাত করবে। বঙ্গোপসাগর উপকূল থেকে হাজার হাজার মানুষকে গাড়িযোগে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। তখন রাউজান থানার এক কচি যুবক (সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত) এশার নামাজ পড়লেন, ‘আল্লাহ সুনামি হলেতো চট্টগ্রামের অস্তিত্ব থাকবে না। তরিক্বতপন্থী এ যুবক আমাদের এশায়েত সম্মেলনে যেতেন। তিনি কাগতিয়ার দরবারের এশায়েত তরিক্বতের উছিলায় ওইদিন ২০০ বার চক্ষু বন্ধ করে এয়া মাহমুদু পড়েন।

”তিনি মুসাহেদায় দেখেন গাউছুল আজম পায়ে হেটে বঙ্গোপসাগরের পাড়ে গেলেন, ‘হে সুনামি, আমি কাগতিয়ার গাউছুল আজম তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি, তুমি চট্টগ্রাম থেকে বের হয়ে যাও’। রাত ১২টা পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার বেতার টেলিভিশন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া চিৎকার দিচ্ছেন, এক্ষুনি চট্টগ্রামের মধ্যে সুনামি আঘাত করবে। অলৌকিকভাবে রাত দেড়টার সময় বেতারের মধ্যে, টেলিভিশনের মধ্যে সংবাদ পরিবেশন করা হলো। অলৌকিকভাবে সুনামি সরে গেছে”!

উল্লেখিত ঘটনাটি বিষয়ে ইসলাম ধর্ম বিশেষজ্ঞ ও আবহাওয়াবিদরা মন্তব্য করেছেন, এটি বড় ধরণের ভণ্ডামি। আবহাওয়া বিদরা বলেছেন ২০০৮ বা ২০১০ সাল বাংলাদেশে কখনো সুনামির সংকেত দেয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে আবহাওয়া অধিদপ্তর কখনো সুনামির সংকেত জারি করেনি। অন্যদিকে ইসলাম ধর্ম, কোরআন-হাদিস নিয়ে গবেষণা করেন তাদের মতে, বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কথা কোরআনে বলা হয়েছে। এটি সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা নির্ভর। তিনি বিপর্যয় দিতে পারেন, আবার তা প্রত্যাহার করতে পারেন। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ এ ধরণের ক্ষমতার বর্ণণা করলে বা তার ক্ষমতার সঙ্গে তুলনা করলে তা হবে শিরক।

পবিত্র আল কোরআন এর সূরা আল মায়িদা, আয়াত:৭২’ এ বলা হয়েছে لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ وَقَالَ الْمَسِيحُ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ (লাক্বাদ্ কাফারাল্লাযীনা ক্বা-লূয় ইন্নাল্লা-হা হুওয়াল্ মাসীহুব্নু র্মাইয়াম্; অক্বা-লাল্ মাসীহু ইয়া-বানীয় ইসরা-ঈলা’বুদুল্লা-হা রব্বী অরব্বাকুম্; ইন্নাহূ মাঁই ইয়ুশ্রিক্ বিল্লা-হি ফাক্বাদ্ র্হারামাল্লা-হু ‘আলাইহিল্ জান্নাতা অমা”ওয়া-হুন্নার্-; অমা-লিজ্জোয়া-লিমীনা মিন্ আন্ছোয়ার)।

যার বাংলা অনুবাদ-”অবশ্যই তারা কুফরী করেছে, যারা বলেছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ হচ্ছেন মারইয়াম পুত্র মাসীহ’। আর মাসীহ বলেছে, ‘হে বনী ইসরাঈল, তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব আল্লাহর ইবাদত কর’। নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, তার উপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা আগুন। আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই”।

উল্লেখিত বিশ্লেষণ, প্রেক্ষাপট ও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কথিত গাউছুল আজম মুনিরীয়াদের পীর তফজ্জল আহমদ এর নামে প্রচার করা “সুনামি তত্ত্ব’’ পুরোটাই মুনিরউল্লাহ’র বানানো মিথ্যা কল্পকাহিনী ও ভণ্ডামি।

অভিযোগ রয়েছে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিজের পিতা মরহুম শায়খ সৈয়দ তফজ্জল আহমদ (গাউছুল আজম)এর কেরামতি প্রকাশ করার অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। তা হচ্ছে, সরল সাধারণ মুসলমান নর-নারী যাতে মুনিরিয়া দরবারের অনুসারী হয়। আর অনুসারি সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থ-সম্পদের বলয়ও বড় হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০ সালে দূরে থাক, এর আগে পরে কোন সুনামির সংকেত বাংলাদেশ সরকার তথা আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে দেয়া হয়নি। দেশের কোন সরকারি-বেসরকারি বেতার, টেলিভিশন এ সংক্রান্ত কোন সংবাদ/বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ করেনি। তা ছাড়া একজন মৃত ব্যক্তি পায়ে হেঁটে বঙ্গোপসাগরের গিয়ে বলেছেন, ‌‘হে সুনামি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি, তুমি চট্টগ্রাম থেকে বের হয়ে যাও। সঙ্গে সঙ্গে সুনামি চলে গেল! এটা বিশ্বাসযোগ্য?

এতে প্রমাণিত হয়, মুনির উল্লাহ একজন পেশাদার ভণ্ড ও ধর্ম ব্যবসায়ী। একটি মিথ্যাকে হাজার হাজার মানুষের সামনে সুন্দর করে উপস্থাপন করেছেন মুনিরীয়া যুব তবলীগের সভাপতি মুনিরউল্লাহ। কথিত গাউছুল আজম (তফজ্জল আহমদ) এর নামে প্রচার করা প্রতিটি কেরামতিই মিথ্যা ও বানোয়াট তা “সুনামি’’তত্ত্বটাই প্রমাণ। এ ধরনের অসংখ্য মিথ্যা আজগুবি কল্পকাহিনী প্রচার করে পবিত্র ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করার পাশাপাশি সহজ সরল মুসলমানদের বিভ্রান্ত করে চলেছেন শুধু অর্থ সম্পদ অর্জনের স্বার্থে এমনটা মনে করেন পর্যবেক্ষকগণ।

প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের উপকূলের সমুদ্র গর্ভে সংগঠিত সুনামি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সুনামি। এতে ইন্দোনেশিয়ায় দুই লাখ ত্রিশ হাজার মানুষ নিহত হন। এশিয়া ও আফ্রিকার ১৩টি দেশ কমবেশী ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বাংলাদেশ ছিল এর বাইরে। এ ভয়াবহ সুনামির পর বাংলাদেশের মানুষ সুনামি(Tsunami)শব্দটির সঙ্গে পরিচিত হয়। সুনামি শব্দটি জাপানি। এর আক্ষরিক অর্থ ‘পোতাশ্রয় ঢেউ’ বা ‘harbor wave’.

চলবে—

আগের পর্ব পড়তে কিক্লক করুন:

মুনিরীয়ার ভণ্ডামী-১১ ( ঝুলন্ত কোরআন )

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-১০ ( রাসুল (স:) সঙ্গে দৈনিক সাক্ষাৎ!

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৯ (তাজে গাউছিয়্যত )

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৮(খেলাফতের স্বাক্ষী যারা)

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৭(ভ্রান্ত যত মতবাদ)

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৬

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৫

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৪
মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৩
মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-২
মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-১