Bnanews24.com
Home » হজরত মুহাম্মদ (সা:) এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের ধর্ম পালন
কভার সম্পাদকীয়

হজরত মুহাম্মদ (সা:) এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের ধর্ম পালন

সম্পাদকীয়

।।মিজানুর রহমান মজুমদার।।

ইসলাম শান্তির ধর্ম। সাম্যের ধর্ম। মানবতার ধর্ম। ইসলাম সহঅবস্থানে বিশ্বাস করে। ইসলাম ধর্ম অনুসারি অন্যান্য সম্প্রদায়ের জন্য হুমকি নয়, বরং তারা অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের  নিরাপত্তা দেয়।  হজরত মুহাম্মদ (সা:) মদিনা ও পাশের অঞ্চলগুলোর মুসলমান, ইহুদি ও পৌত্তলিকদের সহঅবস্থানে বিশ্বাসী ছিলেন। সেকারণে  তিন সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি করেন। যা  ‘মদিনা সনদ’ নামে পরিচিত। নাগরিক সাম্যের মহান নীতি, আইনের শাসন, ধর্মের স্বাধীনতা ও ধর্মীয়সহিষ্ণুতাসহ ৪৭টি শর্ত  উল্লেখ রয়েছে  ঐতিহাসিক এ মদিনা  সনদে। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় এই দলিলকে ‘The Constitution of Madina’ অর্থাৎ মদিনার সংবিধান। মদিনার সনদ হজরত মুহাম্মদ সা:-এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় বহন করে।

মদিনার সনদে বলা হয়,  চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী মুসলমান, ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায় নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে, কেউ কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তা ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবেই বিচার করা হবে। সে জন্য অপরাধীর সম্প্রদায়কে দায়ী করা যাবে না। সর্বপ্রকার পাপ ও অপরাধকে ঘৃণা করতে হবে। কোনোক্রমেই পাপী ও অপরাধী ব্যক্তিকে রেহাই দেয়া যাবে না। দুর্বল ও অসহায়কে রক্ষা ও সাহায্য করতে হবে। কোনো সম্প্রদায়  বাইরের শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়, তা হলে তাদের মিলিত শক্তি দিয়ে সে আক্রমণকে প্রতিহত করবে। কেউ কুরাইশদের সাথে কোনো প্রকার গোপন সন্ধি করতে পারবে না, কিংবা মদিনাবাসীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে কুরাইশদের সাহায্য করবে না।

মদীনা সনদের স্বাক্ষরের পর ঘোষাণা করা হয়,  মদিনায় রক্তক্ষয়, হত্যা ও বলাৎকার নিষিদ্ধ করা হলো। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ সা: প্রজাতন্ত্রের সভাপতি হবেন এবং পদাধিকারবলে তিনি সর্বোচ্চ বিচারালয়ের সর্বময় কর্তা হবেন। মদিনায় কোনো মুসলমান, অমুসলমান কিংবা ইহুদি তার বিনা অনুমতিতে যুদ্ধ ঘোষণা করতে অথবা সামরিক অভিযানে যেতে পারবে না। কোনো মতানৈক্য ও বিরোধ দেখা দিলে তা বিচারের জন্য আল্লাহর রাসূল হজরত মুহাম্মদ (সা:)এর কাছে পেশ করতে হবে।

মদিনার সনদে সব সম্প্রদায়ের শুভেচ্ছা ও সহযোগিতার প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দেয়া হয়।  প্রত্যেকের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে স্বীকার করে। এ সনদে সংঘর্ষ-বিক্ষুব্ধ মদিনার পুনর্গঠনে মুহাম্মদ সা:-এর পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত আরব জাহানকে একতাবদ্ধ করার একটি মহৎ পরিকল্পনাও এতে ছিল। মদিনা সনদ দ্বারা এটিও প্রমাণিত হয়, মুহাম্মদ সা: একজন শ্রেষ্ঠ রাজনীতিজ্ঞও ছিলেন।

মদিনার সনদ মদিনার রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও নাগরিক জীবনে বিরাট পরিবর্তন আনে। প্রথমত, এ সনদ রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপনে সাহায্য করে। মুহাম্মদ সা:-এর নেতৃত্বে নিয়ত যুদ্ধরত গোত্রগুলোর শহর শান্তিপূর্ণ প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। এটি গৃহযুদ্ধ ও অনৈক্যের স্থলে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে। তিনি মদিনার প্রত্যেক মানুষের (মুসলমান বা ইহুদি) জানমালের নিরাপত্তা বিধান করেন।  জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মদিনার সব নাগরিককে এ সনদ সমানাধিকার দান করে। চতুর্থত, এটি মদিনার মুসলমান ও অমুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে তোলে ।

মদিনা সনদ গোত্র বা গোষ্ঠীগত  উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, গোত্রীয় দম্ভ, ধর্মবিদ্বেষ, অঞ্চলপ্রীতির নামে কর্তৃত্ব মূলত মানবতার শত্রু ও প্রগতির অন্তরায় সব রকম প্রয়াস বাতিল করে দেয়। এই মদিনা সনদের ধারাবাহিকতা ধরেই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় পরবর্তী যুগে যথাক্রমে ১২১৫ সালের ম্যাগনাকার্টা, ১৬২৮ সালের পিটিশন অব রাইট, ১৬৭৯ সালের হেবিয়াস কার্পাস অ্যাক্ট, ১৬৮৯ সালের বিল অব রাইটস এবং ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘ কর্তৃক ঘোষিত ‘সর্বজনীন মানবাধিকার’ ঘোষিত হয়।

ইসলামী শরিয়তের বিধানে মানবাধিকারসংক্রান্ত পাঁচটি প্রধান ধারা নির্ধারণ করা হয়েছে। যথা : জীবন রক্ষা, সম্পদ রক্ষা, বংশ রক্ষা, জ্ঞান রক্ষা ও ধর্ম রক্ষা। মূলত মানবতার সুরক্ষা বা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাই ইসলামের মূল লক্ষ্য ও মুখ্য উদ্দেশ্য। সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সা: মানবতার মুক্তির বার্তা নিয়েই এ জগতে এসেছিলেন। তিনিই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ‘আইয়্যামে জাহেলিয়াত’ বা অন্ধকার ও অজ্ঞানতার যুগে পাপাচার, যুদ্ধবিগ্রহ, সহিংসতা, শিশুহত্যা ও কন্যাশিশুকে জীবন্ত মাটিচাপা দেয়ার মতো অমানবিক প্রথার প্রচলন ছিল। ইসলামই মানবতাবিরোধী সব কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধকে মহাপাপ রূপে আখ্যায়িত করেছে এবং এর জন্য দুনিয়ায় চরম শাস্তি ও পরকালে কঠিন আজাবের ঘোষণা দিয়েছে।

হয়রত মুহাম্মদ (সা:) এর ইসলাম ধর্ম  কখনো অন্য ধর্মের প্রতি আঘাতকে মেনে নেয়নি। যারা এহেন কান্ড করবেন তারা ইসলামের শত্রু বলে গন্য হবেন বলে ঘোষণা করেছেন। হজরত মুহাম্মদ সা: দুনিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা ও পরকালে মুক্তির জন্য তিনি জীবনভর মানুষকে সত্যের দিকে আহ্বান করেছেন। হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে শ্রেণিবৈষম্যকে অতিক্রম করে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মধ্যে ভ্রাতৃত্বসুলভ মনোভাব জাগ্রত করেছেন। মহানবী হয়রত মুহাম্মদ (সা:) এর নীতি ছিল- ‘নিজে বাঁচো এবং অপরকেও বাঁচতে দাও’।প্রতিটি মুসলমানের উচিত মহানবী জীবন আদর্শ, আদেশ, নিষেধ মেনে চলা।ব্যক্তি জীবনের মহানবী হয়রত মুহাম্মদ (সা:) এর  জীবন আদর্শ এবং  সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মানবতার শ্রেষ্ঠ দলিল মদীনা সনদ অনুসরণ করলে সব সম্প্রদায়ের সহঅবস্থান, নিরাপত্তা ও ধর্মপালন নিশ্চিত হবে।

সাম্প্রতিককালে মুসলমানগণ বাংলাদেশে বসবাসরত অন্যান্য সম্প্রদায়ের ওপর  একটি মহল রাজনৈতিক ও ব্যক্তিস্বার্থে  হামলা, নির্যাতন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এটি  হয়রত মুহাম্মদ (সা:) এর ইসলাম ধর্ম এবং  আদর্শ বিরোধী। ধর্মের নামে সহিংসতা মেনে নেয়া যায় না। যারা এ ধরনের কাজে জড়িত রয়েছে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি। এসব দূস্কৃতিকারিদের শাস্তি নিশ্চিত করে দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানকে প্রতিহত করতে হবে।