বিএনএ, ঢাকা: “বাপ কা বেটা, সিপাহী কা ঘোড়া; কুছ নেহি তো থোড়া থোড়া”। এটি একটি জনপ্রিয় লোকজ প্রবাদ, যা দিয়ে বোঝানো হয় যে— সন্তান সাধারণত বাবার গুণ বা স্বভাব পায়। ঠিক যেমন একজন দক্ষ সিপাহীর ঘোড়াও কিছুটা যুদ্ধবাজ বা সাহসী গুণের অধিকারী হয়। সহজ কথায় বাপ কা বেটা মানে ছেলে তার বাবার মতোই হয়েছে।
১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার অন্যতম আসামী এক সময়কার তালিকাভূক্ত চোরাচালানী চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানাধীন বৈরাগ ইউনিয়নের উত্তর বন্দর গ্রামের আবুল কাসেম মধুর ছেলে ইফতিয়াল কাসেম চার্লির কথা। চার্লি তার উপ নাম । বাংলাদেশ পুলিশের ওয়াকিটকি বা রেডিও কমিউনিকেশনে ‘চার্লি’ শব্দটি মূলত একটি ‘ফোনেটিক কোড’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মাঠ পর্যায়ের পুলিশি যোগাযোগে কোনো থানার অফিসার ইনচার্জকে বোঝাতে সাধারণত ‘চার্লি’ কোডটি ব্যবহার করা হয়। নিজের ক্ষমতার দাপট দেখাতে চোরাচালানি আবুল কাসেম মধুর ছেলে ইফতিয়াল কাসেম নিজেই ‘চার্লি’ উপনাম ধারণ করেন।

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের সহকারী একান্ত সচিব রিদুয়ানুল করিম চৌধুরী সায়েম এবং তার ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী রনির পিএস বোরহান উদ্দিন চৌধুরী মুরাদ এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন ইফতিয়াল কাসেম চার্লি। তাদের পৃষ্টপোষকতায় আওয়ামী লীগের পুরো শাসনামলে চার্লি, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল), কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) এবং ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানী লিমিটেড (ডিএপিএফসিএল) এর একক নিয়ন্ত্রণ কর্তা ছিলেন। তার কথায় উঠ-বস করতো কর্ণফুলী-বঙ্গোপসাগর মোহনায় অবস্থিত তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার শীর্ষ কর্মকর্তারা। টেন্ডার বানিজ্য, ঠিকাদারি, সারের ট্রাক থেকে চাঁদাবাজি, শ্রমিক সরবরাহ, ইয়াবা চোরাচালান করে কোটি কোটি টাকা অবৈধ আয় করেছেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও আনোয়ারায় গড়েছেন সম্পদের পাহাড়।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তার গডফাদারদের সঙ্গে ইফতিয়াল কাসেম চার্লিও পালিয়ে যায়। অবস্থান করতে থাকে রাজধানী ঢাকার গুলশান-বনানী-বারিধারার মতো অভিজাত এলাকায়। কথায় বলে ‘কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না, স্বভাব যায় না মলে’। ৫ মামলার হুলিয়া নিয়ে শুরু করেন ইয়াবাসহ নানা মাদক ব্যবসা।
গত ১৮ এপ্রিল গাজীপুরে ভাওয়াল রিসোর্ট নামের একটি রিসোর্টে অভিযান চালিয়েছে প্রশাসন। এসময় দেশি-বিদেশি অবৈধ মদসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। ওই রিসোর্টের ডিজে পার্টি থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হৃদয় তরুয়া হত্যাসহ পাঁচলাইশ, খুলশী, চাঁদগাও ও আনোয়ারা থানার ৫ মামলার আসামী ৩০ বছর বয়সী ইফতিয়াল কাসেম চার্লি এবং তার ৫ সহযোগীকে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া অন্যরা হলেন জাহিদুল ইসলাম (৩৪), ফয়জুল ইসলাম খান (৩৫), জিহাদ আহাম্মেদ (১৯), রেদোয়ান হাসান চৌধুরী (৩৩) ও আবির হোসেন (২৩)। তাঁদের কাছ থেকে ৯টি এক্সটেসি, ৫ গ্রাম কুশ, ১৬৫ গ্রাম ক্যানাবিস চকলেট, ১০১টি বিয়ার ও ৩ বোতল ভোদকা উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা রিসোর্টটি ভাড়া নিয়ে প্রায় ডিজে পার্টি আয়োজন এবং মাদক বিক্রি করতো। আর এসব মাদকের সরবরাহ করতো ইফতিয়াল কাসেম চার্লি। ডিজে পার্টিতে অংশগ্রহনকারী তরুণ–তরুনীদের মাঝে বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সরবরাহ করা হতো।
গাজীপুর সদর উপজেলার নলজানি এলাকায় অবস্থিত ওই রিসোর্টে শুক্রবার রাতে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে অভিযান চালান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা। ওই সময় সেখানে একটি ডিজে পার্টি চলছিল।
চার্লির বাড়ি কর্ণফুলী উপজেলার উত্তর বন্দর গ্রামে হলেও বসবাস করতেন চট্টগ্রামের পাচলাইশ থানাধীন হিলভিউ আবাসিক এলাকার ১ নং সড়কের ৭৪ নং বাড়ি ‘জুমাইরাহ হাউজ’এ।
ইফতিয়াল কাসেম চার্লির অপরাধ জগতে প্রবেশ বাবা আবুল কাসেম মধুর হাত ধরে। তার বাবা আবুল কাসেম মধু ছিলেন একজন চোরাচালানী। খাতুনগঞ্জের অবাঙালি ব্যবসায়ী সুশীল রাজগরিয়া, ছানোয়ার হোসেন, হাজী শফির সোনা চোরাচালানের ক্যারিয়ার ছিলেন। সোনার পাশাপাশি ৫৫৫ ও বেনসন সিগারেট, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ও বিভিন্ন মাদক নিয়ে আসতেন এই চোরাচালানী চক্রটি। এই সামগ্রী মাদার ভেসেল থেকে গ্রহণ করতো আবুল কাসেম মধু।
প্রসঙ্গত, অবাঙালি ব্যবসায়ী সুশীল রাজগরিয়া চোরাচালানের গডফাদার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৮২ সালে তিনি নবাব খান নামের এক ব্যক্তির সাথে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, যিনি পরবর্তীতে ৬১৯ কোটি টাকার সরকারি সার কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত ছিলেন।
চট্টগ্রামের আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং রহস্যময় চরিত্র ছিলেন আবুল কাশেম মধু। ২০০৪ সালের পহেলা এপ্রিল রাতে সিইউএফএল জেটিঘাটে অস্ত্র খালাসের সময় তিনি সরাসরি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। কর্ণফুলী থানায় দায়ের করা অস্ত্র ও চোরাচালান উভয় মামলাতেই তাকে আসামিদের তালিকায় রাখা হয়েছিল। মামলার চূড়ান্ত রায়ের আগে ২০১৪ সালে আবুল কাশেম মধু মৃত্যুবরণ করেন। তার পুত্র ইফতিয়াল কাসেম চার্লির গাজীপুর ভাওয়াল রিসোর্ট থেকে মাদক মামলায় গ্রেপ্তারের খবর আনোয়ারায় ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকে মন্তব্য করেছেন ‘নিম গাছে আম ধরে না’!
শামীমা চৌধুরী শাম্মী
![]()

