Bnanews24.com
অর্থ-বাণিজ্য কভার চট্টগ্রাম বিশেষ সংবাদ সব খবর

কঠোর লকডাউনেও সচল চট্টগ্রাম বন্দর-কাস্টমস

কঠোর লকডাউনেও সচল চট্টগ্রাম বন্দর-কাস্টমস

||মনির ফয়সাল||

কঠোর লকডাউনেও সচল রয়েছে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি চট্টগ্রাম বন্দর এবং সিংহভাগ রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস। স্বাভাবিক রয়েছে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এবং কাস্টমসের রাজস্ব আদায়। প্রত্যেক দিন জাহাজ থেকে আমদানি পণ্যের কন্টেইনার নামানো, রপ্তানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার জাহাজে তোলা, ট্রেইলর, বন্দর থেকে পণ্যবাহী কন্টেইনার ডেলিভারিসহ সবকিছু স্বাভাবিক সময়ের মতো চলছে। এপ্রিলের শুরুতে প্রথম দফায় অলিখিত লকডাউন এবং গত ১৪ এপ্রিল থেকে কঠোর লকডাউন শুরুর পরও বন্দর পরিচালনা কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব এখনো পড়েনি। বন্দর সচল থাকায় বন্দর ব্যবহারকারী বিশেষ করে রপ্তানিকারকরা খুবই খুশি।

চট্টগ্রাম বন্দরের ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধের প্রথম ১০ দিনে প্রায় ৪০ হাজার টিইইউস (টুয়েন্টি ফিট ইক্যুইভ্যালেন্ট ইউনিটস) কন্টেইনার ডেলিভারি হয়েছে। সার্বিক কন্টেইনার হ্যান্ডলিংও স্বাভাবিক গতিতে হচ্ছে। তবে গত বছর একই সময়ে করোনার কারণে বন্দরের সার্বিক কার্যক্রমে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। ধারণক্ষমতার অনেক বেশি কন্টেইনারে ব্যাহত হয়েছিল আমদানি-রপ্তানি। তবে এবার এখন পর্যন্ত কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সক্ষম হয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ১৪ এপ্রিল থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের ট্রাফিক বিভাগের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৪ এপ্রিলে ৭ হাজার ৯৩৪ টিইইউস, ১৫ এপ্রিলে ৭ হাজার ৬৩ টিইইউস, ১৬ এপ্রিলে ৮ হাজার ৬৯১ টিইইউস, ১৭ এপ্রিলে ৬ হাজার ৮০০ টিইইউস, ১৮ এপ্রিলে ৬ হাজার ৮১৯ টিইইউস এবং ১৯ এপ্রিলে ৬ হাজার ৭৯৯ টিইইউস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। একই সময়ে কন্টেইনার ডেলিভারি হয়েছে, ১৪ এপ্রিলে ৫ হাজার ১৫১ টিইইউস, ১৫ এপ্রিলে ৩ হাজার ১২২ টিইইউস, ১৬ এপ্রিলে ৩ হাজার ৫৯৮ টিইইউস, ১৭ এপ্রিলে ৩ হাজার ৫ টিইইউস, ১৮ এপ্রিলে ৩ হাজার ৩৫০ টিইইউস এবং ১৯ এপ্রিলে ২ হাজার ৫৮৩ টিইইউস কন্টেইনার ডেলিভারি হয়েছে।

এরআগে ৫ এপ্রিল সরকারি বিধিনিষেধ শুরুর দিন থেকে প্রতিদিন গড়ে ৪ হাজার টিইইউস কন্টেইনার ডেলিভারি হয়েছে। এর মধ্যে ৫ এপ্রিল ৪ হাজার ১৮৪ টিইইউস, ৬ এপ্রিল ৩ হাজার ৮৭৯ টিইইউস, ৭ এপ্রিল ৪ হাজার ১৮৯ টিইইউস, ৮ এপ্রিল ৪ হাজার ৪৩৫ টিইইউস, ৯ এপ্রিল ৩ হাজার ৪৪২ টিইইউস, ১০ এপ্রিল ২ হাজার ২৯০ টিইইউস, ১১ এপ্রিল ৩ হাজার ৫৩৬ টিইইউস, ১২ এপ্রিল ৫ হাজার ২৬৯ টিইইউস ও ১৩ এপ্রিল ৫ হাজার ১৫১ টিইইউস কন্টেইনার ডেলিভারি হয়।

চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যজট কমাতে সপ্তাহের অন্য দিনগুলোর মতো শুক্রবার থেকে রোববার বন্দর থেকে পণ্য দ্রুত ডেলিভারি নিতে স্টেক হোল্ডারদের তাগাদা দিচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। রোববার (১৮ এপ্রিল) এ সংক্রান্তে চট্টগ্রাম চেম্বার, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকে বন্দরের পরিবহন শাখা থেকে চিঠি দিয়ে দ্রুত ডেলিভারির বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে বন্দর।

বন্দর সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের ধারণ ক্ষমতা প্রায় ৪৯ হাজার টিইইউস এর মধ্যে সোমবার (১৯ এপ্রিল) পর্যন্ত কন্টেইনার ছিল ৩৫ হাজার ১৩৮ টিইইউস এফসিএল কন্টেইনার রয়েছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামালমহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন পেঁয়াজ, আদা, রসুনও রয়েছে। এছাড়া আরো ৬টি কন্টেইনার জাহাজ বার্থিংয়ের জন্য বর্হিনোঙ্গরে অপেক্ষায় আছে। বন্দরের অভ্যন্তরে থাকা এসব পণ্য ৪ দিন ফ্রি টাইম পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত চার্জ পরিশোধ করে বন্দরের অভ্যন্তরে থাকা পণ্য খালাস করে নেওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছে বন্দর। বিশেষ করে সপ্তাহের অন্যান্য দিনের ন্যায় শুক্র, শনি ও রোববার স্বাভাবিক সময়ের মত পণ্য ডেলিভারি নিতে উৎসাহিত করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। সপ্তাহের অন্যান্য দিন স্বাভাবিক সময়ে কন্টেইনার ডেলিভারি হয় প্রায় সাড়ে ৩ থেকে চার হাজার টিইইউস। আর শুক্র, শনি ও রোববার ডেলিভারি হয়ে গড়ে ১২শ থেকে ১৮শ টিইইউস কন্টেইনার।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেও বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম ও ডেলিভারি স্বাভাবিক রয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে জেটিতে জাহাজ বার্থিং নেওয়া, পণ্য ওঠা-নামা, ডেলিভারি সবই করা হচ্ছে। এখন যেভাবে ডেলিভারি হচ্ছে ওইভাবে হলে বন্দরে কোন কন্টেইনার জট হবে না।

তিনি বলেন, বন্দরের অভ্যন্তর থেকে কন্টেনার খালাসে বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। বন্দর থেকে পণ্য দ্রুত ডেলিভারি নিতে স্টেক হোল্ডারদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। বন্দরের ভেসেল অপারেশন, ইয়ার্ড অপারেশনসহ আমদানি কন্টেইনার অপারেশন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য স্টেকহোল্ডারদের চিঠি প্রাপ্তির ৩ দিনের মধ্যে বিশেষ উদ্যোগে পণ্য বোঝাই ও খালি কন্টেইনার স্থানান্তর করার জন্য বলা হয়েছে। একইসঙ্গে বন্দরে কন্টেইনার খালাস, জাহাজীকরণ এবং জাহাজ থেকে নামিয়ে রাখার ক্ষেত্রে গতবার লকডাউনের সময় যে সমস্যাগুলো হয়েছিল এবার তার কোনোটি নেই।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) নবনির্বাচিত সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর সচল থাকা মানে দেশের ৯২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি সচল থাকা। চট্টগ্রাম বন্দর সচল থাকার পেছনে প্রথম যে পদক্ষেপের সুফল মিলেছে সেটি হচ্ছে, রপ্তানিমুখী শিল-কারখানা সচল রাখা। এর ফলে পণ্য জাহাজ থেকে নামার পর বন্দরে আটকে থাকার সুযোগ ছিল না। আর কারখানার উৎপাদিত পণ্য নির্বিঘ্নে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে লকডাউনে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজজট নেই, কন্টেইনারজটও নেই। বন্দরের এমন ব্যবস্থাপনায় আমরা খুব খুশি।

এদিকে লকডাউন শুরু হওয়ার পর দুই কর্মদিবসে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে রাজস্ব আদায়ও স্বাভাবিক রয়েছে। ১৫ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১৯৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা এবং ১৮ এপ্রিল রোববার ১৫১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করে দেশের এবং সিংহভাগ রাজস্ব আদায়কারী এই প্রতিষ্ঠানটি।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম বলেন, কাস্টমস হাউসে শুল্কায়নসহ স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছে। আমরা নিয়মিত অফিস করছি। সবকিছু সচল রয়েছে।

বিএনএনিউজ/এসজিএন