Bnanews24.com
Home » মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৪
বিশেষ সংবাদ

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৪

।। ইয়াসীন হীরা।।

মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশের প্রকাশনা ও বিভিন্ন এশায়েত সম্মেলনে তাদের পীর তফজ্জল আহমদকে বিভিন্ন উপাধি দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে, টাইটেল ছাহেব, কাগতিয়ার বড় হুজুর, মহান মোর্শেদ, মুনিরী, শায়খ, গাউছুল আজম, আওলাদে মোস্তফা, খলিফায়ে রসূল (স:) ইত্যাদি।এসব উপাধির ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে তাদের প্রকাশনা সমূহে। যা নিম্মে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এসব উপাদি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নানা ভন্ডামি ও মিথ্যার আশ্রয় নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

 কীভাবে মুনিরী?

মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ ‘আল হাবীব মা‌‘আল হাবীবে ফিল হিসরা’ নামে একটি স্মরণিকা প্রকাশ করে ২০১৬ সালের ৪ মে। স্মরণিকার ১১৫ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘কেন মুনিরী বলি’ শিরোনামে লেখায় বলা হয়েছে, আওলাদে মোস্তফা, খলিফায়ে রাসূল (স:)হয়রত ছৈয়্যদ গাউছুল আজম (র:) জাহেরি শায়খ সুলতান হলেন সুলতানুল আওলিয়া কুতুবুল এরশাদ খাজায়ে বাঙ্গাল হয়রত শায়খ ছৈয়্যদ মুনির উদ্দিন নূরুল্লাহ (র:)। তার দিকে নিসবাত করে হয়রত শায়খ ছৈয়্যদ গাউছুল আজম (র:) নাম মোবারক শেষে ‘মুনিরী’ যুক্ত করা হয়েছে।

এছাড়া ছৈয়্যদ গাউছুল আজম (র:) যখন ২০০৩ সালে ওমরা পালন শেষে মদীনা শরীফ যিয়ারতে গিয়েছিলেন, তাকে জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে রাসুলুল্লাহ (সা:)মদীনা মানোয়ারায় বাইয়্যাত করান। সূরা আহযাব আয়াত ৪৬ এর বরাত দিয়ে উল্লেখ করে বলা হয়, রাসুলুল্লাহ (স:) এর গুণবাচক নাম মোবারক সমূহের মধ্যে আছে ‘মুনির’ তাই নিসবাতে তাশরিফি হিসাবে গাউছুল আজম এর নামের শেষে ‘‌মুনিরী’ যোগ করা হয়েছে।

কীভাবে আওলাদে মোস্তফা?

মুনিরীয়া পীর তফজ্জল আহমদ কীভাবে আওলাদে মোস্তাফা (রসুল স: এর বংশ) হয়েছেন তার ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে ‘আল হাবীব মা‌‘আল হাবীবে ফিল হিসরা’ নামে একটি স্মরণিকায়। ৯৩-৯৪ পৃষ্টায় বলা হয়েছে ১৩৪৫ সালে চট্টগ্রামে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য ১২ জন আওলিয়া চট্টগ্রাম আগমন করেন। তাদের একজন আওলাদে রাসূল হযরত শায়খ ছৈয়্যদ মুহাম্মদ বখতিয়ার মাহি ছাওয়ার (র:)। যিনি  মাতার দিক দিয়ে হযরত নবী কারিম (স:), পিতার দিক দিয়ে হযরত আবু বকর ছিদ্দিক (র:) এর বংশধর। তিনি সুদূর আরব থেকে সমুদ্রপথে মাছের পিঠে ছওয়ার হয়ে চট্টগ্রামে আসেন। তাঁরই বংশধর হযরত শায়খ ছৈয়্যদ লাল মুহাম্মদ কাতিব আল- আরবী আল-কোরাইশি (র:)। এ মহান মনীষীর পূর্ব পুরুষ আওলাদে রসূল(র:) হযরত শায়খ  তার ধরাবাহিক বংশধর তফজ্জল আহমদ মুনিরী। যে কারণে মুনিরীয়াদের পীর শায়খ তফজ্জল আহমদকে আওলাদে মোস্তফা বলা হয়।

একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশের আয়োজিত মাহফিলে মাওলানা আশেক উল্লাহ দাবি করেছেন তাদের পীর আওলাদে রসুল (স:)। অর্থাৎ রসুল (স:) এর বংশধর!

 

কীভাবে শায়খ?

মুনিরীয়া যু্ব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ প্রকাশিত ‘আল হাবীবু মা’আল হাবিবে ফিল ইসরা’ নামের বিশেষ স্মরণিকার ১০৫ পৃষ্টায় বলা হয়েছে, মওলানা তফজ্জল আহমদ এর পূর্বপুরুষ হযরত শায়খ ছৈয়্যদ লাল মুহাম্মদ কাতিব আল-আরাবী আল-কোরাইশী(র:)এর আদি পুরুষগণ ছিলেন আরববাসী। যারা শায়খ হিসাবে পরিচিত। মওলানা তফজ্জল আহমদকে শায়খ উপাদি দিতে গিয়ে বলা হয়েছে কাগতিয়া আলীয়া গাউছুল আজম দরবার শরীফ জান্নাতুল মাওয়া কেন্দ্রীয় মসজিদটি শায়খ কালের মসজিদ বলে উল্লেখ করা হয়। সেজন্যই তফজ্জল আহমদ এর নামের আগে পদবি শায়খ লেখা হয়েছে বলে ‘আল হাবীবু মা’আল হাবিবে ফিল ইসরা’ নামের বিশেষ স্মরণিকা সূত্রে জানা যায়।

বাংলাপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, শায়খ বা শায়েখ  আরবি শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ বয়োবৃদ্ধ। শব্দটির প্রায়োগিক অর্থ ইসলামি আইন ও ধর্মতত্ত্বে জ্ঞানী ব্যক্তি। এই অর্থে শায়েখ একজন আলেমও। শায়েখ হচ্ছেন সেই আলেম যিনি আধ্যাত্মিক জ্ঞানে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছেন এবং অপরের আধ্যাত্মিক জ্ঞানলাভে সহায়তা করেন। মুসলমানদের মধ্যে সুফিদের শায়েখ বলা হত। ভারত উপমহাদেশ এবং বাংলায় সুফিদের শায়েখ, মাখদুম, পীর ও মুর্শিদ বলা হত। বাংলার সুলতানদের শিলালিপিতে শায়েখ ও মাখদুম দ্বারা সুফিদের বোঝানো হয়।

তরিক্বত’ কী?

আল্লাহর নির্দেশিত, প্রিয়নবী(স.) র প্রদর্শিত এবং সাহাবা-ই কেরামের বিধিমালার যথার্থ অনুসরণের নাম তরিকত্ব। এর আভিধানিক অর্থ পথ, রাস্তা, নির্দেশনা। যার পারিভাষিক অর্থ- পথ চলার নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধান, আইন-কানূন, নিয়মাবলী, পদ্ধতি-প্রণালী, নির্দেশনা, নির্দেশিকা, দিশা-দিশারী ইত্যাদি।

মা’রিফতের পরিভাষায় চারটি মূলনীতি সহকারে খোদাপ্রাপ্তির সাধনা করতে হয়। যথা- ১. শরীয়ত, ২. তরীকত্ব, ৩. হাক্বীকত্ব  ৪.মা’রিফাত। খোলাফা-ই রাশেদীনের পরবর্তী যুগে সূফীবাদের বিস্তার ঘটলে আউলিয়া-ই কেরাম ও সূফীসাধকগণের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার প্রসারে বিভিন্ন তরিকার উদ্ভব ঘটে। হানাফী, শাফে‘ঈ, মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবগুলো যেমনি ইলমে শরীয়তকে পরিপূর্ণতা দান করেছে, তরিকতগুলোও তেমনি ইলমে মা’রিফতকে পূর্ণাঙ্গতা দান করেছে।

অর্থাৎ যুগে যুগে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা কোরআন, সুন্নাহর আলোকে সৎপথের নির্দেশ দিয়ে মুক্তিকামী মানুষের পরিত্রাণের ব্যবস্থা করেছেন। তারা অন্ধকার থেকে আলোর পথে পৌঁছার যে নিয়ম-পদ্ধতি ও দিক-নির্দেশনা দিয়ে গেছেন সেটাই তরিকত্ব বা তরিকাহ্।

‘মুনিরীয়া তরিক্বত’ কী?

২০১২ সালের ঢাকায় এশায়েত সম্মেলন উপলক্ষে মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি, বাংলাদেশ প্রকাশিত ক্রোড়পত্রে বলা হয়, মুনিরীয়া তরিক্বত এ মহান মনীষী মানব জাতিকে শরীয়তের ক্ষেত্রে আত্মমর্যাদা ও সতর্কতার শিক্ষা, পরম মানবতা ও বিনয়ের দীক্ষা এবং রুহানী ফযিলত লাভের পথ সুগম করার নিমিত্তে প্রবর্তন করলেন সুন্নত তরিকার উপর প্রতিষ্ঠিত ‘মুনিরীয়া তরিক্বত’।কোন মুসলিম নর-নারী, যুবক-যুবতী, ছাত্র-ছাত্রী এ তরিক্বতে দীক্ষিত হলে শরীয়তের পথ নির্দেশনা অনুযায়ী দৈনন্দিন ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ আমল পালনের পর অতিরিক্ত কিছু নফল এবাদত করতে হয়। এসবকে মুনিরীয়া অনুসারিরা ‘অজীফা শরীফ’ বলে থাকেন। যেমন-বাদে নামাজে মাগরিব ফাতেহা শরীফ, বাদে নামাজে এশা দরূদ শরীফ, বাদে নামাজে ফজর খতম শরীফ। আর সর্বক্ষেত্রে ঈছালে ছাওয়াবের কেন্দ্রবিন্দু রাসূলে খোদা (সা)’র রূহ শরীফ।

পর্যবেক্ষনে জানা যায়, মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ ও মুনিরীয়া দরবার তরিকত্বের নিজস্ব একটি পদ্ধতি আবিস্কার করেছে। তারা তরিকত্বকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে মুরীদদের কাছে। তা হচ্ছে ‌‘স্বপ্ন’। কথিত এ স্বপ্নে আল্লাহর রসুল (স:) সাক্ষাৎ পাওয়া এবং তাদের পীর কথিত গাউছুল আজম (শায়খ তফজ্জল আহমদ) এর মাধ্যমে মৃত্যুকালে কালেমা পড়ানো, পরকালে বেহেস্ত দেয়া! ইহকালে সব ধরনের বিপদ, রোগ-ব্যাধি, সমস্যার সামাধান দেয়ার গ্যারান্টি দিয়ে থাকে! যা প্রকৃত তরিকত্বের সঙ্গে পুরো বিপরীত।

পড়ুন: আগের পর্ব :
মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৩
মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-২
মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-০১