Bnanews24.com
Home » টুইন টাওয়ারে হামলা: একজন তৌফিকের বেঁচে যাওয়া
প্রবন্ধ বিশেষ সংবাদ সব খবর

টুইন টাওয়ারে হামলা: একজন তৌফিকের বেঁচে যাওয়া

টুইন টাওয়ারে হামলা: একজন তৌফিকের বেঁচে যাওয়া

।।সৈয়দ রুহুল আমিন।।
১৯৭৩ সালের এপ্রিল মাসে ম্যানহাটন দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে বিখ্যাত বাণিজ্যিক ভবন টুইন টাওয়ার তার কার্যক্রম শুরু করে ।১১০ তলা বিশিষ্ট ১৩৬৮ ফিট উচ্চতাসম্পন্ন পাশাপাশি দুটি ভবনের একটিতে ছিলো ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। অত্যন্ত ভালো স্থানে অবস্থান, কড়া নিরাপত্তা , অতিশয় সৌন্দর্যমন্ডিত এবং আরও বিভিন্ন কারণে অতি উচ্চ ভাড়া হওয়া সত্ত্বেও যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য টুইন টাওয়ার অফিস পাওয়া একটি বিশাল সম্মানজনক ব্যাপার ছিল। ফলে অতি অল্প সময়ে পুরো বিল্ডিংটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভাড়া নেয়। এই অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের ভিতর ছিল প্রথম টাওয়ারের ১৪ তলায় একটি আইনী প্রতিষ্ঠান, যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বাংলাদেশের সু-সন্তান হাসান তৌফিক চৌধুরী ।আজকের এইদিনে অর্থাৎ এগারোই সেপ্টেম্বর ২০০১সনে এই জমজ ভবন পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যায়।

পৃথিবীর তোলপাড় করা এই ঘটনায় প্রাণ হারান মোট ২৭৫৩জন কিন্তু অলৌকিকভাবে বেঁচে যান তৌফিক এবং তার অফিসের সবাই। আজকে আপনাদেরকে সেই কাহিনী শোনাব তবে তার আগে আসুন পরিচিত হই তার আলোকিত পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে । হাসান তৌফিক চৌধুরীর দেশের বাড়ি সিলেট জেলায় গোলাপগঞ্জ থানার কানিশাইল গ্রামে। তার পিতার নাম  জালাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী এবং মাতার নাম নুর ইকবাল খানম । উনার আরেক পরিচয় হচ্ছে উনি আমার মা হুর ইকবাল খানমের আপন ছোটবোন এবং উনারা আসামের করিমগঞ্জের দেওরাইলের জমিদার রেজা চৌধুরী পরিবারের বংশধর।
হাসান তৌফিকের আপন বড় ভাই হচ্ছেন  হাসান মশহুদ চৌধুরী । পেশাগত ও অবসর জীবনে তিনি সেনাপ্রধান , রাষ্ট্রদূত, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং সর্বশেষে দীর্ঘদিন আফগানিস্তানে জাতিসংঘের দুর্নীতি দমন বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন।
হাসান মশহুদ, হাসান তৌফিক, বড় বোন সাজেদা আপা ও রাকেয়া আপা এই চার ভাই বোনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা সবাই গুরু-শিষ্যের একনিষ্ঠ ভক্ত ।গুরু মানে কবিগুরু আর শিষ্য হচ্ছেন সৈয়দ মুজতবা আলী ।
তাইতো আফগানিস্তানে দীর্ঘদিন অবস্থান করে ফিরে এসে হাসান মশহুদ আমাকে বলেন,চাচা যে অবস্থায় আফগানিস্তান ছেড়ে গিয়েছিলেন আমি বহু যুগ পরে গিয়ে মোটামুটি একই রকম পেয়েছি, তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি ।
আফগানিস্তান বলতে যে উনি মুজতবা আলীর আফগানিস্তানই বোঝেন, উনার মুজতবা আলী ভক্তি তাতেই স্পষ্ট হয়ে উঠে।
এবার সাজেদা আপার কথা বলি।বেশকিছুদিন আগে জানিয়ে দিলেন, এখন আমার বাসায় তোমাদের আসা বারণ।
কারণ জানতে চাইলে পাল্টা জিজ্ঞেস করলেন,আগে বল প্রেসিডেন্ট ক্লিন্টন পৃথিবীর তামাম লোকদের কিসের ভিত্তিতে দুইভাগ করেছিলেন?
আমি ঠোট উল্টে বললাম,ওটাতো সবই জানে।যারা তাজমহল দেখেছে আর যারা দেখেনি।
-ওটা পুরোন হয়ে গেছে, নতুন সংজ্ঞা হচ্ছে যাদের কোভিড হয়েছে আর যাদের হয়নি।আমার হয়েছে আর তোদের হয়নি।কাজেই আমার বাসায় আসা তোদের জন্য বারণ।
মুজতবা আলী ভক্ত ছাড়া এই রকম কথা আর কে বলতে পারে? প্রার্থনা করি এই রকম বড় বোনেরা থাকুন আমাদের উপর ছায়াবৃক্ষ হয়ে।
মাঝে মাঝে আমার সাথে যখন তৌফিকের কথাবার্তা হয় তখন মুজতবা আলীর জানা-অজানা কথা বলে তৌফিক আমাকে অবাক করে দেয় । আমি খুবই ভাগ্যবান যে এই রকম ভাই বোন পেয়েছি বলে ।আবার তৌফিকও খুবই ভাগ্যবান যে টুইন টাওয়ারের বিশাল ঘটনার পরে সে বেঁচে গিয়েছিলো অলৌকিক ভাবে ।
এখন আপনার আপনাদেরকে শোনাবো তৌফিকের সেই অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়ার কাহিনী ।
তৌফিকের চেম্বার ছিল টুইন টাওয়ারে আর বাসা ছিল নিউজার্সিতে । তিন আর দেড় বছরের ছেলে আর মেয়ের দৈনন্দিন রুটিন ছিল ঘুম থেকে উঠেই বাবার রুমে চলে আসা তারপর বেশ কিছুক্ষণ বাবার সাথে গল্প করে খেলে খুনসুটি করে আদর আদায় করে মা’র নাস্তা বানানোয় বাগড়া দেয়া ।
অন্যান্য দিনের মতো বাচ্চারা ঠিকই চলে এসেছিল কিন্তু আদর খেলা সবকিছু হয়ে যাওয়ার বাবাকে ছাড়ছিল না ।তৌফিকের ইচ্ছা করছিল বাচ্চাদের সাথে আরও কিছু সময় কাটাতে কারণ আর মাত্র পাচঁ দিন পর অর্থাৎ ১৬ তারিখে স্ত্রী শাহীন সন্তানদের নিয়ে বাংলাদেশ চলে আসবে ছুটি কাটাতে। পরে তৌফিক গিয়ে কিছুদিন থেকে ওদেরকে নিয়ে ফিরবে ।কিন্তু ওইসব তো পরের কথা , চেম্বারে যাওয়ার জন্যে খুব বেশি দেরি করা চলে না। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে তাই তৌফিক অনেক কষ্টে বাচ্চাদেরকে কোল থেকে নামিয়ে অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে শুরু করল ।
তৌফিক অফিসের জন্য তৈরী হয়ে বের হতে যাবে এমন সময় তার ভাগনে কল্প (ওয়াসিম চৌধুরী)ফোন করল । তার স্ত্রী শাহীন ফোনটা ধরে হ্যালো বলতেই ওদিক থেকে কল্পের আতঙ্কিত প্রশ্ন, মামী , মামা কোথায় ? অফিসে কি চলে গেছে ,কখন বেরিয়েছে ?
তৌফিক আর শাহীন দুজনের কেউই কিছুতেই বুঝতে পারল না কল্প আতঙ্কিত ভাবে এইসব প্রশ্ন কেন করছে ? তবুও অনুমান করলো নিশ্চয়ই বিশেষ কোন কারণ আছে তাই তৌফিক ফোনটা তার হাতে নিয়ে তার ভাগ্নেকে জিজ্ঞেস করল , না যায়নি তবে এখনই বের হচ্ছিলাম , কেন কি হয়েছে ?
কল্প এবার বলল , মামা তাড়াতাড়ি টিভিটা ছাড়ো , দেখো কি ভয়ানক কান্ড ঘটে গেছে । এই বলেই কল্প ফোনটা ছেড়ে দিল ।
যখন তারা টেলিভশন চালু করলো তখন দেখলো একজন উপস্থাপক জোর দিয়ে বলছেন, এ কিছুতেই ভুল বিমান চালানোর কারণে হতে পারেনা। পেছনে দেখা যাচ্ছিলো টুইন টাওয়ার দুটি, যার একটির উপরিভাগ জ্বলছে। ওদের কিছু বোঝার আগেই হঠাৎ করে আরেকটি বিমান উল্কার বেগে টুইন টাওয়ারের দ্বিতীয় ভবনটির ভিতের ঢুকে গেল আর নিমিষেই পুরো টাওয়ারটি একটি জ্বলন্ত আগ্নেগিরির মতো দাউ দাউ জ্বলে উঠলো আর বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে তা ছড়িয়ে পড়তে লাগলো।
মনুষ্য নির্মিত তেরশো আটষট্টি ফুট উচু ভবনের এই নারকীয় আগ্নেয়গিরিসমরুপ আগে কখনও কেউ দেখেনি।
কিছুক্ষন হতবাক থেকে দুজনেই বাচ্চাদের নিয়ে ছুটলো তাদের বাসার সামনে যেখান থেকে নিউ ইয়র্ক উপসাগরের ওপার স্পষ্ট দেখা যায়।
বিহ্বল হয়ে অনেক্ষণ ধরে প্রতিবেশীদের সাথে দেখলো সেই ধ্বংসযজ্ঞ।তার সন্তানরা আজ সকালে দেরী না করিয়ে দিলে পরিণতি কি হবে হতো ভেবে তৌফিক আর শাহীন আতংকে হিম হয়ে গেল।
সৃষ্টিকর্তার অসীম মেহেরবানীতে সবকিছুই ঘটছে চিন্তা করে সৃষ্টিকর্তার কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে করতে বাসায় ফিরলো।
ঘরে ঢুকেই দেখে ফোন অবিরাম বেজেই চলছে পৃথিবীর সবপ্রান্ত থেকে আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব শুভাকাঙ্ক্ষী সবাই জানতে চাইছে।
-তৌফিক তুমি ভালো আছো তো । তৌফিক তুমি ঠিক আছো তো?
-আমি ভালো আছি। আল্লাহর মেহেরবানীতে আমি ঠিক আছি।
ভালো আছি এই কথাটা বলতে বলতে তৌফিক আরেকটা ভালো খবর পেলো।তার অফিসের সবাই প্রাণে বেচেঁ গেছেন কারো কিছুই হয়নি।
এটা কি করে হলো?
ওখানকার অফিসের সময়সূচী সকাল নয়টা থেকে পাচঁটা। সকালবেলাকার ট্রাফিক ঝামেলা এড়ানোর জন্য তার অফিসের সময়সূচী একটু পিছিয়ে সাড়ে নয়টা সাড়ে পাচঁটা করে দিয়েছিল।আর যার দায়িত্ব ছিলো সবার আগে এসে অফিসের দরজা খুলে দেওয়া তারও ভাগ্য ভালো তিনিও সময়মতো এসে ভবনের প্রবেশমুখে পৌছে গিয়েছিলেন আর তক্ষুনি প্রথম বিমান হামলাটি হওয়ায় উনি এসে দৌড়ে বহুদুর চলে গিয়েছিলেন।আর কয়েকমিনিট দেরী হলে কি করুণ পরিণতি হতো চিন্তা করে তৌফিক আরেকবার সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো।
তৌফিক এখন নিউজিল্যান্ডবাসী।বছর দশেক আগে পাকাপাকিভাবে সে এখানে চলে এসেছে। ভালোই আছে স্ত্রীসন্তানসহ।
ভালো থাকুক তৌফিক আর তার পরিবার।

বিএনএ/ ওজি