Bnanews24.com
Home » মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৩
বিশেষ সংবাদ

মুনিরীয়ার ভণ্ডামি-৩

চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার ‘কাগতিয়া আলীয়া গাউছুল আজম দরবার শরীফ’। এ দরবারকে ঘিরে গঠিত হয়েছে ‘‌মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ’। দু’টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা শায়খ সৈয়দ তফজ্জল আহমদ। তিনি পবিত্র কুরআন ও হাদীস বিষয়ে  বিশেষজ্ঞ ছিলেন। এলাকার মানুষকে নামায কায়েম, রোজা, হজ্ব পালন ও জাকাত প্রদানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার আহ্বান জানাতেন। ধর্ম নিয়ে কোন ধরনের গোঁড়ামি, অলৌকিক ক্ষমতার জাহির, প্রচার কোনটাই করেননি।

সৈয়দ তফজ্জল আহমদ এর তিন সন্তান থাকলেও বড় দুই সন্তানকে দরবার থেকে বিতাড়িত করেন কনিষ্ঠপুত্র মুনিরউল্লাহ আহমদী। শায়খ তফজ্জল আহমদ শয্যাশায়ী হয়ে পড়লে তিনি(মুনিরউল্লাহ) নানা বিতর্কিত, মনগড়া অলৌকিক কেরামত প্রচার করতে থাকেন। সফলও হয়েছেন। এখন মুনিরউল্লাহ আহমদী স্বনামে-বেনামে শতকোটি টাকার মালিক! কী ছিল মুনিরীয়ার দর্শন? কে, কখন, কোথায়, কীভাবে, কাদের কাছে অলৌকিক কেরামত প্রচার করতেন মুনিরউল্লাহ আহমদী ও তার সহযোগীরা? তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি(বিএনএ)।অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে কথিত‘‌‌মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ’তথা মুনিরউল্লাহ এর ভণ্ডামির নানা তথ্য। বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি(বিএনএ)’র হেড অব নিউজ ইয়াসীন হীরা’র অনুসন্ধানী ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশিত হলো মুনিরীয়ার ভন্ডামি-৩

 

মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি, বাংলাদেশের প্রকাশনা ‌“আল্লাহ প্রাপ্তির সহজপথ” নামে একটি ছোট আকারের পুস্তক বের করে। এটির প্রথম প্রকাশ ১৯৯৬ সারের ৭ নভেম্বর। সর্বশেষ চতুর্থ সংস্করণ বের করা হয় ২০১৭ সালের ২৬ জুলাই। এর ২৮-২৯ পৃষ্টায় গাউছুল আজমের কেরামতির বর্নণা দিতে গামারী, পাতাবাহার, মেহগনি, বরবটির গাছের পাতায় মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশের মনোগ্রাম ও আল্লাহ লেখা দেখা গেছে! এসব পাতার ছবি তুলে তা ডিজিটাল প্রিন্ট করে কাগতিয়া দরবারে রাখা হয়েছে।

১) ১৯৯৬ সালের ১৭ আগস্ট রাউজান উপজেলার কেউচিয়া গ্রামে আশিষ কুমার শীলের গামারি গাছের বাগানের গাছের একটি পাতায় মুনিরীয়া যুব তবলীগের মনোগ্রাম দেখা গেছে। একজন মুনিরীয়া অনুসারির নজরে আসার পর পাতাটি তাদের কাগতিয়া দরবারে নিয়ে যায়। এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার অনুসারি দরবারে ভিড় করে। মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটির সভাপতি মুনিরউল্লাহ এবং সদস্য সচিব অধ্যাপক ফেরকান মিয়া এ ঘটনাকে অলৌকিক পয়গাম বলে উল্লেখ করেন।

২)‌“আল্লাহ প্রাপ্তির সহজপথ” লেখা হয় ২০০৪ সালের ১ মার্চ। রাউজান উপজেলার দক্ষিণ গহিরা আবুল কাসেম এর বাড়ির আঙ্গিনায় একটি মেহগনি গাছের পাতায় কিছু একটা অঙ্কিত হয়েছে তা দেখে শহিদুল ইসলাম (১২)। পাতাটি তার ‘মা’ হালিমা খাতুনকে দেখায়। তিনি পাতাটি দেখে বলে ওঠেন “এটাতো আমাদের তরিক্বত্ব সংগঠনের মনোগ্রাম”। পরে কাগতিয়া দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পাতাটির ছবি সংরক্ষণ করা হয়।

৩) তৃতীয় ঘটনাটি ঘটে ২০০৪ সালের ২৫ মে। রাউজান উপজেলার বড় ঠাকুর পাড়ায় মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশের ৬ নম্বর কমিটির সদস্য মওলানা আনসার আলীর বাড়িতে। তার বাড়ির ঘরের সামনে পাতা বাহারের পাতায় মুনিরীয়া যুব তবলীগের মনোগ্রাম অঙ্কিত দেখতে পান।

৪)“আল্লাহ প্রাপ্তির সহজপথ” এ দেখা যায়, সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে ২০১২ সালের ৮ মার্চ।‌ ফটিকছড়ি উপজেলা মরহুম জালাল আহমদ চৌধুরীর পুত্র হাফেজ মুহাম্মদ শাহাদাত হোসেনের কর্মস্থল রাউজান সদর হিফজ ও এতিম খানায়। এতিম খানার সামনের জায়গায় তিনি বরবটি শিম রোপন করেন।ওই দিন (২০১২ সালের ৮ মার্চ) সকালে তার চোখ পড়ে বরবটির লতার একটি পাতায়। এতে তিনি দেখতে পান “আল্লাহ” লেখা। পাতার ডান পাশে কাগতিয়া মুনিরীয়ার মনোগ্রাম অঙ্কিত! ওই বরবটি পাতাটিও দরবারে ছবি আকারে সংরক্ষণ করা হয়েছে। সবগুলো পাতার ছবি ও ঘটনার বর্নণা দিয়ে একটি ডিজিটাল ব্যানার করা হয়েছে। এর শিরোনাম দেয়া হয়েছে ‘কাগতিয়া আলীয়া গাউছুল আজম দরবার শরীফে তরিক্বতের মনোগ্রাম বিভিন্ন গাছের পাতায় অলৌকিকরূপে খোদায়ীভাবে অংকিত’।

উল্লেখিত ঘটনা গুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পুরোটায় কল্পকাহিনী।৪টি ঘটনাকে বিভিন্ন নামে অবহিত করা হয়েছে। গামারী গাছের পাতার মনোগ্রামকে ‘অলৌকিক লীলা’ মেহগনী পাতার মনোগ্রামকে ‘অলৌকিক আহবান’, পাতা বাহার মনোগ্রামকে ‘অলৌকিক পয়গাম’ বরবটি পাতার মনোগ্রামকে ‘অলৌকিক নির্দশন’ নামকরণ করা হয়। মুনিরীয়া যুব তবলীগের ইন্টারনেটে পোস্ট করা এমন একটা ছবির নিচে কাগতিয়া দরবারে গিয়ে এক নজর স্বচক্ষে দেখার আমন্ত্রণ জানানো হয়। সংরক্ষণ করা পাতায় মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটির সভাপতি মুনিরউল্লাহ’র ভাড়াটে লোকজন কচি পাতায় মুরিরীয়া মনোগ্রাম অঙ্কন করেছে! মুনিরীয়া দরবার অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারি বুঝাতে এমন প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হয়েছে।পরে পাতাটি পরিপূর্ণ হওয়ার পর তা লোকজনের নজরে আনা হয় এবং ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে তা সংরক্ষণ করে।

২০১১ সালের এশায়েত সম্মেলনে এক ভিডিওতে দেখা যায় মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি, বাংলাদেশ এর মহাসচিব অধ্যাপক ফোরকান মিয়া গাউছুল আজমের এমন কেরামত বর্ণণা করেন। এ কেরামত বর্ণণাকারি নানুপুর লায়লা কবির কলেজের শিক্ষক। প্রশ্ন হচ্ছে,   শিক্ষক হয়েও তিনি কীভাবে পাতার ওপর খোদায়ী ভাবে মনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি, বাংলাদেশের মনোগ্রাম অঙ্কিত হয়েছে বলে বর্ণণা করেন?

প্রসঙ্গত: অধ্যাপক ফোরকান মিয়া হচ্ছে, সে ব্যক্তি; যিনি ১৯৮৬ সালে মাস্টার্স পরীক্ষায় স্বপ্ন যোগে শায়খ তফজ্জল আহমদ মুনিরী থেকে পরীক্ষার প্রশ্ন পেয়েছিলেন। এ প্রশ্ন পাওয়ার বিষয়টি তিনি নিজে বর্ণণা করেছেন। মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন ক্রোড়পত্র ও পুস্তকে, স্মরণিকায় তার প্রশ্ন পাওয়ার বিষয়টি অলৌকিক কেরামত হিসাবে স্থান পেয়েছে।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কোন গাছের কচি পাতার ওপর কোন কিছু অঙ্কন বা লিখলে তা পরবর্তীতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং দৃশ্যমান হয়। এ ক্ষেত্রে মুনিরীয়ার যুব তবলীগ কমিটি, বাংলাদেশের লোগো অঙ্কন করে তা খোদায়ীভাবে অঙ্কিত হয়েছে বলে প্রচার চালায় মুনিরউল্লাহ ও ফোরকান মিয়ার নেতৃত্বাধীন চক্রটি। যা সাধারণ মুনিরীয়ার পীরের প্রতি মানুষকে সম্মোহনী করতে এমন কল্পকাহিনী প্রচার করা হয়।

পড়ুন আগের পর্ব মুনিরীয়ার ভন্ডামি-২