Bnanews24.com
টপ নিউজ দুর্ঘটনা রাজধানী সব খবর

সাত তলা বস্তিতে কেন বারবার আগুন লাগে?

সাত তলা বস্তিতে কেন বারবার আগুন লাগে

।।আজিজুল হাকিম ।।

মহাখালীর সাততলা বিল্ডিংয়ের পাশে বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও বেশ কয়েকবার এখানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।২০১২, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে এবং ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর এই বস্তিতে আগুন লাগে। ধারণা করা হচ্ছে, এক দখলদারদারদের হটিয়ে অন্য দখলদাররা বস্তি কব্জা করার জন্য এই অগ্নিকান্ডের ঘটনা গুলো ঘটাচ্ছে ।ওই বস্তিতে মাদক, দেহব্যবসাসহ নানা অপকর্ম কান্ড থেকে দখলদাররা প্রতি মাসে প্রায় এক কোটি টাকা আয় করছে।  সবশেষ ২০২১ সালের ৭জুনে এই বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রতিবারই অবৈধ বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট বা গ্যাস লিকেজ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগের দুর্বল তারের বা কমদামের পাইপের কারণেই এমন ঘটনা ঘটেছে। আর সেই ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

গত ৭ জুন আগুনে বস্তির প্রায় শতাধিক ঘর পুড়েছে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস।পুড়ে গেছে ঘরে থাকা অনেক আসবাবপত্রও। দিনের পরদিন পরিশ্রম করে বস্তিবাসিরা যা জমাতো তা আগুনে শেষ হয়ে গেছে।এই দখলবাজদের কারনে বস্তিবাসিরা সবসময় আতংকের মধ্যে থাকে।
আগুন নিয়ন্ত্রণের পর সরেজমিনে ওই বস্তিতে গিয়ে অবৈধ বৈদ্যুতিক ও গ্যাস সংযোগের চিত্র দেখা যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, বস্তির ভেতর ছোট ছোট চিপা গলিতে যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অবৈধ গ্যাস লাইন। পায়ে হাঁটা রাস্তার ওপর দিয়ে অরক্ষিতভাবে নেয়া হয়েছে অধিকাংশ অবৈধ গ্যাস সংযোগের লাইন। এসব লাইনের ওপর দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত চলাচল করে। আবার অনেকের রান্নার চুলাও বসানো হয়েছে অরক্ষিত এসব গ্যাস লাইনের খুব কাছে। এছাড়া সংযোগ লাইনের ওপর আবর্জনা থেকে শুরু করে রয়েছে বিভিন্ন দাহ্য পদার্থ। এভাবেই বস্তি জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অবৈধ গ্যাস সংযোগের লাইন।
বস্তিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস রত সাবিনা আক্তার নামে একজন বলেন, বারবার এই বস্তিতে আগুন লাগার কারণে আমরা অসহায়। একেকবার আগুনে ঘরের খাবার থেকে শুরু করে সব আসবাবপত্র পুড়ে যায়। আমরা গরিব মানুষ। কিন্তু আমাদের মতো গরিবদের কথা কেউ ভাবে না।

বস্তিতে বাস করা রিকশাচালক আনসার আলী জানান, গত ছয়বারের আগুনে দুইবার আমার ঘর পুড়ে যায়। ঘিঞ্জি বস্তি হওয়ায় ঘর থেকে কিছুই বের করতে পারিনি। আর এবারের আগুনের সময় আমরা সবাই ঘুমে ছিলাম। এই সময় আগুনে আমাদের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ঘর থেকে কিছুই বের করতে পারিনি। সরকারের উচিত বারবার কেন আগুন লাগে, কেউ ইচ্ছা করে আগুন লাগিয়ে দেয় কি-না সেসব বিষয় খুঁজে বের করা।

দখলবাজদের কারণে বারবার আগুন লাগছে এই বস্তিতে? এমন প্রশ্নে ঢাকা বিভাগ ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক দেবাশীষ বর্ধন বলেন, ঢাকার অন্যান্য বস্তিতে যেভাবে আগুন লাগে সাততলা বস্তিও এর বাইরে না। বস্তিতে দাহ্য পদার্থ, বাঁশ, কাঠ দিয়ে তৈরি ঘর, আবার অনেক ঘর দোতলা , এসব কারণে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, গ্যাসের লাইনগুলো কতটুকু বৈধ-অবৈধ জানি না। তবে কিছু লাইন অবৈধ থাকতে পারে এবং এখানে বিদ্যুতের লাইনও অবৈধ। কী কারণে আগুন লেগেছে তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে।

এক প্রশ্নের জবাবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, বস্তিতে টিনের ঘর অনেক বেশি সেপারেশন হওয়ায় আমাদের আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয়েছে। এছাড়া দাহ্য বস্তুর উপস্থিতি বেশি থাকায় আগুনটা বেশি ছড়িয়েছে।
আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, এখানে প্রচুর পরিমাণে অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন রয়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে মনে করছি, এই দুইটার থেকে যেকোনো একটি কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।

উল্লেখ্য, সোমবার ভোর ৪টার দিকে সাততলা বস্তিটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে পুরো বস্তিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের প্রচেষ্টায় প্রায় তিন ঘণ্টা পর সকাল ৭টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। এ অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের কোনো খবর এখনও পাওয়া যায়নি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের কন্ট্রোল রুমের ডিউটি অফিসার কামরুল হোসেন জানান, ঘটনাস্থলে প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট কাজ শুরু করে। পরে আরও ১৪টি ইউনিট সেখানে যোগ দেয়। এছাড়া পুলিশ, র্যাব ও স্থানীয় বাসিন্দারা ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সহায়তা করেন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

বস্তির বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানান, বস্তিজুড়ে কাঠ ও টিনশেডের ঘর। পুরো বস্তিতে প্রায় দুই হাজার ঘর রয়েছে। এর অর্ধেকই পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে গেছে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর। এদিকে  দখলবাজদের হাত থেকে রক্ষার জন্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম ওই বস্তির জায়গায়টি করোনা হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ দিয়েছেন।

বিএনএ/ ওজি