বিএনএ, ঢাকা: জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে নিরুদ্দেশ থাকা শিরীন শারমিন চৌধুরী দেড় বছরের বেশি সময় পর গ্রেপ্তার হয়ে, গেলেন কারাগারে। প্রশ্ন ওঠেছে, এতদিন তাহলে কোথায় ছিলেন সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী? এটি এখন বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। একই সঙ্গে ‘টক অব দ্যা কান্ট্রি’।
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শিরীন শারমিন সপরিবারে আশ্রয় নিয়েছিলেন ঢাকা সেনানিবাসে। তারপর দলটির অনেক নেতা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য গ্রেপ্তার হলেও— শিরীন শারমিনের কোনো খোঁজ আর পাওয়া যাচ্ছিল না।

গোয়েন্দা পুলিশ মঙ্গলবার ভোরে আকস্মিকভাবে ঢাকার ধানমন্ডির একটি বাড়ি থেকে শিরীন শারমিনকে গ্রেপ্তারের খবর দেয়। তাঁকে প্রথমে নেওয়া হয় রাজধানীর মিন্টো রোডে, ডিবির কার্যালয়ে। এরপর জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সহিংসতা, ভাঙচুর ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় রাজধানীর লালবাগ থানায় করা একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। দুপুরে তাঁকে একটি মাইক্রোবাসে করে নেওয়া হয় পুরান ঢাকার আদালতে।
সাবেক এই স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরীকে অভ্যুত্থানের সময়কার একটি হত্যাচেষ্টার মামলায় হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন ছিল পুলিশের। তবে তাতে সায় দেননি আদালত। আবার জামিনের আবেদনও নাকচ করে দেন বিচারক।
রিমান্ড আবেদনে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মোহসীন উদ্দীন বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আসামি তাঁর নাম-ঠিকানা প্রকাশ করে এই মামলার ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, গত দেড় বছরে দুই দফা ক্ষমতার পালা বদল হলেও পুলিশ কী শেখ হাসিনার আমলের পথে হাটছে? শিরিন শারমিনের মতো একজন আইনজীবী, স্পিকার গ্রেপ্তারের পর পরই স্বীকার করেছেন, তিনি হত্যা প্রচেষ্টার সঙ্গে জড়িত?
শিরিন শারমিনের আইনজীবীরা আদালতে জামিন শুনানিকালে বলেন, ‘মামলায় ঘটনার তারিখ ১৮ জুলাই, ২০২৪। কিন্তু মামলাটি করা হয় ২০২৫ সালের ২৫ মে, অর্থাৎ ১০ মাস ৭ দিন পর মামলাটি করা হয়েছে। ‘এ মামলায় ১৩০ জনের নামসহ অজ্ঞাতনামা অনেকে আসামি আছেন। এজাহারে ৩ নম্বরে তাঁর নাম থাকা ছাড়া আর একটা শব্দও যদি কিছু থাকে, তবে জামিন চাইব না’।
ঢাকা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২০ মিনিটের শুনানি শেষে শিরীন শারমিনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। এ আদেশের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা আদালত প্রাঙ্গণে জয় বাংলা স্লোগান তুললে, তাঁদের সঙ্গে বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের ধাক্কাধাক্কি হয়। আদালতকক্ষ থেকে পুলিশবেষ্টনীর মধ্যে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে হাজতখানায় নেওয়ার সময়, তিনি সিঁড়িতে পড়ে গিয়ে ব্যথা পান। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে টেনে তোলেন দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, শিরীন শারমিনের বিরুদ্ধে গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা মামলাসহ ৬টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তিনটি মামলায় ইতিমধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। বাকি তিনটি মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন বলে জানান ওই পুলিশ কর্মকর্তা।
প্রসঙ্গত, ৫ই আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অনেকেই সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সাবেক স্পিকার শিরিন শারমিনএবং তার পরিবারও ঢাকা সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর গত বছরের ২২ মে আশ্রয় গ্রহণকারীদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। আইএসপিআর-এর তথ্যমতে, সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের তালিকার ৪ নম্বর ক্রমিকে ছিলেন সাবেক স্পিকার।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, রাজনৈতিক নেতা, বিচারক, আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাসহ প্রায় ছয় শতাধিক ব্যক্তিকে সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের ১৮ই আগস্ট দেওয়া সেই বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মানবিক দায়বদ্ধতা ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ থেকে জীবন রক্ষা করতেই তাঁদের আশ্রয় দেওয়া হয়। শিরিন শারমিন কখন সেনা নিবাস ত্যাগ করেন, সেই ব্যাপারে কোন কিছুই জানায়নি আইএসপিআর।
বর্তমানে কারাবন্দী সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ৫ই আগস্ট সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুসহ প্রায় ১২ জন সংসদ ভবনের একটি কক্ষে লুকিয়ে ছিলেন। পরে রাত আড়াইটার দিকে সেনাবাহিনী তাঁদের উদ্ধার করে সেনানিবাসে নিয়ে যায়। এর কিছুদিন পর ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু, জুনাইদ আহমেদ পলক, বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হলেও শিরীন শারমিনের অবস্থান নিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশের দাবি সেনানিবাস থেকে আসার পর তিনি বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে ছিলেন। যে বাসা থেকে শিরিনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সেটি তার স্বামীর নামে বলে জানা গেছে। তার এক আত্মীয় নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, গ্রেফতারের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি হঠাৎ করেই সেই বাসায় এসেছিলেন।
প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর স্পিকার নির্বাচিত হন আবদুল হামিদ। তাঁকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হলে ৬০ বছর বয়সী শিরীন শারমিন আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশের সংসদে প্রথম নারী স্পিকার নির্বাচিত হন। এর পর থেকে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট পর্যন্ত টানা এই দায়িত্বে ছিলেন। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের ২৭ দিনের মাথায় ২০২৪ সালের ২রা সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন শিরীন শারমিন।
সৈয়দ সাকিব
![]()

