32 C
আবহাওয়া
৪:২৫ অপরাহ্ণ - অক্টোবর ২৮, ২০২৬
Bnanews24.com
Home » ৭ই অক্টোবর: গাজার ট্র্যাজেডি ও বিশ্ব বিবেকের চরম পরাজয়

৭ই অক্টোবর: গাজার ট্র্যাজেডি ও বিশ্ব বিবেকের চরম পরাজয়


 

৭ই অক্টোবর: তিন বছরের ধ্বংসযজ্ঞ, মানবিক বিপর্যয় ও ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ট্র্যাজেডি

২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর—আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগে এই দিনটিতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এক অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ মোড় নেয়। গাজা উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ইসরায়েলে নজিরবিহীন আক্রমণ মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ইতিহাসকে এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করায়। তবে এই ঘটনার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিশ্ববাসী যা প্রত্যক্ষ করেছে, তা কোনো সাধারণ সামরিক সংঘাত নয়; বরং তা রূপ নিয়েছে শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ মানবসৃষ্ট গণহত্যা, গণ-উচ্ছেদ এবং অবর্ণনীয় মানবতাবিরোধী অপরাধে। ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক অভিযানের মুখে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা আজ এক জীবন্ত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

৭ই অক্টোবরের ঘটনার পর ইসরায়েল সরকার গাজায় সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে। খাদ্য, পানি, বিদ্যুৎ এবং ওষুধ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে সমগ্র অঞ্চলকে অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়। একে একে আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, স্কুল, জাতিসংঘের আশ্রয়কেন্দ্র এবং শরণার্থী শিবিরগুলোতে চালানো হয় অবিরাম বিমান ও স্থল হামলা।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের বারবার তাগিদ সত্ত্বেও গাজায় সামরিক অভিযানের নামে চালানো হয়েছে নির্বিচার গণহত্যা। গত তিন বছরে প্রায় ৭৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি জীবন হারিয়েছেন, যার সিংহভাগই নিরপরাধ নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি মানুষ। গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত হানায় সামান্য চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন লাখ লাখ ফিলিস্তিনি। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে নিখোঁজ থাকা হাজার হাজার মানুষের হিসাব তো সরকারি পরিসংখ্যানে উঠে আসাও সম্ভব হয়নি।

গণ-উচ্ছেদ ও গৃহহীন মানবতা

যুদ্ধের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো ফিলিস্তিনিদের বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়া। গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ—অর্থাৎ প্রায় ২০ লাখ অধিবাসী—নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। উত্তর গাজা থেকে দক্ষিণ গাজায়, রাফাহ থেকে সমুদ্র উপকূলবর্তী অস্থায়ী তাঁবুতে বারবার তাদের তাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে। ‘নিরাপদ অঞ্চল’ (Safe Zone) ঘোষণা করেও সেখানে চালানো হয়েছে অতর্কিত বিমান হামলা।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজা উপত্যকার ৮০ শতাংশেরও বেশি অবকাঠামো সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস হয়ে গেছে। পুরো শহরের অস্তিত্ব মানচিত্র থেকে মুছে গেছে। যে ঘরবাড়িতে একসময় হাসি-আনন্দ আর জীবনের গুঞ্জন ছিল, তা আজ কেবল ধূলিসাৎ হওয়া ইট-পাথরের স্তূপ। মানুষ নিজের ভিটেমাটিতেই শরণার্থী হয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার ও কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ

এই তিন বছরে আন্তর্জাতিক মহল ইসরায়েলি নীতির আরেকটি ভয়ানক দিক প্রত্যক্ষ করেছে—তা হলো খাদ্য ও মানবিক সাহায্যকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা। গাজার সীমান্ত পারাপার বন্ধ করে ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে উত্তর গাজাসহ সমগ্র অঞ্চলে দেখা দেয় কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ। শিশু ও বৃদ্ধরা অনাহারে, পুষ্টিহীনতায় ভুগে এবং সুপেয় পানির অভাবে মৃত্যুবরণ করেছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) বারবার মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে নির্দেশ দিলেও তার বাস্তবায়ন হয়েছে নামমাত্র।

নীতি ও আইনি সংকট: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা

৭ই অক্টোবরের পর থেকে বিশ্বব্যাপী যে সাধারণ নাগরিক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তার বিপরীতে দেখা গেছে বিশ্বনেতাদের চরম নীতিহীনতা ও দ্বিচারিতা। মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের বুলি আওড়ানো ক্ষমতাধর পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলকে নির্বিচারে অস্ত্র ও কূটনৈতিক সুরক্ষা জুগিয়ে গেছে। যদিও বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং মানবাধিকার কর্মীরা রাস্তায় নেমে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে আওয়াজ তুলেছেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় থাকা শক্তিগুলোর ব্যর্থতা মানবজাতির জন্য চরম লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইসরায়েলের এই বেপরোয়া আক্রমণ গাজাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিম তীর, লেবানন এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে, যা গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে পুরোপুরি বিনষ্ট করে দিয়েছে।

আজকের এই ৭ই অক্টোবর কেবল একটি নির্দিষ্ট তারিখ নয়; এটি আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার নৈতিক পতনের এক স্মারক। তিন বছর পেরিয়ে গেলেও গাজার বাতাসে আজও বারুদের গন্ধ, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া কান্নার শব্দ আর বেঁচে যাওয়া মানুষের হাহাকার। ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো এই পরিকল্পিত গণহত্যা প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক আইন ও বিশ্বশান্তির প্রতিশ্রুতি কেবল নির্দিষ্ট কিছু শক্তির স্বার্থরক্ষার্থেই ব্যবহৃত হয়।

সংঘাত শুরু হয়েছিল এক দিনে, কিন্তু এর নির্মম জের বহন করতে হচ্ছে একটি গোটা জাতিকে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। অনতিবিলম্বে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, দখলদারিত্বের অবসান এবং ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া এই ভূখণ্ডে শান্তি ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। বিশ্ব বিবেককে আজ প্রশ্ন করতেই হবে—আর কত প্রাণ ঝরলে, আর কত শহর ছাই হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ বন্ধ হবে?

ডেস্ক রিপোর্ট, বিএনএ

Loading


শিরোনাম বিএনএ