Bnanews24.com
কভার সব খবর সম্পাদকীয়

‘দাবায়া রাখতে পারবা না’

‘দাবায়া রাখতে পারবা না’

।। মিজানুর রহমান মজুমদার।।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। বাঙ্গালী জাতির জন্য এক ঐতিহাসিক দিন। এদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার উপস্থিতিতে পাক শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বাঙালি জাতির বহুকাঙ্খিত স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। অসীম সাহসিকতার সাথে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করলেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’, বাগ্মিতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় ভাস্বর এই ভাষণে তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বাঙালির আবেগ, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে একসূত্রে গেঁথে ছিলেন।

মহান নায়ক রাজনৈতিক দাশর্নিক শেখ মুজিবুর রহমান আরও বললেন, ‘আর দাবায়া রাখতে পারবা না’। বাঙ্গালীকে ‘দাবায়া’ রাখা যায়নি। তারই ধারাবাহিকতায় ২৫ মার্চ রাত পাক বাহিনী কোন ঘোষণা ছাড়াই বাঙ্গালীদের বিরুদ্ধে একতরফাভাবে যুদ্ধ শুরু করে। গ্রেফতার করা হয় বাংলাদেশের রূপকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। গ্রেফতারের আগে তিনি ‘প্রতিরোধ যুদ্ধ’ ঘোষণা করেন। তার নির্দেশ পেয়ে বাঙ্গালী সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বর্ডার গার্ড, পুলিশসহ সাধারণ মানুষ পাক সেনাদের প্রতিরোধ করতে শুরু করে। শুরু হয় জনযুদ্ধ।

দীর্ঘ ন’মাস সশস্ত্র জনযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হয়। বিশ্বে এত কম সময়ে কোন দেশ স্বাধীন হওয়ার ইতিহাস নেই। বঙ্গবন্ধুর অনন্যসাধারণ নেতৃত্বে বাঙালি জাতি ২৩ বছরের রাজনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তি পায়। এর প্রেরণা ছিল বঙ্গবন্ধুর ১৯ মিনিটের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। এটি শুধু সাধারণ কোন ভাষণ নয়- এটি ছিল বিশ্ব রাজনীতির এক মহাকাব্য ও দর্শন। বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ।

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণটি বিশ্বের ১২টি ভাষায় অনুবাদ করা হয়৷ এই ভাষণের ফলশ্রুতিতে বিশ্বের স্বনামধন্য পত্রিকা নিউজ উইক ম্যাগাজিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে `রাজনীতির কবি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।২০১৭ সালের ৩০ শে অক্টোবর ইউনেস্কো এই ভাষণকে স্বীকৃতি দেয় বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে।এ ঐতিহাসিক ভাষণ ইউনেস্কো’র মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারে নিবন্ধিত হয়েছে; এটিই প্রথম কোনো বাংলাদেশি দলিল, যা আনুষ্ঠানিক ও স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। বাংলাদেশি জাতিসহ বিশ্বের সকল নির্যাতিত জাতির নিকট তা অপরিসীম মূল্যবান এক দলিল বা রক্ষাকবচ ।

দর্শন ও আর্দশের দিক থেকে বঙ্গবন্ধু ছিল বহমান, কালজয়ী। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশকে একটি সুখী-সমৃদ্ধ ‘সোনার বাংলা’য় পরিণত করাই ছিল বঙ্গবন্ধুর আজীবনের লালিত স্বপ্ন। সে অপরাধে পাক শাক গোষ্ঠী তার ফাঁসির আদেশও দিয়েছিল। এতে জনযুদ্ধ আরও বেগবান হয়। বিশ্বের চৌকষ সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে এদেশের সাধারণ মানুষ। যদিও স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায় । নির্যাতনের শিকার হয় ৩ লাখ মা-বোন ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের পরতে পরতে মিশে আছে জাতির পিতার অসামান্য অবদান। মহান ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জনের এই দীর্ঘ বন্ধুর পথে বঙ্গবন্ধুর অপরিসীম সাহস, সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং সঠিক দিকনির্দেশনা জাতিকে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়।

বঙ্গবন্ধু কখনো ঈশা খাঁ কিংবা নবাব সিরাজ উদ দৌলা কিংবা তিতুমির কিংবা কখনো সূর্যসেন কিংবা ক্ষুুদিরাম। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এই সোনার বাংলার দুর্জয় তারুণ্যের হিমালয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট কালো রাতে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে কিছু বিপদগামী স্বাধীনতা বিরোধী সেনা সদস্য হত্যা করে। খুনি চক্র পরবর্তীতে স্বাধীনতা বিরোধীরাই ২১ বছর কখনো সামরিক, কখনো বেসামরিক পোষাকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে। মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে নির্মূল করে দেয়। এমনকি সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে জাতির জনক ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার বিচার বন্ধ করে দেয়। কখনো আঘাত হেনেছে মীর জাফর, কখনো মোহাম্মদীবেগের রূপে স্বাধীনতা বিরোধীরা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বজ্রকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘দাবায়া রাখতে পারবা না’। তার মৃত্যুর ২১ বছর পর আবারো বাঙ্গালি জেগে ওঠেছে। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জয়যুক্ত করে। যদিও ২০০১ সালের নির্বাচনে আন্তর্জাতিক প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়। এ ষড়যন্ত্রও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আবারও বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতাসীন হয় মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগ। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চৌকষ নেতৃত্বে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। যা বিশ্বের কাছে ‘রোল মডেল’। প্রধানমন্ত্রী ‘রূপকল্প-২০২১’ ও ‘রূপকল্প-২০৪১’ ঘোষণা করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা ২০৪১ সালে উন্নত-সমৃদ্ধ ‌দে‌শের তালিকায় নাম লেখাবে এতে কোন সন্দেহ নেই।