Bnanews24.com
কভার চট্টগ্রাম পজেটিভ বাংলাদেশ বিশেষ সংবাদ সব খবর

রমজানের আগে কমেছে ভোগ্যপণ্যের দাম

রমজানের আগে কমেছে ভোগ্যপণ্যের দাম

।।মনির ফয়সাল।।

রমজান শুরু হতে  আর মাত্র একসপ্তাহ  বাকি। এরই মধ্যে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে চলছে এক সপ্তাহের লকডাউন। আর রমজান এলেই প্রতিবছর হঠাৎ করেই সরবরাহ সংকটে মূল্যবৃদ্ধি ও সিন্ডিকেটের অজুহাত দেখিয়ে নিত্যপণ্যের বাজারের প্রতিটি জিনিসের দাম বৃদ্ধির নিয়মিত দৃশ্য দেখা যায়। তবে ব্যতিক্রম দেখা মিলছে এ বছর। রমজানকে সামনে রেখে কমেছে ছোলা, মটর, ডাল, চিনি, তেল ও চিড়ার দাম। কিন্তু বেড়েছে আদা, রসুন এবং পেঁয়াজের দাম। দেশের বৃহৎ পাইকারি ভোগ্যপণ্যের বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ঘুরে মঙ্গলবার(৬এপ্রিল) এমন চিত্র দেখা গেছে।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের মতে, প্রতি বছর শবে বরাতের পর ও রমজানের আগ মুহূর্তে দেশের বৃহৎ এই পাইকারি ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জ সরগরম থাকে। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা এসে রমজানের প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে নিয়ে যায়। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। গত এক সপ্তাহ থেকে বাজারে জেলা-উপজেলার ব্যবসায়ী আসছে খুবই কম। যার প্রভাবে রমজানের প্রয়োজনীয় প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম কমে গেছে। এই অবস্থায় করোনার প্রভাবে পণ্যের দাম কমলে মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাজারের দ্বিতীয় সারির পাইকার ও জেলা-উপজেলার পাইকার ব্যবসায়ীরা।

জানা যায়, খাতুনগঞ্জে পাইকারি পর্যায়ে মানভেদে অস্ট্রেলিয়ার ছোলা বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৫৯-৭০ টাকায়। সপ্তাহ আগেও বাজারে একই মানের ছোলা বিক্রি হয়েছে কেজি প্রতি ৬২-৭২ টাকায়। এক সপ্তাহ আগেও বাজারে প্রতিমণ মিয়ানমারের ছোলা বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৮০০ টাকা দরে। ১০০ টাকা কমে এখন ২ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সপ্তাহ আগে বাজারে কেজি প্রতি মটর বিক্রি হয়েছে কেজি ৪১ টাকা। গত এক সপ্তাহ ধরে বিক্রি হচ্ছে কেজি ৩৮ টাকায়।

বাজারে প্রতি কেজি কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মোটা জাতের মসুর বিক্রি হচ্ছে কেজি ৬২ টাকা  দামে। যা এক সপ্তাহ আগেও কেজি প্রতি ৬৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কমেছে খেসারির দামও। এক সপ্তাহ আগে বাজারে প্রতি কেজি খেসারি বিক্রি হয়েছে কেজি ৭৩ টাকা। আর বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৬৬ টাকা দামে।

এক সপ্তাহ ধরে কমতে শুরু করেছিল চিনির বাজারও। গত সপ্তাহেও প্রতি কেজি চিনির দাম ছিল ৬৪ টাকায়। এখন চিনি বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৬১ টাকায়। শুধু চিনিও নয় কমতে শুরু করেছে ভোজ্যতেলের বাজারও। পাইকারিতে প্রতি মণ (৪০ দশমিক ৯০ লিটার) পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৮৫০ টাকায়। গত সপ্তাহ পর্যন্ত বাজারে পাম অয়েলের দাম ছিল ৩ হাজার ৯৫০ টাকা। সুপার পাম অয়েলের দাম ১০০ টাকা কমে ৪ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সয়াবিন তেলের দামও মণে ১০০ টাকা কমে ৪ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে।

কমেছে চিড়ার দামও। মানভেদে প্রতিবস্তা (৫০ কেজি) চিড়া বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩৫০ থেকে ২ হাজার ৬৫০ টাকা দরে। যা গত এক সপ্তাহ আগেও ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা ছিল।

খাতুনগঞ্জে মেসার্স রহমত স্টোরের স্বত্ত্বাধিকারী রহমত আলী বলেন, পণ্যের দাম এখন কমতির দিকে। কিন্তু লকডাউন শুরুর পর থেকে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে ব্যবসা কমে গেছে। মানুষ আতঙ্কিত হয়ে লকডাউনের আগে সকলেই পণ্য কিনে মজুদ করে ফেলেছেন। লকডাউনের সময় যদি আরও বাড়ে, এরকম ক্রেতারও সংকট থাকে তাহলে আমরা ব্যবসায়ীরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবো।

বাজারে তেল, চিনি, ডাল,ছোলা, মটর, মসুর ও খেসারি ডাল কমলেও বেড়েছে পেঁয়াজ, আদা, রসুনের দাম। ভারতীয় পেঁয়াজ আগে বিক্রি হয়েছে ৩০ টাকায়। এখন কেজি ৩১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি পেঁয়াজ দুই দিন আগে ২৮ টাকায় বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। এছাড়া ৪৬ টাকার আদা বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকার উপরে। ৯৩ টাকার রসুন বিক্রি হচ্ছে কেজি ৯৮ টাকায়।

এ বিষয়ে খাতুনগঞ্জ হামিদ উল্লাহ বাজার আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস বলেন, লকডাউনের আগে ক্রেতার ভিড় একটু বেশি ছিল। স্টকে চাহিদার তুলনায় পণ্যের পরিমাণ কম ছিল। আর এসব পণ্যের মৌসুমও শেষের দিকে। তাই দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে রমজানে এসব পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকবে।

এদিকে বিশেষ ব্যবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দর খোলা রাখা হলেও লকডাউনের প্রভাবে কমে গেছে পণ্য খালাস কার্যক্রম। চাল, ডাল, তেল, গম, ছোলা, খেজুরসহ রমজানের পণ্য নিয়ে আসা কয়েক লাখ টন পণ্য পড়ে আছে চট্টগ্রাম বন্দরে। চট্টগ্রাম বন্দর পণ্য সরবরাহ করতে প্রস্তুত থাকলেও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া, পাইকারি বাজারগুলোতে বিক্রি কমে যাওয়া ও শ্রমিক সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত হারে পণ্য খালাস করছেন না ব্যবসায়ীরা। ফলে বন্দর সীমায় এখন বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে ভাসছে শতাধিক জাহাজ।

জানা যায়, রমজান সামনে রেখে গত ১৫ দিনে বিপুল সংখ্যক জাহাজ এসেছে চট্টগ্রাম বন্দরে। বন্দরের বহির্নোঙরে ১ এপ্রিল আসে ৪৫টি জাহাজ। এর মধ্যে দশটি জাহাজে প্রায় পাঁচ লাখ টন ভোগ্যপণ্য রয়েছে। ১ এপ্রিল বন্দরে এসে এখনও পণ্য খালাস শেষ করতে পারেনি দশটি জাহাজ। এর মধ্যে চিনি তৈরির কাঁচামাল আছে দুটি জাহাজে। ১ এপ্রিল আসা একটি জাহাজে আছে ৫৫ হাজার ৫০০ টন চিনি। একই দিন আসা আরেকটি জাহাজে আছে ৫৪ হাজার ১৪ টন চিনি। বন্দরে এখন ভোজ্যতেলের জাহাজ আছে তিনটি। ১ এপ্রিল আসা এ তিনটি জাহাজে ভোজ্যতেল আছে প্রায় দেড় লাখ টন। ১ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দরে ৪৫টি জাহাজ এলেও ২ এপ্রিল এসেছে ১৪টি জাহাজ। ৩, ৪ ও ৫ এপ্রিল এসেছে যথাক্রমে তিনটি, আটটি ও দুটি। আগামী ১৫ দিনে আরও অর্ধশত জাহাজ আসবে চট্টগ্রাম বন্দরে।

এছাড়া গত ১৮ মার্চ ৫৪ হাজার ১৪ টন ও ৬০ হাজার ৮০০ টন চিনি তৈরির কাঁচামাল নিয়ে এসেছে দুটি জাহাজ। ৬৪ হাজার ৪৩০ টন চিনি তৈরির কাঁচামাল নিয়ে আরেকটি জাহাজ এসেছে ২৪ মার্চ। ৫৯ হাজার ৯২৫ টন মটরবোঝাই একটি জাহাজ আসে ২১ মার্চ। এর আগে জানুয়ারিতে ১৩ হাজার ২২৯ টন, ফেব্রুয়ারিতে ১৪ হাজার ৭৪৬ টন ও মার্চে ১৫ হাজার ৮৬০ টন খেজুর আসে।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য খালাস করতে ব্যবসায়ীদের কোনো বাধা নেই। কিন্তু লকডাউনের কারণে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। রমজানের আগে পণ্য বেচাকেনার হিড়িক থাকে পাইকারি বাজারগুলো। বিধিনিষেধের কারণে সেখানেও বেচাকেনা সেভাবে হচ্ছে না। এছাড়া পরিবহন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় এবং গুদামে পণ্য নিতে শ্রমিক না পাওয়ায় খালাস প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হলে পণ্য খালাসের পরিমাণও বাড়বে।

২০১৯ সালে বিশ্বে করোনা ছিল না। আর ২০১৯ সালের মার্চে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চাল, ডাল, গম, তেল, ছোলা, খেজুর ও চিনি তৈরির কাঁচামালসহ ভোগ্যপণ্য আসে ১৬ লাখ ৮১ হাজার টন। ২০২০ সালে মার্চ মাস পর্যন্ত ভোগ্যপণ্য আসে ১৫ লাখ ৮৯ হাজার টন। এবারও অব্যাহত আছে আমদানির এ ধারা। এ বছরের মাস পর্যন্ত দেশে পৌঁছে গেছে প্রায় ১২ লাখ টন পণ্য।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ২০১৯ সালের মার্চে ভোজ্যতেল এসেছে ২ লাখ ৩২ হাজার টন। ২০২০ সালে মার্চে এসেছে ২ লাখ ৫০ হাজার টন। চলতি বছরের মার্চ মাসে মাসের প্রথম ১৫ দিনে ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে অর্ধেকেরও বেশি। ২০১৯ সালের মার্চে চিনি তৈরির কাঁচামাল ৩ লাখ ৫৯ হাজার টন এলেও গতবছরের মার্চ মাসে এসেছে ৪ লাখ ৫২ হাজার টন। এবছরের মার্চ মাসের ১৫ দিনেই চিনি তৈরির কাঁচামাল এসেছে প্রায় আড়াই লাখ টন। ২০১৯ সালের মার্চে এক লাখ ২ হাজার টন মটর এসেছে দেশে। গত বছর মার্চ মাসে মটর এসেছে ৮৯ হাজার ৮০০ টন। তবে এ বছর মার্চ মাস পর্যন্ত মটর এসেছে প্রায় ৩০ হাজার টন।

চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম বলেন, লকডাউনের মধ্যেও চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম পুরোদমে চলছে। রমজানের পণ্য খালাসে আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি। ব্যবসায়ীরা যাতে পণ্য খালাসে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি না হয় সেজন্য আমরা সচেষ্ট আছি। কিন্তু পরিবহন সংকটের কারণে খালাস কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে।

বিএনএনিউজ/এসজিএন