Bnanews24.com
প্রবন্ধ বিশেষ সংবাদ সম্পাদকীয়

খাদ্যে রাসায়নিক সন্ত্রাস : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

ভেজাল খাদ্য

মিজানুর রহমান মজুমদার

সম্পাদক,

বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ)

 

ভূমিকা : নিরাপদ খাদ্য হোক সাধারণ মানুষের অধিকার।খাদ্য নিরাপত্তা সঙ্কট আজ জাতীয় সমস্যার অন্যতম প্রধান বিষয়।খাদ্যের নামে প্রতিদিন আমরা খাচ্ছি বিষ। বিষযুক্ত খাবার খেয়েই আমরা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছি।আজকের বিষয় ‌‘খাদ্যে রাসায়নিক সন্ত্রাস’ : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ।বিষয়বস্তুর আলোকে আমরা প্রথমেই নিরাপদ খাদ্য বলতে কি বুঝায় সেটি জানার চেষ্টা করি। যে সব খাবার খেয়ে আমরা জীবন ধারন করে থাকি, যে সব খাদ্য জীবন বাঁচাতে সহায়ক, যে সব খাবার আমাদের সুস্থ রাখতে সহায়তা করে তাকেই আমরা নিরাপদ খাবার বলে অভিহিত করতে পারি।সন্ত্রাস এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, অতিশয় ভয় ও শঙ্কা। যদি কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠি নিজের ইচ্ছাকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে প্রকাশ্যে বা গোপনে আইন বিরুদ্ধ, অনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে অন্যের জীবনকে অনিরাপদ করে তোলে তখন তাকে সন্ত্রাস বলে অভিহিত করা হয়।  খাবারে দেহের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্যাদি মিশ্রণ করে রোগব্যাধির মাধ্যমে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমূহ অকেজো বা প্রাণহানি ঘটায় সেটি হচ্ছে খাদ্যে রাসায়নিক সন্ত্রাস। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করেছেন আগামী ২০ বছরের মধ্যে মানুষের মৃত্যুর ৭০ শতাংশ কারণ হবে খাদ্যে রাসায়নিক সন্ত্রাস।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদন দেখা যায়, স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্যানিটারি ইন্সপেক্টররা ২০১৫ সালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছয় হাজার ৩৬০টি খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করেন। তারা সেগুলো মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইপিএস) ফুড টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে পাঠান। সংগৃহীত ওই নমুনার মধ্যে এক হাজার ৯৭৮টিতে, অর্থাৎ ৩১ দশমিক ১০ শতাংশ খাদ্যপণ্যে ভেজাল পাওয়া গেছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, চালে ৪. ৫ শতাংশ ভেজাল, ডাল ও ছোলায় ৩.৭ শতাংশ ভেজাল, আটা, গম ও ভুট্টায় ২.২ শতাংশ ভেজাল, সুজিতে ১০.৪ শতাংশ ভেজাল, বেসনে ২২.৮ শতাংশ, সেমাইতে ৬৮.৫ শতাংশ ভেজাল, হলুদে ২৭.৭ শতাংশ, মরিচে ৪৪.৫ শতাংশ, ধনিয়ায় ৪৭.৬ শতাংশ, জিরায় ২ শতাংশ, গরম মসলায় ২০ শতাংশ, সরিষার তেলে ৩০.৭ শতাংশ, সয়াবিন তেলে ৬৮ শতাংশ, পামতেলে ৪৪.৫ শতাংশ, নারিকেল তেল বা অলিভ অয়েলে ৩.৫ শতাংশ ভেজাল রয়েছে। এছাড়া চা-পাতায় ২.১ শতাংশ, চিনিতে ১.৩ শতাংশ, গুড়ে ৭২.৬ শতাংশ, মধুতে ৬৬.৭ শতাংশ, ড্রিংকসে ৩.৬ শতাংশ, চাটনি বা আচারে ৩৩.৩ শতাংশ, জুসে ১০.৫ শতাংশ, লবণে ২৫.২ শতাংশ, শুঁটকিতে  ২০ শতাংশ, তরল দুধে ২০ শতাংশ, মিষ্টিতে ৯৬ শতাংশ, ঘিতে ৫০ শতাংশ ভেজাল, বিস্কুটে ২৫.৯ শতাংশ, চকলেট বা লজেন্সে ৬৩.৬ শতাংশ ভেজালের উপাদান রয়েছে।

 

কী খাচ্ছি আমরা ?

জীবনের জন্য প্রয়োজন খাদ্য। এর কোন বিকল্প নেই। প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন বিশুদ্ধ ও পুষ্টিকর খাদ্য। আর এ বিশুদ্ধ খাদ্য সুস্থ ও সমৃদ্ধশালী জাতি গঠনে একান্ত অপরিহার্য হলেও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক খাদ্যে রাসায়নিক পদার্থ মিশানোর প্রবণতা গানিতিক হারে বাড়ছে। খাদ্যের উৎস স্থান থেকে পরিবহন ও বাজারজাতের সময় রাসায়নিক মেশানো হয়। শাক-সবজি-ফলে ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যাচ্ছে, যা কলেরা ও ডায়রিয়ার জীবানু বহন করে।বিশেষ করে শশা ও কাঁচা মরিচ, টমাটো, সালাদের বিভিন্ন উপকরণ বেশি বিপদজ্জনক। কারণ এগুলো মানুষ খুব বেশি ধুয়ে খায় না। কাঁচা খায়। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত মাছ ও মূল আমিষের উৎস ডিম-মুরগিও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। পোল্ট্রিতে মোরগিকে খাওয়ানো হচ্ছে ট্যানারির বর্জ্য। একই বর্জ্য খাওয়ানো খামারের মাছকে। আবার পোল্ট্রি মুরগির বর্জ্য জমিতে  ব্যবহৃত হচ্ছে।

বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত কলা, আম, পেঁপে, কুল, পেয়ারা থেকে শুরু করে বিদেশ থেকে আমদানি করা, মাল্টা, আপেল, আঙুর, নাশপাতিসহ  প্রায় সব ফলেই মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিক। সাধারণ ফল-মূলের উজ্জ্বল রঙ ক্রেতাদের নজর কাড়ে, সেগুলো বিক্রিও হয় বেশি দামে। তাই অপরিপক্ব ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড এবং তা উজ্জ্বল বর্ণে রূপান্তর করার জন্য অধিক ক্ষার জাতীয় টেক্সটাইল রঙ দেয়া হচ্ছে। বেলের মতো কঠিন ফলও ভেজাল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। কাঁচা বেলকে আগুনে পুড়িয়ে হলদেটে করে পাকা বেল হিসাবে বিক্রি করা হচ্ছে । এখানে রাসায়নিক বিষ মিশ্রণের কয়েকটি তথ্য তুলে ধরা হলো।

গাছ থেকে বাজারে ৬ দফায় রাসায়নিক ফল

ফল পাকাতে যে বিপজ্জনক রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় তার নাম ক্যালসিয়াম কার্বাইড। এক কেজি কার্বাইডের মূল্য ৬০ টাকা। যা দিয়ে ১০ টন ফল পাকানো সম্ভব। এ হিসেবে ৫০ কেজি ফল পাকাতে মাত্র ৫ গ্রাম কার্বাইড প্রয়োজন। অথচ পাইকারি ব্যবসায়িরা ৫০ কেজি ফল পাকাতে ব্যবহার করেন ১০০ গ্রাম এর বেশি কার্বাইড। ইথাইলিন বা ক্যালসিয়াম কার্বাইড প্রয়োগের কারণে ২-৪ দিনের মধ্যেই ফল হলুদ রঙ ধারণ করে। বাস্তবে এসব ফল বাইরে পাকা মনে হলেও এর ভেতরের অংশে অপরিপক্ব থেকেই যায়। ফল দ্রুত পাকাতে ইসরিল নামের এক ধরনের হরমোন স্প্রে করা হয়।  অতিরিক্ত ইথরিল স্প্রে করায়  ফল ও সবজিকে বিষাক্ত হয়ে পড়ে। এ সব ফল ও সবজি  খাওয়ার কারণে মানবদেহে ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত কেমিক্যাল, শুরু হয় নানা অসুস্থতা, অকেজো হয়ে পড়ে দেহের বিভিন্ন অঙ্গ।অতিরিক্ত তাপে ক্যালসিয়াম কার্বাইড মেশানো ফল রাখলে তা ক্যালসিয়াম সায়ানাইডে পরিণত হয়, যা অত্যন্ত মারাত্মক বিষ এবং মানুষের তাৎক্ষণিক মৃত্যুর কারণ হতে পারে। পচনরোধ এবং দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করতে ফলে ফরমালিনসহ আরও কিছু বিষাক্ত পাথে ব্যবহার করা হচ্ছে অহরহ। ফল গাছে থাকা অবস্থা থেকে বাজারে বিক্রি করা মুহূর্ত পর্যন্ত এক একটি ফলে ছয় দফা কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাগান থেকে ফল পাড়ার পর কমপক্ষে তিনবার বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য স্প্রে করা হয়। বিশেষ করে আমে। উল্লেখ, নিম্নমানের কার্বাইড ব্যবহারের ফলে আর্সেনিক তৈরী হয়।এটি এক ধরনের বিষ। যা সেঁকো বিষ নামে পরিচিত।

বিক্রেতারা দাবি করেন, ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতেই ফলমূলে ক্ষতিকর কেমিক্যাল মেশানো হয়। উজ্জল রং, চকচকে না হলে ক্রেতারা ওই ফল সবজি কিনতে চায় না!

মাছ ও সবজিতে ফরমালিন

খাদ্যে রাসায়নিক সন্ত্রাসের সবচেয়ে আলোচিত নাম ‌‘ফরমালিন’  ফরমালিনের অন্যতম প্রধান কাজ হলো জীবাণু বিনাশ করা। ছত্রাক, ব্যকটেরিয়াসহ যে কোন ধরনের জীবাণুকে দ্রুত মেরে ফেলতে পারে ফরমালিন। মাছ তাজা রাখতে যে ফরমালিন ব্যবহার করা হয় তা আসলে মরদেহ সংরক্ষণ করতে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া বায়ুরোধী কাঁচের পাত্রে বিভিন্ন প্রাণি বা প্রাণির অংশ বিশেষ সংরক্ষণের জন্যে ফরমালিনের ব্যবহার সর্বজনস্বীকৃত। বিভিন্ন ধরনের ভ্যাকসিন সংরক্ষণের জন্যেও ফরমালিন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। অথচ ফরমালিনই ছিটানো হয় শাক-সবজি ও মাছে। হাট-বাজার, অভিজাত চেইন সপ কোথাও রাসায়নিকমুক্ত মাছ পাওয়া যায় না। ৮৫ শতাংশ মাছেই বরফের সঙ্গে বিষাক্ত ফরমালিন মেশানো হয়। কেছকি-লইট্যা থেকে রুই-কাতাল কোনটাই বাদ যাচ্ছে না। শুধু ব্যবসায়িক ফায়দা লুটতেই মাছের মতো আমিষ জাতীয় খাদ্যেকে বিপজ্জনক বিষে পরিণত করা হয়।চিংড়িতে ফরমালিনের পাশাপাশি ওজন বৃদ্ধির জন্য দেয়া হচ্ছে জেলি! পাইকারি আড়তগুলোতে মাছের স্তুপ দিয়ে তার ওপর প্রকাশ্যেই ফরমালিন মিশ্রিত পানি ছিটানো হয়।প্রশাসনের নজরদারির ভয়ে কেউ এখন আর আড়তে কেমিক্যাল মেশানোর ঝুঁকি নেয় না। মাছ আহরণ থেকেই প্রয়োগ করা হয় ফরমালিন। অপেক্ষাকৃত বড় আকারের মাছগুলোতে তাজা থাকা অবস্থায় ইনজেকশনের মাধ্যমে ফরমালিন পুশ করা হয়। আর ছোট আকারের মাছগুলো শুধু ফরমালিন মিশ্রিত পানির ড্রামে চুবিয়ে রাখা হয়।

বিস্ময়কর হলেও সত্য, আড়তগুলো ফরমালিন মিশ্রিত বরফ দ্বারা মাছের গায়ে ফরমালিন প্রয়োগ করছে অভিনব স্টাইলে। এক্ষেত্রে ফরমালিন মেশানো পানি দিয়েই বরফের পাটা বানানো হয়। সেই ফরমালিন বরফের মধ্যেই চাপা দিয়ে রাখা হয় মাছ। সেকারণে মাছের বাজারে মাছি দেখা যায় না!

এছাড়া সবজি উৎপাদনে কীটনাশক ও বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়। বেশি বিপজ্জনক কীটনাশকগুলো হলো- সিমবুন, রিনকর্ড, হেপ্টহাক্লোর, সুমিথিয়ন, ম্যালালথিয়ন, অ্যারোম্যাল ইত্যাদি। কীটনাশক প্রয়োগের অপেক্ষমান কাল কোনোটির ৩ দিন, কোনোটির ৭ দিন, কোনোটির ২১ দিন, এমনকি কোনোটির ৬ মাস পর্যন্ত হয়ে থাকে। কিন্তু কৃষকরা তা মানেন না কারণ কীটনাশক প্রয়োগের পর পর সবজি খুব তাজা দেখায়, তাই অধিক লাভের আশায় তারা দ্রুত বিক্রি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রয়োজনের তুলনায় ৬ গুণের অধিক কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়।

অস্বাস্থ্যকর, নোংরা বেকারি ও মিষ্টি সামগ্রী

যত্রতত্র গড়ে উঠেছে হাজার হাজার বেকারি ও মিষ্টি জাতীয় খাদ্য প্রস্তত করার কারখানা।পর্যাপ্ত আলো বাতাসের ব্যবস্থা নেই, গরমে ঘামে চুপসানো অবস্থায় খালি গায়ে বেকারি খাদ্য ও মিষ্টি প্রস্তুতকারি  শ্রমিকরা আটা-ময়দা দলিত মথিত করে। প্রতিটি কারখানার ভেতরে-বাইরে ময়লা-আবর্জনাযুক্ত নোংরা পরিবেশ। ময়লার স্তুপ। দুর্গন্ধের ছড়াছড়ি। মশা-মাছির ভনভন আর একাধিক কাঁচা-পাকা টয়লেটের অবস্থা। সেখানেই তৈরি হয় ব্রেড, বিস্কুট, সেমাই, কেকসহ নানা লোভনীয় খাদ্যপণ্য। উৎপাদন ব্যয় কমাতে এসব বেকারির খাদ্যপণ্যে ভেজাল আটা, ময়দা, ডালডা, তেল, পচা ডিমসহ নিম্নমানের বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হয়। উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্য সতেজ রাখতে ট্যালো, ফ্যাটি এসিড ও ইমউসাইল্টিং, টেক্সটাইল রঙসহ নানা কেমিক্যালও ব্যবহার করতে দেখা যায়। নষ্ট হওয়া অবিক্রিত মিষ্টি ফেলে দেয়া হয় না। নষ্ট হয়ে যাওয়া টক মিষ্টি গরম সিরায় চুবিয়ে আবার বিক্রি করা হয়। অধিকাংশ মিষ্টিতেই কোনো দুগ্ধজাত উপকরণ নেই। মিষ্টিতে ১০ ভাগ মিল্ক ফ্যাট থাকার কথা বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে এটি মানা হয় না। দুধ থেকে মিল্ক ফ্যাট তুলে তাতে ডালডা ও সয়াবিন মিশিয়ে দেয়া হয়। নিম্নমানের গুঁড়া দুধ, জমাটবাঁধা দুধের ক্রেতা মিষ্টি ব্যবসায়ীরা। আটককৃত বা ফেরত দেয়া তেজস্ক্রিয় গুঁড়া দুধও শেষ পর্যন্ত চলে যায় মিষ্টান্ন হয়ে মানুষের পেটে। কালোজাম ঘিয়ে ভাজার কথা থাকলেও তা ভাজা হয় পামঅয়েলে। শুকনা মিষ্টিতে ছানার চেয়ে আটার পরিমাণই বেশি। অনুসন্ধানে দেখা যায় মিষ্টিতে সিনথেটিক বা কৃত্রিম রঙ মেশানো হয়। এসব মিষ্টি খেলে কিডনি ক্যান্সার হতে পারে।

এনার্জি ড্রিংক নাকি তরল বিষ

এনার্জি ড্রিংকস বলতে কোনো পণ্যসামগ্রী উৎপাদন বা বাজারজাতের জন্য বিএসটিআই কোনো রকম অনুমোদন দেয় না। তা সত্ত্বেও অনুমোদন পাওয়ার জন্য একটি আবেদনপত্র বিএসটিআই কার্যালয়ে জমা দিয়েই কারখানায় দেদার উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। যে কোনো ড্রিংকস উৎপাদন ও বোতলজাতের ক্ষেত্রে  প্রথম শর্তই হচ্ছে অটো মেশিনে সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করা। নির্ধারিত ১২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তরল উপকরণগুলো ফুটিয়ে নিয়ে তা রিফাইন করার মাধ্যমে সংমিশ্রণ ঘটানো। বোতলজাত করা থেকে মুখ লাগানো পর্যন্ত সবকিছুই অটো মেশিনে ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু কথিত জুস কারখানাগুলোতে সবকিছুই চালানো হচ্ছে হাতুড়ে পদ্ধতিতে। মেশানো হচ্ছে,ফ্রিজাররভেটিভ। ফলের কোন চিহ্নই নেই; আছে শুধু ফলের কেমিক্যাল নির্যাস। এসব এনার্জি ড্রিংক এক ধরনের তরল বিষ। টেলিভিশন, রেডিও ও সংবাদপত্রে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপণ দিয়ে কতিপয় এনার্জি ড্রিংক উৎপাদনকারি প্রতিষ্ঠান কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষ এনার্জি ড্রিংক এর নামে টাকা দিয়ে বিষ পান করছে!

 রঙ, ইট ও কাঠের গুঁড়া সুগন্ধি মসলায়

এক শ্রেণির ব্যবসায়ি কাপড়ে ব্যবহৃত বিষাক্ত রঙ, ইটের গুঁড়া মরিচের সঙ্গে  মেশাচ্ছেন। হলুদে দেয়া হচ্ছে মটর ডাল, ধনিয়ায় সমিলের কাঠের গুঁড়া ও পোস্তাদানায় ব্যবহৃত হচ্ছে সুজি। মসলার রঙ আকর্ষণীয় করতে বিশেষ ধরনের কেমিক্যাল রঙ মেশানো হচ্ছে। এর কারণে গুঁড়া মরিচের ঝাল বাড়ে এবং হলুদের রং আরও গাঢ় হয়। মসলার ওজন বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে ধানের ভুসি। অসাধু চক্র প্রথমে গোপন কারখানায় ভেজাল মসলা উৎপাদন করে। পরে তা প্যাকেটজাত করে বাজারে সরবরাহ করে। চক্রটি কিছু প্যাকেট ছাড়া, কিছু সাধারণ প্যাকেটে এবং কিছু নামিদামি কোম্পানির লেভেল লাগিয়ে এ সব মসলাগুলো বিক্রি করেন।ক্রেতারা তা দিয়ে রান্না করে খাচ্ছে খাবার। যা পরবর্তীতে বিভিন্ন জটিল রোগের জন্ম দিচ্ছে।

মুড়িতে  ইউরিয়া সার

মুড়ি। চাল ভাজার রূপান্তর। আদিকাল থেকে গ্রাম থেকে নগরে লোকজনের কাছে পরিচিতি একটি নাম।চিকিৎসকরা প্রায় মুড়ি খাওয়ার পরামর্শ দেন, বিশেষ করে ডায়বেটিক রোগে আক্রান্তদের। রমজানে ইফতারের বাঙালির প্রধান অনুসঙ্গ ছোলা-মুড়ি। এ ছোলামুড়ি ছাড়া ইফতার যেন জমেই না! আর মুড়িতে লবণের বদলে মেশানো হচ্ছে ফসল উৎপাদনের সেই ইউরিয়া সার। কারখানায় ভাজা মুড়ির সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে আড়তদারদের প্ররোচনায় গ্রামের সহজ সরল বউ-ঝিরাও মুড়িতে মেশাচ্ছেন ইউরিয়া সার। এক কেজি ইউরিয়ায় প্রায় ১৬০ কেজি মুড়ি ভাজা হয়। গবেষনায় দেখা গেছে ৫০ কেজি চাল থেকে ৪৪ কেজি মুড়ি পাওয়া যায়। এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে মুড়ি ভাজার আগে মুড়িতে ইউরিয়া মেশানো হয়। এতে মুড়ির ওজন যেমন বেড়ে যায়। মুড়ি ফুলকো ও ধবধবে সাদা হয়। এক শতাংশ ইউরিয়া দ্রবণ দিয়ে মুড়ি ভাজলে মুড়িতে ৭০%-৭৫% ইউরিয়া চলে আসে। দিনে ৩০০-৪০০ গ্রাম মুড়ি খেলে ২১০০-২৪০০ মিলিগ্রাম ইউরিয়া শরীরে ঢোকে। এতে শুধু কিডনি নয় লিভারে বড় ধরনের ক্ষতি হয়।

নকল দুধ

এক শ্রেণীর ব্যবসায়ি নকল দুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করছেন। এ ধরনের দুধের জন্য কোনো গাভীর প্রয়োজন পড়ে না, কষ্ট করে গড়ে তুলতে হয় না গবাদি পশুর খামারও। ছানার পানির সঙ্গে কেমিক্যাল মিশিয়ে সহজেই তৈরি করা হচ্ছে এমন বিষ। পরে খাঁটি দুধ হিসেবে বাজারজাত করা হচ্ছে সারাদেশে। নকল দুধ তৈরিতে ছানার ফেলনা পানি, খাবার পানি, থাইসোডা, পার অক্সাইড, ময়দা, ভাতের মাড় ও চিনি মিশিয়ে আগুনে ফোটানো হয় এবং পরে কাটিং অয়েল ও এসেন্স মিশিয়ে দুধের সুবাস দেয়া হয়। পানি গরম করে তাতে এরারুট মিশিয়ে সহজেই নকল দুধ তৈরি করা যায়। দীর্ঘ সময় সতেজ রাখতে এতে মেশানো হচ্ছে ফরমালিন। নকল দুধের চালান পাঠানো হয়, সরকারের ব্যবস্থাপনায় থাকা মিল্ক ভিটাসহ বিভিন্ন ডেইরি প্রজেক্টে। পরে ওই প্রজেক্টের প্লাস্টিক মোড়কে প্যাকেটজাত দুধ হিসেবে বাজারে বাজারে পৌঁছে যায়।

চিকিৎসকরা বলছেন, কৃত্রিম উপায়ে তৈরি নকল দুধ পানে পেটের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। রাসায়নিক মিশ্রিত এসব নকল দুধ পানের কারণে মানবদেহে ডায়রিয়া, জটিল পেটের পীড়া, কিডনি ও লিভার রোগে আক্রান্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরো মারাত্মক।

বোতলজাত পানির উৎস ওয়াসা ও নলকূপ

জীবনধারণের জন্য সবচেয়ে জরুরি ‘পানি’। এটিও নিরাপদ থাকছে না। যত্রতত্র  কারখানা বানিয়ে ওয়াসা ও নলকূপের পানি বিশুদ্ধকরণ ছাড়া বোতলজাত করেই বিশুদ্ধ ড্রিংকিং ওয়াটার বলে বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। আমরা অনেকে এ ড্রিংকিং ওয়াটার’কে ‘মিনারেল ওয়াটার’ বা খনিজ পানি বলে থাকি। সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশে কোন মিনারেল ওয়াটার  প্রস্তুতকারি  প্রতিষ্ঠান নেই। কিছু প্রতিষ্ঠান রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রণ করে পানিকে বিশুদ্ধ করলেও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান ওয়াসার সরবরাহ লাইনের পানি ছেঁকে বড় প্লাস্টিক জার ভরে বাজারজাত করছে। অল্প পুঁজি অধিক রুজির কারণে জমে উঠেছে দূষিত পানির রমরমা ব্যবসা। মাত্র ১৯টি কোম্পানি অনুমোদন নিলেও দেশজুড়ে বোতলজাত পানির জার সরবরাহকারি  প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। এর মধ্যে একটিরও বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নেই।

মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল হলো খাদ্য। সংবিধানের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে খাদ্যকে মৌলিক উপকরণ ও ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদে খাদ্যকে জীবনের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্ত খাদ্যে ভেজালের পরিমাণ এতটাই বেড়ে গেছে যে, তৈরি অথবা কাঁচা খাদ্য কোনোটির ওপরই মানুষ আর আস্থা রাখতে পারছে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়। এ কারণে প্রতিবছর মারা যায় চার লাখ ৪২ হাজার মানুষ। এছাড়া, ৫ বছরের চেয়ে কম বয়সী শিশুদের ৪৩ শতাংশই খাবারজনিত রোগে আক্রান্ত হয়।  প্রতিবছর  প্রাণ হারায় ১ লাখ ২৫ হাজার শিশু। ১৯৯৪ সালে শুধু  যুক্তরাষ্ট্রেই স্যালমোনেলা জীবাণু বহনকারী আইসক্রিম খেয়েই লাখ ২৪ হাজার মানুষ রোগে আক্রান্ত  হয়। ২০০৮ সালে চীনে তৈরি কয়েকটি কোম্পানির গুঁড়ো দুধ পান করে বহু শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওই দুধে মেলামাইনের মাত্রা বেশি ছিল। বাংলাদেশও এ দুধ আমদানির করা হয়। পরীক্ষায় মেলামাইন পাওয়ার পর সরকার ওই সব দুধসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গুড়ো দুধ আমদানি নিষিদ্ধ করে।

আমেরিকার এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন এজেন্সির প্রতিবেদনে  প্রকাশ, ফরমালিন ফুসফুস ও গলবিল এলাকায় ক্যান্সার সৃষ্টি করে। টেক্সটাইল কালারগুলো খাদ্য ও পানীয়ের সঙ্গে মিশে শরীরে প্রবেশের পর এমন কোনো অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ নেই যার ক্ষতি করে না। তবে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান ক্ষতিগুলো হয় মানবদেহের লিভার, কিডনি, হৃৎপিন্ড ও অস্থিমজ্জার। ধীরে ধীরে এগুলো নষ্ট হয়ে যায়। শিশু ও বৃদ্ধদের বেলায় নষ্ট হয় তাড়াতাড়ি। ইউরিয়া ও হাইড্রোজ হচ্ছে এক ধরনের ক্ষার। এগুলো পেটে গেলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে পেপটিন এসিড তৈরি করে যা ক্ষুদামন্দা, খাবারে অরুচি, বৃহদান্ত ও ক্ষুদ্রান্তে   প্রদাহসহ নানা রকম শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি করে।

খাদ্যে রাসায়নিক ও দুষিত পানির কারণেই বাংলাদেশে বিভিন্ন রকমের পানিবাহিত রোগ, ক্যান্সার, লিভার সিরোসিস, কিডনি ফেলিউর, হৃদযন্ত্রের অসুখ, হাঁপানি এগুলো অনেক বেড়ে যাচ্ছে। শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ লোক ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার। কিডনি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ। এ ছাড়া গর্ভবতী মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা দেশে প্রায় ১৫ লাখ। কেমিক্যাল মিশ্রিত বা ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে মানব দেহে যে উপসর্গগুলো দেখা যায় সেগুলো হলো- পেটব্যথাসহ বমি হওয়া, মাথাঘোরা, মল পাতলা বা হজম বিঘ্নিত মল, শরীরে ঘাম বেশি হওয়া এবং দুর্বল হয়ে যাওয়া, পালস্ রেট কমে বা বেড়ে যেতে পারে। বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদনের জন্য কীটনাশক ব্যবহার করার ফলে এ খাবারগুলোতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিষক্রিয়া কার্যকর থাকে। যা রান্না করার পরও অটুট থাকে।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নিধিরাম সর্দার

সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদ খাদ্য নিরাপত্তার কথা উল্লেখ রয়েছে। বিলম্বে হলেও বর্তমান আওয়ামী সরকার সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন তৈরি করে। ২০১৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর এই আইনের আওতায় ২ ফেব্রুয়ারি গঠন করা হয় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। একটা সময় শুধু প্রচার আর বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করা ছিলো নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চোখে পড়ার মত কার্যক্রম। আমলাতাতান্ত্রিক মারপ্যাচে পড়ে সংস্থাটি মাঠ পর্যায়ে কোন অভিযান পরিচালনা করতে পারেনি। ২০১৮ সালে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনার জন্য ম্যাজিস্ট্রেট পায় (বিএফএসএ)। মাত্র তিনজন ম্যাজিস্ট্রেট ঢাকা শহরে বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযানে নামে। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। সম্প্রতি হাইকোর্টের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে নড়েচড়ে বসেছে সংস্থাটি। তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে। লোকবল নিয়োগের বিজ্ঞাপন দিয়েছে। অবাক বিষয় হচ্ছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত সরকারি এ সংস্থটি ঢাকা ছাড়া দেশের অন্য কোথাও এটি শাখাও খুলতে পারেনি। ফলে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এখনও শুধু শ্লোগানের মধ্য সীমাবদ্ধ রয়েছে।

অথচ সংস্থাটি তাদের ওয়েবসাইটে ভূমিকায় লিখেছে, আইনের আলোকে এবং গৃহীত উৎকৃষ্ট পন্থায় খাবার সব সময় এবং সকলের জন্য সর্বোচ্চ সুরক্ষায় ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পৌঁছানো এ কর্তৃপক্ষের অন্যতম দায়িত্ব। জনগণের  প্রত্যাশা এবং বর্তমান সরকারের সদিচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কর্তৃপক্ষ তার সকল সামর্থ্য নিয়ে এবং ঐকান্তিকতার সাথে নিরলস  প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশে একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করে বাংলাদেশ সরকারের রূপকল্প ২০২১ অর্জনে সকলের আন্তরিক সহযোগীতা কামনা করেন নিরাপদ খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ সরকারের রূপকল্প ২০২১ এর বাকি মাত্র দু’বছর। এ অল্প সময়ে কী নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব?

প্রতিহত করতে হবে খাদ্যে রাসায়নিক সন্ত্রাস

খাবারে ভেজাল বা রাসায়িক মিশ্রণ এখন কোনো গোপনীয় ব্যাপার নয়। মহাসমারোহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্য মরণব্যাধির নানা ধরনের বিষাক্ত পদার্থ মেশানো হচ্ছে। মাছ ও দুধে ফরমালিন, ফলে কার্বাইড, জিলাপি-চানাচুরে মবিল, বিস্কুট, আইসক্রিম, কোল্ড ড্রিংসে, জুস, সেমাই, নুডলস, মিষ্টিতে, আচারে টেক্সটাইল, লেদার রঙ ও ডিডিটি, চিনিতে হাইড্রোজ, মুড়িতে ইউরিয়া-হাইড্রোজ, হলুদ, জিলিপি সন্দেশে লাড্ডুতে মেটানিল ইয়েলোসা ব্যাপকভাবে কমিয়ে ফেলতে পারে শুক্রানুর সংখ্যা। শুকনো লঙ্কার গুঁড়ায় লেড ক্রোমেটের মতো বিষ মিশানো হয়, যার কারণে হতে পারে অ্যানিমিয়া, মায়েদের গর্ভপাত। লেড ক্রোমেট একটানা ব্যবহারে ব্রেইন স্ট্রোকের পাশাপাশি পক্ষাঘাত হতে পারে।

আমাদের করণীয় ও প্রস্তাবনা

১. মানুষকে নৈতিকভাবে উদ্বুদ্ধ করে রাসায়নিক ব্যবহার সীমিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা

২. পোকা দমন ও রোগ প্রতিরোধে বালাই নাশকের ব্যবহার নিরূৎসাহিত করে প্রাকৃতিক উপায়ে পোকা দমন ও রোগ প্রতিরোধ করা;

৩. যত্রতত্র ফরমালিন আমদানি, বাজারজাত, বিক্রিতে বাধা নিষেধ ও নজরদারি জোরদার করা

৪. ব্যবসায়ী, আড়তদার ও ক্রেতা পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে করা

৫. গণমাধ্যম সমূহে ভেজাল বিরোধী প্রচারণা জোরদার করা

৬. নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও বিএসটিআই এর কার্যক্রম উপজেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা

৭. আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও খাদ্য অধিদপ্তরের সমন্বয়ে বিশেষ সেল গঠন এবং সারা বছর অভিযান পরিচালনা করা

৮. অস্বাস্থ্যকর, নোংরা পরিবেশে খাদ্য উৎপাদনকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেওয়া ও মালিককে শাস্তির আওতায় আনা

৯. ফুটপাতে বা দোকানের সামনে খোলা খাদ্য প্রস্তুত ও বিক্রয় নিষিদ্ধ করা

৯. প্রচলিত আইন সংশোধন করে শাস্তির বিধান যাবতজীবন বা মৃত্যদন্ড করা

১০. খাদ্য রাসায়নিক মিশ্রণ ও ভেজালকারিদের মামলায় কোন আইনজীবী যুক্ত না হওয়া

১১. সময়কাল মেনে ফল ফসল খাওয়া

১২. ফল মূল খাওয়ার আগে লবণ মিশ্রিত হালকা গরম পানিতে ১৫-২০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে আবার ভাল পানি দিয়ে ধুয়ে খাওয়া

 

উপসংহার:

আইন শৃংঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়েও খাদ্যে রাসায়নিক মিশ্রণের লাগাম টেনে ধরতে পারছে না। এ প্রেক্ষাপটে র‌্যাব এর মহাপরিচালক, খাদ্যমন্ত্রী, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে চলমান আইন সংশোধন করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করার  প্রস্তাব করেছেন। খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক মেশানো ঠেকাতে হাইকোর্ট জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করার নির্দেশনা দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৫২টি খাদ্যদ্রব্য বাজারজাত, উৎপাদন নিষিদ্ধ করেছে হাইকোর্ট। বিএসটিআই বাতিল ও স্থগিত করেছে অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের সনদ। জেল-জরিমানাতো আছেই। তবুও থামছে না খাদ্যে রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণ ও নোংরা পরিবেশে খাদ্য উৎপাদন-সংরক্ষণ।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ ও গুণগতমান পরীক্ষার জন্য অন রোড ভেহিক্যাল (ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগার পরিবহন) চালু করা অত্যাবশ্যক। এটি ফাস্টফুড দোকান, হোটেলে রান্না করা খাবার, শাক সবজি, মাছ, মাংস, দুধসহ যাবতীয় খাদ্যের গুণমান যাচাই করা যাবে ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগার ভ্যানে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, বিএসটিআই, ভোক্তা অধিদপ্তর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিজেদের ম্যাজিষ্ট্রেট,স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মী,চিকিৎসক নিয়ে এই চলমান পরীক্ষাগার চালু করতে পারে। ফুড সেফটি অন হুইল নামক অন রোড ভেহিক্যাল আমদানি করতে প্রায় খরচ পড়বে ৪০ লাখ টাকা। ভারত, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে এ ধরনের অত্যাধুনিক ফুড টেস্টিং ভ্যান ব্যবস্থা চালু রয়েছে। শুধু পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।

আশার কথা হচ্ছে, বিগত ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ঢাকাস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে নিরাপদ খাদ্য দিবস অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, খাদ্যে ভেজাল দেয়া এক রকমের দুর্নীতি । কাজেই ভেজালের বিরুদ্ধে যে অভিযান চলছে, সেটি অব্যাহত থাকবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাদ্যে ভেজাল দেয়া আমাদের দেশের কিছু ব্যবসায়ির চরিত্রগত বদঅভ্যাস। এটি বন্ধ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নিরাপদ খাদ্যের বাংলাদেশ গড়তে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কিন্তু তার একার পক্ষে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দেশের সব শ্রেণি পেশার মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। তখনি বন্ধ হবে খাদ্যে রাসায়নিক সন্ত্রাস, হবে নিরাপদ খাদ্যের বাংলাদেশ।

খোদা হাফেজ

//////////////////////////////////////////////////////////////////

তথ্য সূত্র:

১. জন স্বাস্থ্য ইউনিস্টিটিউট পাবলিক হেলথ ল্যবরেটারির বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৮

২. সাদ্দিফ অভি, কতটুকু খাদ্য নিরাপদ, বাংলা টিব্রিউন ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

৩. ড.ইয়াসমীন আরা, ভেজাল খাদ্য ও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে বাংলাদেশ- ১৫ মার্চ ২০১৯ দৈনিক ইত্তেফাক

৪. শিব রঞ্জন দাশ, খাদ্য দূষণের মহামারি, সাপ্তাহিক একতা ১২ মে ২০১৯

৫. ড. মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার, খাদ্যে ভেজাল ও এর ক্ষতিকারক প্রভাব, কৃষি কথা,

কৃষি তথ্য সার্ভিস, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

৬. ড. আখতারুজ্জামান, ফল ফসল ও কৃষিতে রাসায়নিক- এর ফেইজবুক

৭. নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ওয়েবসাইট

৮. ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর ওয়েব সাইট

৯. বিএসটিআই ওয়েবসাইট