বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছতেই জেল হত্যা

।।মিজানুর রহমান মজুমদার।।

আরো পড়ুন

কাতার ফুটবল বিশ্বকাপে সেমিতে যাওয়ার লড়াই

বাংলাদেশের সিরিজ জয়, আনন্দবাজার যা লিখেছে

‘রাখিব নিরাপদ-দেখাব আলোর পথ’ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশপথে এমন স্লোগান লেখা রয়েছে। যে কারাগারকে মনে করা হয় সবচেয়ে নিরাপদ স্থান, সেই কারাগারও নিরাপদ নয়! ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ৩ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী ও চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এএইচএম কামারুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

বাংলাদেশের জাতীয় চার নেতার ছবি
বাংলাদেশের জাতীয় চার নেতা

পৃথিবীর ইতিহাসে কারাগারে এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড দ্বিতীয়টা নেই। এর আগে ১৫ আগস্টের পর এই চার জাতীয় নেতাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। চার নেতার সন্তানরা হারিয়েছেন তাদের পিতাকে। দেশও হারিয়েছে তার সেরা সন্তানদের।

‘বাংলাদেশ এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ গ্রন্থে প্রখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থ’নী মাসকারেনহাস লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পরপরেই বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রী সভার বিশ্বাসঘাতক সদস্য হিসেবে পরিচিত তৎকালীন স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ এবং বঙ্গবন্ধুর দুই খুনি কর্নেল (বহিষ্কৃত) সৈয়দ ফারুক রহমান এবং লে. কর্নেল (বহিস্কৃত) খন্দকার আব্দুর রশীদ জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যার এ পরিকল্পনা করেন। এ জন্য ৫ জনের একটি ঘাতক দলও গঠন করা হয়। দলের প্রধান ছিল রিসালদার মুসলেহ উদ্দিন। সে ছিল ফারুকের সবচেয়ে আস্থাভাজন। ১৫ আগস্ট শেখ মনির বাসভবনে যে ঘাতক দলটি হত্যাযজ্ঞ চালায় সেই দলটির নেতৃত্ব দিয়েছিল মুসলেহ উদ্দিন।

চার জাতীয় নেতাকে হত্যার পরিকল্পনাটি এমনভাবে নেয়া হয়েছিল যাতে পাল্টা অভ্যুথান ঘটার সাথে সাথে আপনা আপনি এটি কার্যকর হয়। পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট ঘাতক দলের প্রতি নির্দেশ ছিল পাল্টা অভ্যুথান ঘটার সাথে সাথে কোন নির্দেশের অপেক্ষায় না থেকে কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে তারা জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করবে। ’৭৫-এর ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ পাল্টা অভ্যুথান ঘটানোর পরেই কেন্দ্রীয় কারাগারে এই জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। এর আগে খুনি খন্দকার মোশতাক আহমদ হত্যাকাণ্ডের আগে টেলিফোনে জেলারকে সেনা সদস্যদের কারাগারে প্রবেশ এবং তাদের কাজে বাধা না দেয়ার নির্দেশ দেন। ঘাতক দলের প্রধান ছিল ফারুকের সবচেয়ে আস্থাভাজন রিসালদার মুসলেহ উদ্দিন। সে ১৫ আগস্ট শেখ মনির বাসভবনে যে ঘাতক দলটি হত্যাযজ্ঞ চালায় সেই দলটির নেতৃত্ব দিয়েছিল।

ঘাতকচক্রের উদ্দেশ্য ছিল দেশে অগণতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের উত্থানের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের চেতনা থেকে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে মুছে ফেলা। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোকে ভেঙে আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতাকে ভূলুণ্ঠিত করা। দেশকে রাজনৈতিক মেধা ও নেতৃত্বহীন করা।

উল্লেখ, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার পর পরই পাকিস্তানের সামরিক জান্তা জাতির জনককে তাঁর ঐতিহাসিক ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে। পরে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময় সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের সমধিক পরিচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দিন আহমেদ একটি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় কোটি কোটি বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর অপর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এএইচএম কামারুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে নীতি ও কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ঘাতকদের ভয় ছিল এ চার নেতা বেঁচে থাকলে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামীলীগকে দমিয়ে রাখা যাবে না। সেই ভয় থেকে তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শত্রুরা এ দেশের স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি। পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি ওই চক্রটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করে। এরপর খুনি মোশতাকের নেতৃত্বে স্বাধীনতাবিরোধী ওই চক্রটি এ দেশকে পাকিস্তান বানানোর ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। বাংলাদেশ যাতে ঘুরে দাঁড়িয়ে আর এগোতে না পারে, স্বাধীনতা যাতে ব্যর্থ হয়, বাংলাদেশ যাতে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয় সেই চক্রান্ত করে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র।

ঘাতকদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি। ২১ বছর পর নানা ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আবারও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। প্রতিষ্ঠা করেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি। বাংলাদেশকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়। হয়ে উঠেছে বিশ্বের বিস্ময়!