22 C
আবহাওয়া
৯:১৩ অপরাহ্ণ - ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৪
Bnanews24.com
Home » তিস্তা: চীন চায়, ভারত কেন চায় না?

তিস্তা: চীন চায়, ভারত কেন চায় না?


।।শামীমা চৌধুরী শাম্মী।।

বিএনএ : হিমালয়ে উৎপত্তির পর তিস্তা নদী ভারতের সিকিম এবং পশ্চিমবঙ্গের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। দুই দেশের অর্থনীতির জন্যই এ নদী বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু তিস্তা নদী ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই নদীর জল প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ভারত। নানা-চড়াই–উৎরাই রাজনৈতিক কূটনীতি চালিয়ে ভারতকে রাজি করিয়েছিল বাংলাদেশ। ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর ঢাকা সফরের সময় তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেঁকে বসার কারণে তিস্তার পানি বণ্টন ঝুলে যায়।

২০১১ সাল থেকে ২০২৪ সাল। দীর্ঘ এই তের বছরে তিস্তার জল অনেক গড়িয়েছে। কিন্তু চীন ভারতের ভূ-রাজনীতির কবলে পড়ে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল গ্রীষ্মের খরায় পুড়ছে, বর্ষায় ডুবছে। ফলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খাদ্যাভাব দেখা দিচ্ছে প্রতিবছর।

২০১১ সাল থেকে ঝুলে থাকা বাংলাদেশ-ভারত তিস্তা চুক্তি নিয়ে ভারতের লোকসভার সংসদীয় কমিটিতে সর্বদলীয় একটি সভা হয়েছে। ওই সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ভারতের পক্ষ থেকে তিস্তা চুক্তির নতুন প্রস্তাব উত্থাপনের কথা জানা যাচ্ছে, যেখানে বাতিল হয়ে যাওয়া ২০১১ সালের চুক্তির ৫০-৫০ শতাংশ পানির হিস্যা বাংলাদেশ ও ভারতের ভাগে দেওয়ার পরিবর্তে এখন ৫৫ শতাংশ ভারত এবং ৪৫ শতাংশ পানি বাংলাদেশকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই পর্যন্তই।

২০২৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শেখ হাসিনার বৈঠকে তিস্তা চুক্তির বিষয়টি আলোচনার অ্যাজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি।

উপরন্তু গজলডোবা বাঁধের উজানে পশ্চিমবঙ্গ সরকার আরও দুটি খাল খননের কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ সীমান্তে ঢোকার আগেই তিস্তার পানি যে আরও অনেক কমে যাবে, সেটাও নিশ্চিতভাবে বলা যায়। এই খাল খননের মাধ্যমে ভারত তিস্তা চুক্তির কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এ অবস্থায় তিস্তা চুক্তি হলেও বাংলাদেশের খুব বেশি লাভ হবে না।
ফলে বাংলাদেশের চৌকষ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় তিস্তা নদীকে ঘিরে তিস্তা প্রকল্প গ্রহণ করেন। প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্পটি চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ভারতের প্রবল আপত্তির মুখে সেটা অনুমোদনের জন্য একনেকে উপস্থাপন করা হচ্ছে না।

২০২৩ সালের ২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রংপুরের এক মহাসমাবেশে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন।

প্রায় ৬ বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রকল্প প্রণয়নের জন্য চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। যাতে ‘চীনের দুঃখ’ হিসেবে একদা বিশ্বের বহুল পরিচিত হোয়াংহো নদী বা ইয়েলো রিভারকে চীন যেভাবে ‘চীনের আশীর্বাদে’ পরিণত করেছে, ওই একইভাবে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর জনগণের জন্য প্রতিবছর সর্বনাশ ডেকে আনা তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনাকেও একটি বহুমুখী প্রকল্পের মাধ্যমে যেনো আধুনিকায়ন করা যায়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে সাড়া দিয়ে সম্পূর্ণ চীনা অর্থায়নে প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পর প্রকল্প-প্রস্তাবটি চীনের পক্ষ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

একই সঙ্গে চীন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়, বাংলাদেশও ওই প্রস্তাব গ্রহণ করে। প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্পে বাংলাদেশের সীমানার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীর ১১৫ কিলোমিটারে ব্যাপক খনন চালিয়ে নদীর মাঝখানের গভীরতাকে ১০ মিটারে বাড়িয়ে ফেলা হবে এবং নদীর প্রশস্ততাকে ব্যাপকভাবে কমিয়ে ফেলা হবে। একই সঙ্গে রিভার ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে ব্যাপক ভূমি উদ্ধার করে চাষাবাদের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। নদীর দুই তীর বরাবর ১১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের চার লেনের সড়ক নির্মাণ করা হবে। উপযুক্ত স্থানে বেশ কয়েকটি ব্যারেজ-কাম-রোড নির্মাণ করে নদীর দুই তীরের যোগাযোগ নিশ্চিত করা হবে।

পাশাপাশি বর্ষাকালে প্রবাহিত নদীর বিপুল উদ্বৃত্ত জলরাশি সংরক্ষণের জন্য জলাধার নির্মাণ করে, সেখানে সেচের জন্য খাল খননের মাধ্যমে নদীর উভয় তীরের এলাকার চাষযোগ্য জমিতে শুষ্ক মৌসুমে সেচের ব্যবস্থা করা হবে। নদীর উভয় তীরের সড়কের পাশে ব্যাপক শিল্পায়ন ও নগরায়ণের সুবিধা গড়ে তোলা হবে।
প্রথম থেকেই এই প্রকল্পে বাগড়া দিচ্ছে ভারত। ভারত এই প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণকে তাদের দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক ঘোষণা করে বাংলাদেশকে প্রকল্প বাতিল করার জন্য সরাসরি চাপ দিয়ে চলেছে। ভারতের দাবি, তাদের শিলিগুড়ি করিডরের ‘চিকেন-নেকের’ এত কাছাকাছি তিস্তা প্রকল্পে কয়েক শ বা হাজারের বেশি চীনা নাগরিকের অবস্থানকে ভারত মেনে নেবে না।

বাংলাদেশকে এই প্রকল্প থেকে সরে আসতে বলা হচ্ছে। যে এলাকা দিয়ে তিস্তা নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, সেখান থেকে ‘শিলিগুড়ি চিকেন-নেক করিডোর’ বেশ খানিকটা দূরে। তিস্তা নদীর দক্ষিণ-পূর্বদিকের ভাটিতে যতই প্রকল্পের কাজ এগোবে, ততই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকা থেকে প্রকল্প এলাকার দূরত্ব বাড়তে থাকবে।
ভারতের নিরাপত্তা-সম্পর্কীয় উদ্বেগকে আমলে নিয়ে সীমান্ত-নিকটবর্তী ১৬ কিলোমিটার নদীর খনন বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে করবে। তাতেও সায় দিচ্ছে না ভারত।

শেখ হাসিনার সরকার টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত প্রকল্পটির ব্যাপারে আবারো আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সাথে এক বৈঠকের পর রাষ্ট্রদূত সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ চাইলে তিস্তা প্রকল্পের কাজ শুরু করার বিষয়ে তৈরি আছে চীন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের দিক থেকে প্রকল্পের প্রস্তাব পেলে চীন সহযোগিতা দেবে।

বিএনএনিউজ/এইচ.এম/ হাসনা

Loading


শিরোনাম বিএনএ