বিএনএ, ঢাকা: যে অপরাধী একসময় পুরো চট্টগ্রাম কাঁপিয়ে বেড়াতো, সেই মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন এখন পুলিশের খাঁচায় বন্দী! পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি গলি থেকে যশোর সীমান্ত—কী ঘটেছিল সেই রুদ্ধশ্বাস রাতে? ফটিকছড়ি উপজেলার অজোপাড়ার ছিচকে চোর মোবারক হোসেন কখন কীভাবে ডেভিড ইমন নামধারণ করে আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রক ওঠলেন? যা সিনেমার কাহিনীকেও হার মানায়। আজ শুনবো তার সেই শিউরে ওঠা অপরাধের কাহিনী।
ঘটনাটি ঘটেছিল গত ১৩ই জুলাই, চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার থানার চন্দনপুরা অ্যাকসেস রোডের মরিয়ম হাইটস ভবনে। সেখানে ডিডিএন নামে একটি নামকরা ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ঘটনার ঠিক দুদিন আগে, অর্থাৎ ১১ জুলাই, প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারীর হোয়াটসঅ্যাপে আসে একটি কল। ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসে “আমি ডেভিড ইমন বলছি। এককালীন ২ কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হবে!” ব্যবসায়ী যখন এই বিপুল পরিমাণ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানান, তখনই ইমন চরম ঔদ্ধত্য নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলে, “আমার সম্পর্কে পুলিশ কমিশনারকে জিজ্ঞেস করেন!”
আর এই হুমকির ঠিক দুদিন পর, ১৩ই জুলাই ডিডিএন কার্যালয়ে নেমে আসে নরক! ১৫ থেকে ২০ জনের একটা দল দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হঠাৎ অফিসে ঢুকে পড়ে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে চলে দেদারসে ভাঙচুর। অফিসের দামি কম্পিউটার আসবাবপত্র ভেঙে তছনছ করে দেওয়া হয়। এই ঘটনা ঢক অব দ্যা কান্ট্রিতে পরিণত হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ডেভিড ইমনের অপরাধ জগতের ইতিহাস কিন্তু খুব বেশি দিনের নয়। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চন নগর ইউনিয়নের মোহাম্মদ মুছার ছেলে মোবারক হোসেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ফটিকছড়ির সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও তৎকালীন শীর্ষ সন্ত্রাসী আবু তৈয়বের শিষ্য হিসেবে তার অপরাধ জগতে হাতেখড়ি। শুরুতে সে এলাকায় ছিচকে চুরি এবং ধুরুং খাল থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের নিয়ন্ত্রণ করতো।
কিন্তু ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ফটিকছড়িতে যখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়, চতুর মোবারকও মুহূর্তেই তার ভোল পাল্টে ফেলে। এলাকা ছেড়ে সে চলে আসে চট্টগ্রাম শহরে। আশ্রয় নেয় ‘ছোট সাজ্জাদ’ নামে এক সন্ত্রাসীর ডেরায়। আর তখনই মোবারক থেকে নিজের নাম বদলে সে হয়ে যায় ‘ডেভিড ইমন’।
ছোট সাজ্জাদের মাধ্যমে দুবাইতে অবস্থানকারি চট্টগ্রামের কুখ্যাত ও শীর্ষ সন্ত্রাসী এইট মার্ডার মামলার মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত শিবির ক্যাডার ‘বড় সাজ্জাদ’ গ্রুপে। কিছুদিনের মধ্যেই যখন ‘ছোট সাজ্জাদ’ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়, তখন পুরো বাহিনীর দায়িত্ব, অর্থাৎ আন্ডারওয়ার্ল্ডের ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’-এর মুকুট চলে আসে ডেভিড ইমনের হাতে।
২০২৪ সালের ২৮শে আগস্ট চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানা এলাকায় আনিস ও মোহাম্মদ হাসান নামে দুই ব্যক্তিকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় প্রথম তদন্তে আসে এই ডেভিড ইমনের নাম। এরপর তার বিরুদ্ধে একে একে জমা হতে থাকে হত্যা ও দুর্ধর্ষ চাঁদাবাজির পাহাড়সম অভিযোগ!
ধরা পড়ার ঠিক চার দিন আগে ভারত থেকে গোপনে দেশে ফিরে আসে ইমন। গত ২৬ শে জুলাই রাতে চট্টগ্রাম নগরীর অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের ওয়াজেদিয়া এলাকা থেকে সিএমপি পুলিশ একটি বিদেশি পিস্তল ও চার রাউন্ড গুলিসহ আসিফ ও সাইদুল ইসলাম ওরফে আরিফ নামে ইমনের দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে। মূলত তাদের দেওয়া গোপন ও নিখুঁত তথ্যের সূত্র ধরেই পুলিশ নিশ্চিত হয়ে যায় ইমনের অবস্থান। ইমনও বুঝতে পারে পুলিশ তাকে গ্রেফতারে অভিযান চালাতে তৎপর হয়েছে। এই অবস্থায় পুরান ঢাকা থেকে ভারতে ফের পালিয়ে যাওয়ার জন্য সীমান্ত এলাকা যশোর যায়।
নিজেকে আড়াল করতে চুল ও গোঁফ কেটে চেহারায় আমূল পরিবর্তন এনেছিল ইমন। উদ্দেশ্য ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে যশোর সীমান্ত পার হয়ে আবার ভারতে পালিয়ে যাওয়া। ডিবির তল্লাশিচৌকিতে যখন তার গাড়ি থামানো হয়, সে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় নিজেকে পুরান ঢাকার এক সাধারণ ‘শ্রমিক’ দাবি করে। নিজের ভুয়া নাম বলে ‘মিরাজ’। সে ভেবেছিল পুলিশকে সে বোকা বানিয়ে ফেলেছে। কিন্তু ভাগ্য তখন তার সহায় ছিল না! চতুর ইমন মুখে নিজেকে ঢাকার বাসিন্দা দাবি করলেও, অভিজ্ঞ পুলিশ অফিসারদের কান এড়ায়নি তার কথা বলার ধরন। পুলিশ তীক্ষ্ণভাবে খেয়াল করে, তার কথার পেছনে লুকিয়ে আছে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার স্পষ্ট টোন! ব্যাস! মুহূর্তেই সমস্ত দম্ভ চূর্ণ হয়ে যায় এই ডনের।
ভাষার সেই ছোট্ট একটি টোনেই শেষ পর্যন্ত ফাঁস হয়ে যায় তার আসল পরিচয় এবং খাঁচায় বন্দি হয় পুরো চট্টগ্রাম কাঁপানো এই শীর্ষ সন্ত্রাসী! যে সন্ত্রাসী একসময় বুক ফুলিয়ে বলতো পুলিশ কমিশনারের কাছ থেকে তার নাম জেনে নিতে, আজ সেই ডেভিড ইমন খাঁচায় বন্দি। গুঁড়িয়ে গেছে তার আন্ডার ওয়াল্ড সাম্রাজ্য।
সৈয়দ সাকিব
![]()

