বিএনএ, ডেস্ক : স্থান ভিন্ন, গোলার্ধ ভিন্ন, কিন্তু নারীর স্বাধীনতা আর মর্যাদার ওপর ধর্মান্ধদের আঘাতের নোংরা স্ক্রিপ্টটা যেন হুবহু এক! ২০২২ সালে ইরানের বুকে কেঁপে উঠেছিল এক তরুণী—মাহসা আমিনীর নাম। আর ২০২৬-এ এসে সেই একই উগ্র মানসিকতার সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলেন এক শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষিকা—বিউটি রানী পাল।
কিন্তু এবার আর নারীরা মুখ বুজে থাকেনি। তেহরান থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ—কীভাবে মৌলবাদের শৃঙ্খল ভেঙে গর্জে উঠলো লাখো কণ্ঠ?

২০২২ সালের সেপ্টেম্বর। মাত্র ২২ বছরের কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনীকে তেহরানের রাস্তায় গ্রেপ্তার করে সে দেশের তথাকথিত ‘মোরালিটি পুলিশ’। অপরাধ? তাঁর হিজাব নাকি নিয়ম অনুযায়ী পরা ছিল না! পুলিশি হেফাজতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে মাত্র তিন দিনের মাথায় প্রাণ হারান মাহসা। ধর্মের দোহাই দিয়ে, পোশাকের অজুহাতে নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতাকে শৃঙ্খলিত করার এক নৃশংসতম রূপ দেখেছিল গোটা বিশ্ব।”
আসুন এবার জেনে নেই কে এই বিউটি রানী পাল? তিনি কোনো সাধারণ স্রোতে ভেসে আসা মানুষ নন। সিলেটের নামকরা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিভাগে কৃতিত্বের সাথে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করা এক উচ্চশিক্ষিত নারী। ২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দিয়ে তিনি পাল্টে দেন প্রথাগত ক্লাসরুমের আবহ। ফেসবুক জুড়ে তাঁর পাতায় দেখা যায়—কীভাবে তিনি শিশুদের শরীরচর্চা করান, কীভাবে নাচের ছলে আনন্দের সাথে গণিতের কঠিন চিহ্ন ও বইয়ের পড়া শেখান! আর তাঁর এই অনন্য মেধা ও নিষ্ঠার কারণেই তিনি অর্জন করেন জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের গৌরবময় স্বীকৃতি। শ্রাবণের মেঘ যেমন প্রকৃতিকে স্নিগ্ধ করে, তেমনি শিক্ষকরা সমাজকে আলো দেন। কিন্তু কখনো কখনো সেই আলোর গায়েও কালি ছেটানোর চেষ্টা করে কিছু অন্ধকার মানুষ।
ইরানে যেখানে রাষ্ট্র নিজে পুলিশ পাঠিয়েছিল, বাংলাদেশে ঠিক তেমনি একদল অন্ধকার মানুষ নিজেদের ‘ডিজিটাল ফতোয়াবাজ’ বা ‘সাইবার নীতি পুলিশ’ ভেবে বসল! বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছুটির পর ধারণ করা একটি সাধারণ রিলস ভিডিওতে তিনি কেবল হেঁটে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের একটি ফেসবুক পেজ এবং যুক্তরাজ্য প্রবাসী আসিফ ইকবাল হিরণসহ কিছু সংকীর্ণ উগ্র মানসিকতার মানুষ তাঁর এই স্বাভাবিক দৃশ্যকে ‘অশ্লীলতা’র তকমা দেয়। নারীর প্রতি তীব্র ঘৃণা ছড়াতে ও একজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকাকে সামাজিকভাবে কোণঠাসা করতে শুরু হয় নোংরা ট্রোল ও সাইবার বুলিং
কিন্তু উগ্রবাদীরা এবার হিসাব মেলাতে ভুল করে ফেলেছে! এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো ভাঙচুর বা রাজপথের স্লোগান নয়, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—গর্জে উঠলো গোটা বাংলাদেশ! বিউটি রানী পালের অপমানের প্রতিবাদে দেশের হাজার হাজার প্রগতিশীল শিক্ষক, সাধারণ মানুষ, আর ছাত্র-ছাত্রীরা একজোট হয়ে রুখে দাঁড়ালো। ধর্মান্ধ আর নারীর প্রতি ঘৃণা সৃষ্টিকারীদের মুখে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে, তারা নিজেরাও ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানের রিলস বানিয়ে ফেসবুকের দেওয়াল কাঁপিয়ে দিল! প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ও সাফ জানিয়ে দিল—এই ভিডিওতে কোনো আচরণবিধি লঙ্ঘন বা অশ্লীলতা ছিল না! মৌলবাদের অন্ধকারের মুখে এটি ছিল সংস্কৃতির এক ঐতিহাসিক চপেটাঘাত!”
ইরানের মাহসা আমিনী নিজের জীবন দিয়ে বিশ্বজুড়ে নারীর মুক্তির আন্দোলনের মশাল জ্বেলে গেছেন। আর বাংলাদেশের বিউটি রানী পালকে কেন্দ্র করে আমাদের শিক্ষক ও ছাত্র সমাজ দেখিয়েছে—ধর্মান্ধতার অন্ধকার যতই গ্রাস করতে আসুক, সংস্কৃতির আলোর কাছে তাকে মাথা নোয়াতেই হবে। নারী কোনো শিকলে বাঁধা পড়ার নাম নয়, নারী মানেই স্বাধীনতা।
শামীমা চৌধুরী শাম্মী
![]()

