বিএনএ, ঢাকা: সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গাজীপুরের একটি ঘটনা নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। দাবি করা হচ্ছে- এক ব্যক্তি, তার বর্তমান স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থাতেই স্ত্রীর আপন ভাগ্নিকে মুখে মুখে বিয়ে করেছেন এবং পরবর্তীতে ঢাকায় গিয়ে একসাথে বসবাস শুরু করেছেন। এই ঘটনাটি নিয়ে সমাজজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা—ইসলামের দৃষ্টিতে স্ত্রীর ভাগ্নিকে বিয়ে করার বিধান কী? এই প্রতিবেদনে আমরা কোরআন ও হাদিসের সুনির্দিষ্ট ব্যাখাসহ বিস্তারিত আলোচনা করব।

এই ঘটনাটি ঘটেছে গাজীপুর এলাকায় । মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্রীর তার খালুর সাথে প্রেমের সর্ম্পক গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে খালু তাকে ঢাকায় এক বন্ধুর বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে অবস্থান করে বাসর করে। পরে একটি নিখোঁজ ডায়েরির সূত্র ধরে তাদের সন্ধান পা্ওয়া যায় এবং এলাকায় ফিরে আসে। বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে তোলপাড় সৃস্টি হয়। বিভিন্ন অনলাইন কনটেন্ট ক্রিয়েটর ঘটনাটি প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায় মেয়েটি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে—ইসলাম কি আসলেই এই ধরণের বিয়ের অনুমতি দেয়?
ইসলামে একজন পুরুষ কোন্ কোন্ নারীকে বিয়ে করতে পারবেন না, তার একটি স্থায়ী তালিকা পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নিসার ২৩ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়েছে। সেখানে নিজের আপন বোন বা ভাইয়ের মেয়ে অর্থাৎ নিজের আপন ভাগ্নিকে বিয়ে করা চিরতরে হারাম করা হয়েছে।
এখন আসা যাক স্ত্রীর ভাগ্নির বিষয়ে। স্ত্রীর ভাগ্নি কিন্তু নিজের আপন ভাগ্নি নয়। তাহলে কি তাকে বিয়ে করা যাবে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে হাদিস শরিফে।”
ইসলামী আইন অনুযায়ী, কোনো পুরুষ একই সাথে তার স্ত্রী এবং স্ত্রীর আপন ভাগ্নিকে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ রাখতে পারবেন না। অর্থাৎ, খালা ও ভাগ্নি একই সময়ে এক ব্যক্তির স্ত্রী হিসেবে থাকতে পারবে না।
সহীহ বুখারী, হাদিস নম্বর ৫১০৯-এ আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘কোনো পুরুষ যেন একই সাথে কোনো নারীকে এবং তার খালা বা ভাগ্নিকে বিবাহ না করে।’
একইভাবে সহীহ মুসলিমের ১৪০৮ নম্বর হাদিসেও একই সময়ে খালা ও ভাগ্নিকে এক স্বামীর অধীনে রাখা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তাই গাজীপুরের এই ঘটনায় যদি ওই ব্যক্তির প্রথমা স্ত্রী অর্থাৎ মেয়েটির খালা জীবিত থাকেন এবং তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক টিকে থাকে, তবে ওই ভাগ্নিকে বিয়ে করা শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বাতিল, অবৈধ এবং হারাম। তাদের মধ্যকার যেকোনো শারীরিক সম্পর্ক সরাসরি ব্যভিচার বা জেনা হিসেবে গণ্য হবে।
স্ত্রীর ভাগ্নি কিন্তু চিরস্থায়ী হারাম বা মাহরাম নয়। যদি কোনো কারণে ওই ব্যক্তির বর্তমান স্ত্রী অর্থাৎ মেয়েটির খালা মৃত্যুবরণ করেন কিংবা তাদের মধ্যে শরিয়তসম্মত উপায়ে সম্পূর্ণ তালাক হয়ে যায় এবং ইদ্দত পার হয়ে যায়, কেবল তখনই চাইলে ভাগ্নিকে নতুন করে শরীয়তের নিয়ম মেনে বিয়ে করা সম্ভব। কিন্তু খালা বর্তমান থাকা অবস্থায় ভাগ্নিকে বিয়ে করা ইসলামের দৃষ্টিতে মস্ত বড় কবিরা গুনাহ।
সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সমাজে এই ধরনের অবিশ্বাস্য ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো পারিবারিক মূল্যবোধের চরম বিপর্যয় এবং নৈতিক অবক্ষয়। বর্তমান যুগে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার এবং অনিয়ন্ত্রিত মেলামেশার ফলে মানুষের মধ্যকার সুস্থ মনস্তত্ত্ব ও সম্পর্কের পবিত্রতা লোপ পাচ্ছে। পারিবারিক সম্পর্কে যখন পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সামাজিক লোকলজ্জার ভয় হারিয়ে যায়, তখনই মানুষের মাঝে এমন পশুবৃত্তিক ও অনৈতিক আচরণ প্রকাশ পায়, যা পুরো সমাজকে এক মারাত্মক নৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় শিক্ষার অভাব এবং ধর্মীয় অনুশাসন ও পর্দার বিধান সঠিকভাবে মেনে না চলার কারণেই মূলত সমাজজুড়ে এমন অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। ইসলামে কার সাথে কতটুকু মেলামেশা করা বৈধ, তার একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখা বা গণ্ডি রয়েছে; যা অমান্য করলে ব্যভিচারের মতো কঠিন পাপের পথ উন্মুক্ত হয়। এই ধরনের সামাজিক ও মানসিক পতন থেকে সমাজকে রক্ষা করতে হলে কেবল আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং প্রতিটি পরিবারে শুদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষার চর্চা এবং বাস্তব জীবনে কঠোরভাবে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা অপরিহার্য।
শামীমা চৌধুরী শাম্মী
![]()

